সিজেপির বিক্ষোভ
দিল্লি থমথমে, দ্বিতীয় দিনেও ধরপাকড়
ভারতের প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে গতকাল রোববারও নয়াদিল্লিতে বিক্ষোভ করে ককরোচ জনতা পার্টি। নিরাপত্তাকর্মীরা অনেক বিক্ষোভকারীকে আটক করে। ছবি: এএফপি
সমকাল ডেস্ক
প্রকাশ: ১২ অক্টোবর ২০২৬ | ১১:৫৯
ভারতের রাজধানী দিল্লিতে গত শনিবার ব্যাপক উত্তেজনা ও বড় পরিসরে ধরপাকড় চললেও পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়নি। গতকাল রোববার সকাল থেকেই যন্তরমন্তর এলাকায় নিরাপত্তা আরও জোরদার করে পুলিশ। পুরো এলাকা ঘিরে রাখতে দেখা যায়। চোখে পড়ে একাধিক ব্যারিকেড। বিপুলসংখ্যক পুলিশ ও আধাসামরিক বাহিনীর সদস্য সে সময় মোতায়েন ছিল।
এদিকে, শনিবারের অভিযানের পরও আন্দোলনকারীরা কর্মসূচি চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। ভারতীয় সংবাদমাধ্যম হিন্দুস্তান টাইমস জানিয়েছে, গতকাল রোববার বিক্ষোভকারীদের একটি অংশ ফের রাজপথে নামে। মিছিল নিয়ে কনট প্লেসের দিকে যাওয়ার সময় পুলিশ শিক্ষার্থী আন্দোলনকর্মী নেহা বোরাকে আটকের চেষ্টা করে। পরে তিনি দৌড়ে এইচ ব্লকের দিকে যান। বিকেল ৩টার দিকে সেখান থেকে নেহাকে আটক করে পুলিশ।
বিক্ষোভকারীদের ফোন পুলিশ ছিনিয়ে নিচ্ছে– এমন অভিযোগও উঠেছে। পাশাপাশি তাদের আটক করে গাড়িতে তুলে পেটানো হচ্ছে এমন অভিযোগও তোলা হয়েছে। অভিযোগটি তুলেছে অল ইন্ডিয়া স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশন (এআইএসএ)। তারা জানায়, দিল্লি পুলিশের এই অবৈধ আচরণের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো হবে এবং এটি ফাঁস করা হবে। আটকদের প্রতি সহিংসতা বন্ধের দাবিও জানিয়েছে সংগঠনটি।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম দ্য ওয়ারের খবর বলছে, শুধু বিক্ষোভকারীরা নন, পুলিশের ধরপাকড় ও মারধরের শিকার হচ্ছেন সাংবাদিকরাও। আগেই পুলিশের পক্ষ থেকে সাংবাদিকদের প্রেস কার্ড পরার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল। তবে মাঠে পরিস্থিতি ছিল ভিন্ন। প্রেস কার্ড পরা অবস্থায়ও আন্দোলনের দুদিনই নিগৃহীত হতে হয়েছে সাংবাদিকদের। গতকাল রোববার সকালেই ভারতের সুপ্রিম কোর্ট জানান, দায়িত্ব পালনরত সাংবাদিকদের আটক করা যাবে না।
এদিকে, ভারতীয় সংবাদমাধ্যম দ্য হিন্দুর খবর বলছে, গণহারে আটক এবং নাগরিক অধিকার খর্ব করে ‘কারফিউর মতো’ পরিস্থিতি তৈরির এক দিন পর গতকাল রোববার ভারতের সুপ্রিম কোর্ট বিশেষ শুনানিতে বসেন। জ্যেষ্ঠ আইনজীবীরা চলমান পরিস্থিতিকে ১৯৭৫ সালের জরুরি অবস্থার সঙ্গে তুলনা করেন। শুনানিতে সুপ্রিম কোর্ট কেন্দ্রীয় সরকার ও দিল্লি পুলিশকে ‘বেআইনি আটক’ বন্ধ করার নির্দেশ দেন। একই সঙ্গে মানুষের অবাধ ও নির্বিঘ্ন চলাচল, সড়কে যানবাহন চলাচল এবং মেট্রো ও রেল পরিষেবা স্বাভাবিকভাবে চালু রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়।
মুক্ত সিজেপির তিন নেতা
সিজেপির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকে এবং দলের দুই নেতা সৌরভ দাস ও আশুতোষ রাঙ্কাকে শনিবার বিমানবন্দর থেকেই আটক করা হয়েছিল। গতকাল রোববার সকালে তাদের দিল্লি ক্যান্টনমেন্টের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে হাজির করা হয় ও পরে মুক্তি দেওয়া হয়। তবে শান্তি ভঙ্গ হতে পারে– এমন কোনো কাজ এক বছরের জন্য না করার শর্তে তাদের মুক্তি দেওয়া হয়েছে।
