ইসরায়েলি নির্বাচনের আগে সতর্ক অবস্থান নিয়েছেন ট্রাম্প
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। ছবি: ইভলিন হকস্টেইন/গেটি
আল–জাজিরা
প্রকাশ: ১৩ অক্টোবর ২০২৬ | ১৩:২১ | আপডেট: ১৩ অক্টোবর ২০২৬ | ১৩:২২
ইসরায়েলের ২৭ অক্টোবরের জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর প্রতি সরাসরি সমর্থন জানানো থেকে বিরত রয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকা সত্ত্বেও তার এই অবস্থান দুই দেশের পরিবর্তিত রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং নেতানিয়াহুর সঙ্গে সম্পর্কের টানাপড়েনের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
২০১৭ সালে হোয়াইট হাউসে দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে ট্রাম্প ইসরায়েলের ডানপন্থীদের প্রত্যাশা অনুযায়ী বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছেন। তার পররাষ্ট্রনীতি নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক অবস্থানকে শক্তিশালী করতেও সহায়তা করেছে। এর বিনিময়ে নেতানিয়াহু নিজেকে ইসরায়েলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈদেশিক সম্পর্কের উপযুক্ত রক্ষক হিসেবে তুলে ধরেছেন। ট্রাম্পের প্রকাশ্য সমালোচনা ও দুই নেতার মতপার্থক্যের খবর সামনে এলেও নীতিগত ক্ষেত্রে বড় পরিবর্তন হয়নি।
এবারের নির্বাচনে নেতানিয়াহুর লিকুদ পার্টি ও নেতৃত্বাধীন ডানপন্থী জোটকে চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছেন গাদি আইজেনকোটের নেতৃত্বাধীন বিরোধী জোট। আরব সেন্টার ওয়াশিংটন ডিসির ফিলিস্তিন-ইসরায়েলবিষয়ক কর্মসূচির প্রধান ইউসেফ মুনায়েয়ার মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের পরিবর্তিত রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং দুই নেতার সম্পর্কের বিবর্তন ট্রাম্পের সতর্ক অবস্থানের পেছনে ভূমিকা রাখছে।
আল জাজিরাকে মুনায়েয়ার বলেন, অতীতে ডানপন্থী মিত্রদের প্রতি ট্রাম্পের সমর্থন এবং নেতানিয়াহুর সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বিবেচনায় নিলে এবারের নির্বাচনে তাঁর প্রকাশ্য দূরত্ব প্রত্যাশার চেয়ে বেশি।
সম্প্রতি টাইম ম্যাগাজিনকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প একাধিকবার নেতানিয়াহুকে সরাসরি সমর্থন জানানো এড়িয়ে যান। তবে ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর দক্ষিণ ইসরায়েলে হামাসের নেতৃত্বাধীন হামলার আগে নেতানিয়াহুর নেতৃত্বের পক্ষে কথা বলেন। বিরোধী নেতা আইজেনকোট সম্পর্কে ট্রাম্প বলেন, ‘আমি তাঁর সম্পর্কে কোনো খারাপ কথা শুনিনি।’
ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে ২০১৭ থেকে ২০২১ সালের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাস জেরুজালেমে স্থানান্তর, গোলান মালভূমির ওপর ইসরায়েলের নিয়ন্ত্রণের স্বীকৃতি এবং ২০১৫ সালের ইরান পারমাণবিক চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে সরিয়ে নেওয়ার মতো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এ ছাড়া আরব দেশগুলোর সঙ্গে ইসরায়েলের সম্পর্ক স্বাভাবিক করার উদ্যোগ নেওয়া হয়।
২০২৫ সালের জানুয়ারিতে শুরু হওয়া দ্বিতীয় মেয়াদেও ট্রাম্প ইসরায়েলে যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্র সরবরাহ অব্যাহত রেখেছেন। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নিয়েছেন এবং ইরানের সঙ্গে যুদ্ধে জড়িয়েছেন। নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে চলমান দুর্নীতির মামলায় তাঁকে ক্ষমা করে দেওয়ার আহ্বানও জানিয়েছেন ট্রাম্প। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে হোয়াইট হাউসে ফিরে আসার পর থেকে অন্তত সাতবার নেতানিয়াহুকে আতিথ্য দিয়েছেন ।
