ঢাকা রোববার, ১৮ অক্টোবর ২০২৬

ফেলনা জিনিসে জীবিকা

ফেলনা জিনিসে জীবিকা
×
×

জালাল উদ্দিন

প্রকাশ: ০৩ অক্টোবর ২০২৬ | ০৭:৪৮ | আপডেট: ০৬ অক্টোবর ২০২৬ | ১৭:৩৭

| প্রিন্ট সংস্করণ

সকালের কুয়াশা কিংবা চড়া রোদ ঠেলে গলির মোড়ে ভেসে আসে এক পরিচিত হাঁক– ‘পুরোনো লোহা, টিন, অচল প্লাস্টিক বিক্রি করবেন...।’ হাতে মাইক আর সামনে ভাঙারিবোঝাই ভ্যানগাড়ি ঠেলে এগিয়ে চলেন আজম আলী। পাবনার বেড়া উপজেলার ছোট পায়না মহল্লার এই অধিবাসীর কাছে ঘরের কোণে পড়ে থাকা অপ্রয়োজনীয় বর্জ্যই মূলত প্রতিদিনের রুটি-রুজির প্রধান উৎস। অন্যের কাছে যা অচল ও পরিত্যক্ত, আজম আলীর মতো বর্জ্য সংগ্রাহকদের হাত ধরে তা-ই পরিণত হয় উপার্জনের শেষ সম্বল ও সচল অর্থনীতিতে।

প্রতিদিন আটশ থেকে এক হাজার টাকার ভাঙারি কিনে দিনশেষে তা পাইকারি আড়তে বিক্রি করেন আজম আলী। সব খরচ বাদ দিয়ে দিনে থাকে ৩০০ থেকে ৫০০ টাকা। এ সামান্য উপার্জনে কোনো রকমে টিকে থাকে তাঁর পরিবার।

আজম আলী একা নন; পাবনার বেড়া, সাঁথিয়া; সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুর কিংবা কুষ্টিয়ার ভেড়ামারার বিস্তৃত অঞ্চলে এমন কয়েকশ ফেরিওয়ালা ও সংগ্রাহক ছড়িয়ে রয়েছেন। গ্রাম থেকে শহর–বাড়ি বাড়ি ঘুরে অকেজো টিন, লোহা, তামার তার, অ্যালুমিনিয়াম, প্লাস্টিক এবং নষ্ট ইলেকট্রনিকস সামগ্রী সংগ্রহ করাই তাদের দৈনিক কাজ।

একসময় শুধু বেড়া পৌর এলাকার মোহনগঞ্জ মহল্লার ১০-১২টি আড়তকে কেন্দ্র করে এ ব্যবসা পরিচালিত হতো। তবে এখন হাটুরিয়া, নাকালিয়া, রাকসা বাজার, নগরবাড়িসহ উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় গড়ে উঠেছে একাধিক পাইকারি আড়ত।

প্রতিটি আড়তে গড়ে ১৫ থেকে ২০ জন শ্রমিকের নিয়মিত কর্মসংস্থান তৈরি হয়েছে। কেউ মালপত্র বাছাই করছেন, কেউ স্কেলে ওজন মেপে লরিতে তুলছেন, আবার কেউ ভারী মালপত্র আনলোডের কাজে ব্যস্ত। জগন্নাথপুর গ্রামের বাসিন্দা রব্বানী তেমনই একজন আড়ত শ্রমিক। মাসে ১৭ হাজার টাকা বেতন পান। এতেই পাঁচ সদস্যের পরিবার চালান তিনি। তিনি বলেন, ‘আড়তে কাজ করে যে টাকা পাই, তা দিয়ে মা-বাবা ও ভাইবোনদের নিয়ে কোনোমতে সংসার চলে। এ কাজ না থাকলে বিপদে পড়তে হতো।’

খালি চোখে একে অপ্রাতিষ্ঠানিক বা নিছক ‘ভাঙারি ব্যবসা’ মনে হলেও আধুনিক অর্থনৈতিক বিশ্লেষণে এটি ‘সার্কুলার ইকোনমি’ বা পরিবেশবান্ধব পুনর্ব্যবহারযোগ্য অর্থনীতির অন্যতম ভিত্তি। মোহনগঞ্জের প্রবীণ আড়তদার আলহাজ লাল মিয়া জানান, স্থানীয়ভাবে সংগৃহীত বর্জ্য শ্রেণিবদ্ধ করে ধরন ও মান অনুযায়ী কেনাবেচা হয়। 

আড়তগুলোয় প্রাথমিক প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার পর ট্রাকবোঝাই এসব ভাঙারি মালপত্র চলে যায় সাভার, গাজীপুর ও রাজধানীর শ্যামপুরের বৃহৎ পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানাগুলোয়। সেখানে পুরোনো লোহা ও ধাতব বর্জ্য গলিয়ে তৈরি হয় নতুন রড, টিন ও যন্ত্রাংশ। প্লাস্টিক বর্জ্য দানা বানিয়ে রূপ দেওয়া হয় নতুন গৃহস্থালি সামগ্রীতে। এভাবে ঘরের কোণে জমা হওয়া বর্জ্য আবার ফিরে আসে জাতীয় শিল্পোৎপাদনের মূল ধারায়; যা দেশের মূল্যবান বৈদেশিক মুদ্রা ও প্রাকৃতিক সম্পদ রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

তবে হাজারো মানুষের জীবিকার জোগান দেওয়া এ সম্ভাবনাময় খাতের আড়ালে লুকিয়ে আছে তীব্র নিরাপত্তা ও স্বাস্থ্যঝুঁকি। গ্লাভস, বুট বা কোনো ধরনের সুরক্ষাসামগ্রী ছাড়াই প্রতিদিন ধারালো লোহা, মরিচাধরা টিন ও ভাঙা কাচ নাড়াচাড়া করতে হয় শ্রমিকদের।

বেড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা (আরএমও) ডা. মিলন মাহমুদ বলেন, ‘সুরক্ষাসামগ্রী ছাড়া মরিচাধরা লোহা ও ভাঙা কাচ নিয়ে কাজ করার ফলে শ্রমিকরা নানা ক্ষতিকর সংক্রমণের ঝুঁকিতে থাকেন। এ ছাড়া ইলেকট্রনিক বর্জ্য যদি যেখানে-সেখানে রাখা হয়, তবে তা থেকে ক্ষতিকর রাসায়নিক ও ভারী ধাতু ছড়িয়ে পড়ে; যা পরিবেশ ও দীর্ঘমেয়াদে জনস্বাস্থ্যের ভয়ানক ক্ষতি করতে পারে।’

আড়তদার ও ব্যবসায়ীদের মতে, ভাঙারি খাতকে যদি সুনির্দিষ্ট শিল্প জোনে স্থানান্তর করা যায় এবং প্রক্রিয়াজাতকরণের স্থান নির্ধারণ করে দেওয়া হয়, তবে দূষণ অনেক কমানো সম্ভব।

আরও পড়ুন

×