দিল্লি পুলিশ জানিয়েছে, ২০২৬ সালের ১০ অক্টোবর ভারতীয় নাগরিক সুরক্ষা সংহিতার (বিএনএসএস) ১২৬ ও ১৭০ ধারায় অভিজিৎ দীপকে, আশুতোষ রাঙ্কা ও সৌরভ দাসকে প্রতিরোধমূলক আটক করা হয়। সব আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করে ১১ অক্টোবর তাদের দিল্লি ক্যান্টনমেন্টের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে হাজির করা হয়। এক বছরের জন্য শান্তি বজায় রাখা ও ভালো আচরণের শর্তে ৫০ হাজার রুপির জামিনদার বন্ড জমা দেওয়ার পর আদালত তাদের মুক্তি দেন।
এ ছাড়া গত শনিবার রাতে আটক প্রায় পাঁচ হাজার আন্দোলনকারীকে ছেড়ে দেয় দিল্লি পুলিশ বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তাদের মধ্যে পশ্চিমবঙ্গের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, দিল্লির সাবেক মুখ্যমন্ত্রী অরবিন্দ কেজরিওয়াল, ত্রিপুরার সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মানিক সরকার এবং কেরালার সাবেক মুখ্যমন্ত্রী পিনারাই বিজয়নও ছিলেন বলে দাবি করা হয়েছে।
আন্দোলন চলবে
দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস ও প্রিন্টের প্রতিবেদন অনুযায়ী, রোববার দিল্লিতে সংবাদ সম্মেলন করেন সিজেপির নেতারা। এ সময় সংগঠনটির নেতারা দিল্লিতে নজিরবিহীন কড়াকড়ি নিয়ে কেন্দ্রীয় সরকারের সমালোচনা করেন। তারা অভিযোগ করেন, পরিস্থিতিকে ‘যুদ্ধাবস্থার’ দিকে ঠেলে দেওয়া হয়েছে। এ জন্য প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের লজ্জা হওয়া উচিত। একই সঙ্গে তারা প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ দাবিতে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেন।
এ ছাড়া সিজেপি সামাজিক মাধ্যম এক্সে এক ভিডিও সংবলিত পোস্টের ক্যাপশনে লিখেছে, ‘জ্ঞানেশ কুমার ক্ষমতাসীনদের বিষয়ে ঠিক কী জানেন, যার জন্য সরকার তাঁকে বাঁচাতে নিজ জনসাধারণের সঙ্গে যুদ্ধ পরিস্থিতি তৈরিতে দ্বিধা করছে না?’
সংগঠনটির সহআহ্বায়ক সৌরভ দাস অভিযোগ করেন, সরকার রাষ্ট্রকে নিজ নাগরিকদের বিরুদ্ধে দাঁড় করিয়েছে। নির্দিষ্ট স্থানে বিক্ষোভ করতে চাওয়া আন্দোলনকারীদের বাধা না দিয়ে কর্তৃপক্ষ চাইলে আলোচনার জন্য প্রতিনিধি দলকে আমন্ত্রণ জানাতে পারত।
ট্রেন বাতিল, বিক্ষোভে বাধা ও কর্মীদের আটকের মাধ্যমে মোদি সরকার দেশে জরুরি অবস্থার মতো পরিস্থিতি তৈরি করেছে বলেও অভিযোগ তোলেন সিজেপির নেতারা। তারা বলেন, বেআইনিভাবে আটকে রাখার পর ছেড়ে দেওয়ার সময় ‘আগামী এক বছর শান্তি বজায় রাখার’ শর্ত দেওয়া হয়েছে। কিন্তু নরেন্দ্র মোদি, অমিত শাহ ও জ্ঞানেশ কুমারই দেশে শান্তি ভঙ্গ করেছেন।
মোদির সমালোচনা দীপকের
আটকের প্রায় ২৪ ঘণ্টা পর মুক্তি পেয়েই ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সমালোচনা করেছেন ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) নেতা অভিজিৎ দীপকে। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী হিসেবে মোদি ভারতের জন্য ‘অস্বস্তির কারণ’। ভারত এর আগে এত বড় ‘কাপুরুষ’ ও ‘জুলুমবাজ’ দেখেনি বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
গতকাল সকালে সামাজিক মাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে অভিজিৎ দীপকে লেখেন, ‘প্রধানমন্ত্রী হিসেবে মোদি ভারতের জন্য অস্বস্তির কারণ।’
আটক নয়, ‘অপহরণ’
শনিবার আটকের ঘটনার বর্ণনা দিয়ে রোববার সামাজিক মাধ্যমে পোস্ট করেছেন ইউটিউবার ধ্রুব রাঠি। তিনি অভিযোগ করেছেন, সাদা পোশাকের ব্যক্তিরা তাঁকে অপহরণ করেছিলেন। পরে তাঁকে ছেড়ে দেয় গুরুগ্রাম পুলিশ।