গাজায় দীর্ঘমেয়াদি শান্তি প্রতিষ্ঠা ও ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ অবসানে যুক্তরাষ্ট্রের প্রচেষ্টা নিয়ে দুই নেতার মধ্যে মতপার্থক্যের আভাস পাওয়া গেছে। তবে এসব মতপার্থক্য এখন পর্যন্ত বড় কোনো নীতিগত পরিবর্তন আনেনি।
ওয়াশিংটনভিত্তিক থিংক ট্যাংক ডন-এর ইসরায়েল-ফিলিস্তিনবিষয়ক পরিচালক মাইকেল ওমার-ম্যান মনে করেন, ট্রাম্প নেতানিয়াহুর সঙ্গ ত্যাগ করেছেন—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর কারণ নেই। তবে ট্রাম্প বাস্তববাদী; বিভিন্ন দেশে তার পছন্দের প্রার্থীদের জয়-পরাজয় দেখেছেন। নির্বাচনের শেষ পর্যায়ে নেতানিয়াহুকে শক্তিশালী করতে যুক্তরাষ্ট্র কোনো পদক্ষেপ নেবে কি না, তা-ও তিনি উড়িয়ে দেননি।
নেতানিয়াহুর তুলনায় আইজেনকোট অধিকৃত পশ্চিম তীরে বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতা নিয়ন্ত্রণের মতো বিষয়ে অপেক্ষাকৃত নমনীয় অবস্থানের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। তবে এসব পরিবর্তনের লক্ষ্য মূলত ইউরোপীয় সরকার ও আন্তর্জাতিক জনমতের কাছে ইসরায়েলের ভাবমূর্তি উন্নত করা। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইসরায়েলের বিদ্যমান ঘনিষ্ঠ সম্পর্কে বড় পরিবর্তন আসবে কি না, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে।
ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের ইসরায়েলবিষয়ক জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষক মাইরাভ জোনজেইন মনে করেন, ট্রাম্পের নীরবতা তার প্রশাসনের অভ্যন্তরে নেতানিয়াহুর সরকারকে ঘিরে থাকা মতপার্থক্যের প্রতিফলন। যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচন যত এগিয়ে আসছে, রিপাবলিকান পার্টির ভেতরেও ইসরায়েল নীতি নিয়ে বিভাজন তত স্পষ্ট হচ্ছে।
জোনজেইনের মতে, ইরানকে ঘিরে যুদ্ধ এবং ট্রাম্প প্রশাসনের অভ্যন্তরীণ মতবিরোধ—দুইয়ের সম্মিলিত প্রভাবেই ট্রাম্প সতর্ক অবস্থান নিয়েছেন। ভাইস প্রেসিডেন্ট জে ডি ভ্যান্সের মতো প্রশাসনের কিছু সদস্য ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক পদক্ষেপের পক্ষে নেতানিয়াহুর ভূমিকার বিরোধিতা করেছেন।
জনমত জরিপগুলোতে দেখা গেছে, রিপাবলিকানদের মধ্যে ইসরায়েলের প্রতি সমর্থন এখনো জোরালো থাকলেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তা কিছুটা কমেছে। একই সঙ্গে নেতানিয়াহুর প্রতি আস্থাও হ্রাস পেয়েছে।
ইসরায়েলে ট্রাম্পের প্রভাব সম্পর্কেও ধারণা বদলেছে। লেবাননে ইসরায়েলি সামরিক অভিযান সীমিত করার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকার কথা তুলে ধরেছেন নেতানিয়াহুর সমালোচকেরা। এসব অভিযান এমন একটি সমঝোতা চুক্তি ভেস্তে দেওয়ার ঝুঁকি তৈরি করেছিল, যার মাধ্যমে ইরানবিরোধী যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল সাময়িক বিরতিতে গিয়েছিল।
জুনে প্রকাশিত ইসরায়েলি ডেমোক্রেসি ইনস্টিটিউটের এক জরিপে দেখা যায়, ইহুদি ইসরায়েলিদের ৪৪ শতাংশ মনে করেন, ট্রাম্পের কাছে ইসরায়েলের নিরাপত্তা একটি প্রধান বিবেচ্য বিষয়। মার্চে, ইরানবিরোধী যুদ্ধ শুরুর ঠিক পরপরই এই হার ছিল ৬১ শতাংশ।
জোনজেইন বলেন, এবারের নির্বাচনী প্রচারে নেতানিয়াহু ট্রাম্পের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক তুলে ধরে বিলবোর্ড বা পোস্টার ব্যবহার করছেন না। আগের বছরগুলোর তুলনায় এটি ভিন্ন কৌশল। এর পরিবর্তে নেতানিয়াহু ইসরায়েলের প্রধান আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক প্রতিপক্ষ হিসেবে যাদের তুলে ধরছেন, তাঁদের মধ্যে রয়েছেন হিজবুল্লাহর মহাসচিব নাইম কাসেম, তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান এবং নিউইয়র্ক সিটির মেয়র জোহরান মামদানি।
জোনজেইনের মতে, নেতানিয়াহু এবার মূলত নিজের শত্রু ও মিত্রদের মধ্যে পার্থক্য তুলে ধরে নির্বাচনী প্রচার চালাচ্ছেন।