ফ্রান্সে বিক্ষোভ: ২০২৬ সালকে নতুন ১৭৮৯ বলছে শিক্ষার্থীরা
ঐতিহাসিক প্লাস দো লা রিপাবলিক চত্বরে বিক্ষোভকারীরা। মঙ্গলবার ফ্রান্সের প্যারিসে। ছবি: এএফপি
এএফপি
প্রকাশ: ০৭ অক্টোবর ২০২৬ | ১৪:৪৪ | আপডেট: ০৭ অক্টোবর ২০২৬ | ১৫:৩৮
চারদিকে ড্রামের শব্দ আর স্লোগানের তুমুল আওয়াজ। এর মাঝেই বন্ধুদের নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল ১৬ বছর বয়সী কিশোর ইয়ানিস। শিক্ষার উন্নত পরিবেশের দাবিতে প্যারিসের রাজপথে নেমে আসা কয়েক হাজার মানুষের বিক্ষোভে কেন সে যোগ দিয়েছে, তা এক নিঃশ্বাসে বলছিল এই কিশোর।
মঙ্গলবার ইয়ানিস বলে, স্কুলে কোনো শৌচাগার বা টয়লেট নেই। টয়লেট পেপারও নেই। সবকিছু ভাঙাচোরা। সকাল ৮টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত ক্লাস করতে হয়। এর মাঝে মাত্র এক ঘণ্টার বিরতি থাকে।
ইয়ানিস কথা বলার সময় পাশে থাকা অন্য কিশোররা হ্যাঁ সূচক মাথা নাড়ছিল। সার্সেলস নামের শহরতলি থেকে প্যারিসে বিক্ষোভে যোগ দেওয়া ইয়ানিস বলে, ‘এক ক্লাসে ৩৬ জন শিক্ষার্থী গাদাগাদি করে বসে। এভাবে পড়াশোনা করা যায় না।’ বিষয়টিকে সে অগ্রহণযোগ্য বলেও মন্তব্য করে।
গত মাসের শেষ দিকে শুরু হওয়া বিক্ষোভের অংশ হিসেবে মঙ্গলবার প্যারিসের রাজপথে নেমেছিল প্রায় ৫৬ হাজার মানুষ। শিক্ষক সংকট, দীর্ঘ ক্লাস রুটিন, সুযোগ-সুবিধার অভাব, ক্রমবর্ধমান তাপমাত্রার বিপরীতে জরাজীর্ণ স্কুল ভবন এবং সংকট নিরসনে ব্যবস্থা না নেওয়ার প্রতিবাদে মঙ্গলবার ফ্রান্সজুড়ে হাইস্কুল অবরোধ পালন করা হয়। বেশ কয়েকটি শহরে ১৫ থেকে ১৭ বছর বয়সীরা রাস্তায় নেমে বিক্ষোভ করে।
বিভিন্ন প্ল্যাকার্ড হাতে প্যারিসের ঐতিহাসিক প্লাস দো লা রিপাবলিক চত্বরে জড়ো হয়েছিলেন কয়েক হাজার বিক্ষোভকারী। একটি প্ল্যাকার্ডে লেখা ছিল- ‘২০২৬ হলো নতুন ১৭৮৯।’ যার মাধ্যমে ঐতিহাসিক ফরাসি বিপ্লবের দিকে ইঙ্গিত করা হয়।
আগামী বছর দেশটিতে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন হওয়ার কথা। এর আগে এমানুয়েল মাখোঁর পদত্যাগ দাবি ও কট্টর ডানপন্থিদের নিন্দা জানিয়ে স্লোগানে স্লোগানে প্রকম্পিত হয়ে ওঠে রাজপথ। ড্রামের তালের সঙ্গে নেচে-গেয়ে ও হাততালি দিয়ে নিজেদের দাবি তুলে ধরেন বিক্ষোভকারীরা।
‘এই দেশে আমার ভবিষ্যৎ নেই’
বিক্ষোভে আংশিক ওই উৎসবমুখর পরিবেশের আড়ালে অনেক শিক্ষার্থীর কণ্ঠে ছিল চরম হতাশার সুর। ইয়ানিসের সঙ্গেই বিক্ষোভে যোগ দিয়েছিল ১৫ বছর বয়সী ফিদেল। তার স্বপ্ন একজন আইনজীবী হওয়া। কিন্তু স্কুলের বেহাল দশা তার স্বপ্ন পূরণের ক্ষেত্রে হতাশা তৈরি করেছে।
ফিদেল বলে, ‘আমি যখন এই পুরো ব্যবস্থাটির (সিস্টেম) দিকে তাকাই, তখন নিজেকেই বলি, এই দেশে আমার কোনো ভবিষ্যৎ নেই।’
পাশেই দাঁড়িয়ে ছিল ১৬ বছর বয়সী নোহাম। তার লক্ষ্য কম্পিউটার প্রকৌশলী হওয়া। কিন্তু সে জানায়, শ্রেণিকক্ষে অতিরিক্ত শিক্ষার্থীর চাপ আর শিক্ষক সংকটের কারণে লক্ষ্য এখন ধরাছোঁয়ার বাইরে চলে যাচ্ছে। নোহাম আরও বলে, ‘যথাযথ শিক্ষার সুযোগ না পেলে আমি আমার স্বপ্নের চাকরি কখনোই পাব না। এটি আমার ওপর প্রচণ্ড মানসিক চাপ তৈরি করছে।’
দীর্ঘ ২০ বছর ধরে শিক্ষকতা পেশায় যুক্ত আছেন নাদিন জিলিয়াকাস। তিনি জানান, আরও কম বয়সী শিক্ষার্থীদের মধ্যে তিনি একই ধরনের হতাশা লক্ষ্য করেছেন। সামনের দিনগুলো নিয়ে শিক্ষার্থীরা প্রায়ই এক অন্ধকারাচ্ছন্ন ভবিষ্যতের কথা বলে।
এই শিক্ষিকা বলেন, ‘আমরা তাদের বোঝানোর চেষ্টা করি। ভবিষ্যতে নিজের ভালোলাগার বিষয়ের ওপর চাকরির জন্য প্রস্তুতি নেওয়ার পরামর্শ দেই। কিন্তু জবাবে মাধ্যমিকের শিক্ষার্থীরাও এখন বলে, ‘এসবের কোনো মানে হয় না। আমরা এমনিতেও চাকরি পাব না।’
- বিষয় :
- ফ্রান্স
- শিক্ষার্থী
- বিক্ষোভ