ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

আমাদের ববিতা

আমাদের ববিতা
×

ববিতা

 অনিন্দ্য মামুন

প্রকাশ: ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | ০৭:১৪

| প্রিন্ট সংস্করণ

শহর ছিল ভালোবাসা দিবস আর ফাল্গুনের সাজে রঙিন। শহরের প্রধান সড়ক থেকে শুরু করে অলিগলিতে বাসন্তী রঙের পোশাক পরা মানুষের উপস্থিতি ভিন্ন এক আমেজ ছড়িয়েছিল। মাথার ওপর আচড়ে পড়ছিল নরম রোদের কোমল স্পর্শ। এমন এক দিনে গুলশান দুই-এর দিকে ছুটছিল গাড়ি। চারদিকে নীরবতা, মানুষের কোলাহল কম। ধনীদের এলাকা হওয়ায় সবকিছুই যেন ঝকঝকে তকতকে। গুলশান দুই-এর লেকের ধারে একটি ভবনের ১১ ও ১২ তলায় থাকেন উপমহাদেশের আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন নায়িকা ববিতা। গাড়ি গিয়ে থামল সে বাসার সামনে। ভবনটি আধুনিক স্থাপত্যশিল্পের উজ্জ্বল এক প্রমাণ হয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে গুলশানের বুকে। নায়িকার বাড়ি বলে কথা! গেট দিয়ে প্রবেশ করতেই অন্যরকম এক আবেশ ছুঁয়ে গেল যেন। নব্বইয়ের দশকের নায়িকার বাড়ি তো!
ববিতা থাকেন একেবারে রুফটপে–আকাশের খুব কাছাকাছি। প্রতিবেশী হিসেবে রয়েছে বিশাল ছাদবাগান। কলিংবেল চাপতেই দরজা খুলে চিরচেনা হাসিতে বরণ করে নিলেন তিনি। এখনও কত নান্দনিক ববিতা। সৌন্দর্যবোধ, পরিপাটি উপস্থিতি আর অভ্যর্থনার ভঙ্গি– সবই এখনও কত অনিন্দ্য। ড্রয়িংরুমে ঢুকতেই চোখ আটকে যায় একটি কাচঘেরা শোকেসে। সেখানে সাজানো তাঁর অভিনয় জীবনের অগণিত প্রাপ্তি–পুরস্কার, সম্মাননা, স্মারক। এসব দেখছিলাম আর  মনে হচ্ছিল যেন সিনেমার ভেতরেই হাঁটছি।
এবার একুশে পদক পাচ্ছেন ববিতা। সেই আনন্দের অনুভূতি জানতেই তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ। তাই সাক্ষাতের শুরু অভিনন্দন জানাতেই আনন্দে গদগদ হয়ে উঠলেন অশনিসংকেতের এই নায়িকা। বলতে শুরু করলেন, ‘আমি অনেক খুশি, অনেক বেশি আনন্দিত। কেননা, ভাষার মাসে একুশে পদক পাচ্ছি। ভাষার মাসে একুশে পদক প্রাপ্তি আমার জীবনের বড় প্রাপ্তি। অনেক বেশি সুখের অনুভূতি কাজ করছে।’
অনুভূতি জানাতে জানাতেই বললেন, কয়েকদিন আগেই কানাডা থেকে দেশে এসেছেন। কথা বলছিলাম আর এদিক ওদিক অবাক হয়ে দেখছিলাম বাসার ডেকোরেশন। বসার ঘরে ঢুকেই ডান দিকে ছোট্ট বারান্দা। ববিতা জানালেন, সেখানে একটিতে টিয়া ও একটি ময়না পাখি থাকত আগে। বাড়িতে কোনো অতিথি এলেই সশব্দে কেউ একজন ববিতার মতোই হেসে উঠত। ববিতা জানালেন, ‘ওই ময়নাটা মারা গেছে। সে হুবহু আমাকে নকল করে কথা বলত। এ কথা বলতে বলতেই ববিতার