ঢাকা মঙ্গলবার, ২১ জুলাই ২০২৬

এইচআরডব্লিউর বিবৃতি

আবার গুমের অভিযোগ, দ্রুত খুঁজে বের করার আহ্বান

মোংলায় তুলে নিয়ে যাওয়ার পর সাড়ে তিন মাস ধরে যুবক ‘নিখোঁজ’

আবার গুমের অভিযোগ, দ্রুত খুঁজে বের করার আহ্বান
×

অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশ: ২১ জুলাই ২০২৬ | ০৮:১১ | আপডেট: ২১ জুলাই ২০২৬ | ১১:৩৩

| প্রিন্ট সংস্করণ

দুই বছর পর বাংলাদেশে আবার গুমের অভিযোগ উঠেছে বলে উল্লেখ করে উদ্বেগ জানিয়েছে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ)। একই সঙ্গে জোরপূর্বক গুম প্রতিরোধে নেওয়া সংস্কার বাতিলের সিদ্ধান্ত থেকে সরকারের সরে আসা উচিত বলেও জানিয়েছে সংস্থাটি। গত রোববার দেওয়া এক বিবৃতিতে এইচআরডব্লিউ এসব মন্তব্য করেছে। গত এপ্রিল মাসে বাগেরহাটের মোংলা থেকে কোস্টগার্ডের সদস্য পরিচয়ে মিরাজ শেখ নামে এক যুবককে তুলে নিয়ে যাওয়ার অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে এ বিবৃতি দেওয়া হয়। প্রায় সাড়ে তিন মাসেও ওই যুবকের সন্ধান পায়নি পরিবার। ঘটনাটিকে ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশে গুমের প্রথম ঘটনা হিসেবে উল্লেখ করেছে এইচআরডব্লিউ। সংস্থাটি ওই যুবককে খুঁজে বের করার পাশাপাশি গুম রোধে নিরাপত্তা বাহিনীগুলোর জবাবদিহি নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় আইনি ও কাঠামোগত সংস্কারের দাবি জানিয়েছে। 

মিরাজ শেখের বাড়ি সুন্দরবন-সংলগ্ন মোংলার জয়মণি গ্রামে। তিনি পেশায় জেলে। গত ১০ এপ্রিল মিরাজ শেখ নিখোঁজ হন। নিখোঁজ হওয়ার ১৩ দিন পর ২৩ এপ্রিল মিরাজের স্ত্রী মুক্তা খানম মোংলা থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন। ৮ মে মোংলা প্রেস ক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করে পরিবারের সদস্যরা মিরাজের সন্ধান দাবি করেন। পরে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সরকারি দপ্তরে লিখিত আবেদন করা হয়। এর পরও দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি না হওয়ায় গত ১১ জুন জয়মণি এলাকায় মানববন্ধনের আয়োজন করেন এলাকাবাসী ও স্বজনরা।

মিরাজের পরিবার জানায়, ওই কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে কোস্টগার্ডের সঙ্গে গ্রামবাসীর সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। কোস্টগার্ড বাদী হয়ে মোংলা থানায় একটি মামলা করে। মামলায় অন্যদের সঙ্গে মিরাজের মা তাসলিমা বেগম, স্ত্রী মুক্তা খানম ও বোন লিজা ইসলামকেও আসামি করা হয়। পরে তারা তিনজন গ্রেপ্তার হয়ে ২৭ দিন কারাভোগের পর জামিনে মুক্তি পান। 

গত ১২ জুলাই বিচারপতি আহমেদ সোহেল ও বিচারপতি ফাতেমা আনোয়ারের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ মিরাজের বাবা মো. মোস্তফা শেখের করা রিট আবেদনের প্রাথমিক শুনানি শেষে রুল জারি করে ১৫ কার্যদিবসের মধ্যে মিরাজকে আদালতে হাজির করার নির্দেশ দেন। 

এইচআরডব্লিউ জানায়, হাইকোর্ট ১৫ দিনের মধ্যে মিরাজকে খুঁজে বের করে আদালতে হাজির করার নির্দেশ দিয়েছেন। আদালতের আদেশ অবিলম্বে কার্যকর করার দাবি জানিয়েছে এইচআরডব্লিউ।
বিবৃতিতে এইচআরডব্লিউর এশিয়া অঞ্চলের উপপরিচালক মীনাক্ষী গাঙ্গুলী বলেন, ‘শেখ হাসিনার ১৫ বছরের শাসনামলে হাজারো মানুষ গুমের শিকার হয়েছেন। এখনকার এই ঘটনাটি প্রমাণ করে– সত্যিকারের সংস্কার ছাড়া এসব ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটতে পারে। এটা পরিষ্কার– বাংলাদেশের নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর মধ্যে এ ধরনের চর্চা গেঁথে গেছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘নতুন সরকারের উচিত নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কাঠামোগত সংস্কার ও জবাবদিহির ব্যবস্থা করা।’