ধ্রুব রাঠি বলেন, ‘আমি বিক্ষোভে গেলে হয়তো আমাকে আটক করা হতো। কিন্তু তারা আমাকে ঘুমন্ত অবস্থায় অপহরণ করেছে। পরে জানতে পেরেছি, বাড়ির বাইরে ৫০ জনের বেশি লোক দাঁড়িয়ে ছিল। একজন অপরাধীর মতো আমাকে বাড়ি থেকে টেনেহিঁচড়ে বের করে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।’
গত শনিবার দিল্লিতে বিক্ষোভ কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে কয়েক হাজার মানুষকে আটক করেছিল পুলিশ। তাদের মধ্যে ধ্রুব রাঠিও ছিলেন। নির্বাচনের ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) প্রক্রিয়ায় অনিয়মের অভিযোগ তুলে ভারতের প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে দিল্লির যন্তরমন্তরে বিক্ষোভের ডাক দিয়েছিল ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি)। ওই কর্মসূচিতে যোগ দিতে যাওয়ার আগেই ধ্রুব রাঠিকে আটক করে পুলিশ। গতকাল তাঁকে মুক্তি দেওয়া হয়।
শনিবার গুরুগ্রামের সেক্টর ৫৬ এলাকায় নিজের বাসা থেকে তাঁকে আটক করা হয়। বিক্ষোভকারীরা যাতে যন্তরমন্তরে পৌঁছাতে না পারেন, সে জন্য ওই দিন ভারতের রাজধানীজুড়ে নিরাপত্তা জোরদার করেছিল পুলিশ। সংবাদ সংস্থা পিটিআইকে পুলিশের একটি সূত্র জানায়, নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে ধ্রুব রাঠি যন্তরমন্তরে যাওয়ার চেষ্টা করলে তাঁর বিরুদ্ধে আবারও আটকসহ আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে।
‘সিজেপি বিরোধী শক্তির অংশ’
ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) সিজেপিকে বিরোধী শক্তির একটি অংশ হিসেবে আখ্যা দিয়েছে। দলটির অভিযোগ, সংগঠনটি দেশকে অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করছে। বিজেপির সভাপতি নিতিন নবীন অভিযোগ করেছেন, বিরোধী গোষ্ঠীগুলো ‘বিদেশি শক্তির’ নির্দেশনায় ভারতের ক্ষতি করার চেষ্টা করছে।
প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিং বলেছেন, গণতন্ত্রে প্রত্যেক ব্যক্তির ভিন্নমত প্রকাশের অধিকার রয়েছে। তবে নৈরাজ্য ছড়ানো কারও অধিকার নয়। জেন-জি তরুণরা সাময়িকভাবে বিভ্রান্ত হতে পারেন, কিন্তু তাদের দেশ গড়ার লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত করা যাবে না বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
এর আগে দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী রেখা গুপ্তা সিজেপিকে রাহুল গান্ধী ও অরবিন্দ কেজরিওয়ালের ‘বি-টিম’ বলে কটাক্ষ করেছিলেন।
আজ আবার রাস্তায় নামবে কংগ্রেস
দলের সব সংসদ সদস্যকে (এমপি) আজ সোমবার দিল্লিতে অবস্থান করতে নির্দেশ দিয়েছে কংগ্রেস। নির্বাচনী অনিয়মের অভিযোগ এবং বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে পুলিশের দমনপীড়নের প্রেক্ষাপটেই নতুন এই ঘোষণা আসে।
লোকসভার বিরোধীদলীয় নেতা রাহুল গান্ধী জানিয়েছেন, বিরোধী জোট ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল ডেভেলপমেন্টাল ইনক্লুসিভ অ্যালায়েন্স (ইন্ডিয়া) সোমবার আবারও রাজপথে নামবে। নির্বাচন-সংক্রান্ত বিতর্ক এবং শনিবার বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে পুলিশের আচরণের বিষয়ে একটি স্মারকলিপি নিয়ে ভারতের প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তের সঙ্গে যোগাযোগ করারও পরিকল্পনা রয়েছে বিরোধী জোটটির।
- বিষয় :
- ভারত