বিবৃতিতে বলা হয়, অন্তর্বর্তী সরকার গুম প্রতিরোধ ও স্বাধীন তদন্তের লক্ষ্যে একটি অধ্যাদেশ জারি করেছিল। কিন্তু বর্তমান নির্বাচিত সরকার সেটি বাতিল করে নতুন একটি আইন প্রস্তাব করেছে। প্রস্তাবিত আইনে মানবাধিকার কমিশনের স্বাধীন তদন্তের ক্ষমতা ক্ষুণ্ন হবে এবং গুমের তদন্তভার পুলিশের হাতেই থাকবে।

মীনাক্ষী গাঙ্গুলী বলেন, নতুন সরকারের উচিত মানবাধিকার কমিশনের ওপর যে কোনো ধরনের হস্তক্ষেপ দূর করা এবং গুমের ঘটনা তদন্তে তাদের ক্ষমতা ফিরিয়ে দেওয়া। পুলিশের ওপর গুমের তদন্তভার ছেড়ে দিলে জবাবদিহি নিশ্চিত হবে না এবং এ ধরনের চর্চা বন্ধে প্রয়োজনীয় চাপও তৈরি হবে না।

‘ছেলেটা বেঁচে আছে, না মরে গেছে, এটুকুও জানি না’

নিখোঁজের পরদিন থেকেই মিরাজের পরিবার কোস্টগার্ডের দিগরাজ বেইজ, হারবারিয়া ক্যাম্প, মোংলা থানা এবং প্রশাসনের বিভিন্ন দপ্তরে ছুটে বেড়ালেও কোনো সুরাহা হয়নি বলে অভিযোগ। মিরাজের মা তাসলিমা বেগম কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘আমার ছেলেডারে সবার সামনে ধইরা নিয়ে গেছে। যদি কোনো অপরাধ করে থাকে; আইনের মাধ্যমে বিচার হোক। কিন্তু আমার ছেলেটা কোথায়, বেঁচে আছে, না মরে গেছে– এটুকুও তো জানি না। আমি শুধু আমার ছেলেকে ফেরত চাই।’

মিরাজের স্ত্রী মুক্তা খাতুন বলেন, ‘ছোট ছেলে প্রতিদিন বাবাকে খোঁজে। তাকে শুধু বলি, বাবা আসবে। কিন্তু আমিই জানি না, তার বাবা কোথায়।’ তিনি বলেন, ‘স্বজন হারিয়েছি; মিথ্যা মামলায় জেলও খেটেছি। এখন আল্লাহ ছাড়া আর উপায় কী!’

মিরাজের বোন লিজা ইসলাম জানান, বর্তমানে তাঁর ভাবি ও মাকে নিয়ে নিরাপত্তাহীনতার আশঙ্কায় বাড়ি না থেকে খুলনায় আত্মীয়দের বাড়িতে থাকছেন। 

পুলিশের মোংলা সার্কেলের এএসপি রেফাতুল ইসলাম বলেন, মিরাজ শেখের নিখোঁজের ঘটনায় তদন্ত চলছে। তাকে খুঁজে বের করতে পুলিশের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় তৎপরতা অব্যাহত রয়েছে।
কোস্টগার্ড পশ্চিম জোনের (মোংলা) মিডিয়া কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কমান্ডার মাহবুব হোসেন বলেন, মিরাজ শেখের নিখোঁজের ঘটনায় কোস্টগার্ডের কোনো সম্পৃক্ততা নেই। একটি মহল পরিকল্পিতভাবে বাহিনীর চলমান অভিযানকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে এ ধরনের অভিযোগ তুলছে।

মিরাজের পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, নিখোঁজ হওয়ার দিন সকালে সুন্দরবন থেকে বাড়ি ফিরে বিশ্রাম নিচ্ছিলেন মিরাজ। বিকেলে একটি অচেনা নম্বর থেকে তাঁর মোবাইল ফোনে কয়েক দফা ফোন আসে। এরপর তিনি বাড়ি থেকে বের হন। সন্ধ্যা ৭টার দিকে জয়মণি ঠোটা এলাকার একটি চায়ের দোকানের সামনে পৌঁছালে সাদা পোশাকধারী দুই ব্যক্তি 

নিজেদের কোস্টগার্ড সদস্য পরিচয় দিয়ে তাঁকে একটি বোটে তুলে নিয়ে যান। এর পর থেকেই তাঁর মোবাইল ফোন বন্ধ পাওয়া যায়; খোঁজও মিলছে না।

আরও পড়ুন

×