চোখে ছলছল করে উঠল। ববিতার বাসায় প্রবেশ করতেই প্রথমে দেখা মিলবে একটি বাঁশঝাড়ের। শুধু তাই নয়, রয়েছে বিভিন্ন রকম গাছ আর পাতায় সবুজের অরণ্য। ডান দিকের পুরো দেয়াল বেয়ে নেমে গেছে নানা প্রজাতির সবুজ গাছ। তাঁর বাগানে রয়েছে গাঁদা, ডালিয়া, জবা, চন্দ্রমল্লিকা, ক্রিসেনথিমাম, কলাবতী, ক্যাকটাস, তিবুচিনিয়া, কানকা, হাইডেনজিয়া, শকিং পিঙ্ক, ডেন্টাস, কসমস, বার্বিয়া, সালভিয়া ও ইমপ্রেশন। ফোয়ারার পানিতে শাপলা, আছে নাইটকুইনও। ববিতাই বলছিলেন সব। সঙ্গে এও জানালেন, নাইটকুইনগুলোয় একসঙ্গে ২০ থেকে ৩০টি ফোটে।
এই যে বিশাল বাড়ি, এই বাড়িতে ববিতার সবসময় থাকা হয় না। কানাডা আর বাংলাদেশ মিলিয়েই থাকা হয় তাঁর। কানাডায় একমাত্র ছেলে থাকেন। ছেলের কাছেই বছরের অর্ধেকটা সময় থাকা হয়। এরপর চলে আসেন। এবার এসেই দারুণ খবরটি পেলেন–একুশে পদকপ্রাপ্তির খবর। ববিতার সঙ্গে কথা বলতে বলতে সূর্য যেন ঢলে পড়ছিল। তাই আলো থাকতে থাকতেই অভিনেত্রী বললেন, চলো ছাদবাগানটা ঘুরে দেখাই। ছাদবাগানে গিয়ে ববিতা এতক্ষণ যে বর্ণনা দিচ্ছিলেন তার প্রমাণ মিলল। বাগান দেখার ফাঁকে ফাঁকে ববিতা বলতে লাগলেন, ‘‘জীবনে অনেক পুরস্কার পেয়েছি। বাংলাদেশে বহুবার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পেয়েছি। একবার পেয়েছি জাতীয় চলচ্চিত্রে আজীবন সম্মাননা। কলকাতা এবং আরও অনেক দেশ থেকে পুরস্কার পেয়েছি। ডালাসের মেয়র আমাকে আজীবন সম্মাননা দিয়েছেন। এ ছাড়া ডালাসের মেয়র একটি দিনকে ‘ববিতা দিবস’ ঘোষণা করেছিল। কিন্তু, আমার সব পুরস্কারকে ছাড়িয়ে গেছে একুশে পদক।’’
কথা বলতে বলতে সন্ধ্যা ঘনিয়ে এলো চারদিকে। অন্ধকারে ববিতার ছাদবাগানের হরেক রকম ফুলেরা যেন বলছিল এবার ভেতরে গিয়ে বসুন। সেখানে নাশতা রেডি হচ্ছে। তার সঙ্গে সুর মিলিয়ে ববিতাও বললেন চলুন, ভেতরে গিয়ে বসি। ভেতরে প্রবেশ করেই অভিনেত্রীর স্বীকৃতি অর্জনের শোকেসের সামনে দাঁড়ালাম। কত নামে, কত কত সম্মান। একজীবনে সিনেমার জন্যই কেবল এত অর্জন তাঁর। 
পেছন থেকে এসে দাঁড়ালেন ববিতা। স্মৃতির ঝাঁপি খুলে বলতে লাগলেন পুরস্কার গ্রহণের নানা মুহূর্তের কথা। সবশেষে মৃদু কণ্ঠে বললেন–এই স্বীকৃতিগুলো আমার বাসায় আছে ঠিকই, কিন্তু এগুলো আসলে সবার। আমার দর্শকদের। তাদের ভালোবাসাতেই আমি ববিতা হয়ে উঠেছি। 

ববিতা বললেন

‘শিল্পীদের অবসর হয় না’

একুশে পদক প্রাপ্তিতে অনুভূতি কী?
আমি অনেক খুশি, অনেক বেশি আনন্দিত। সরকারকে ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা অবশেষে তারা এই সম্মানের জন্য আমাকে  উপযুক্ত মনে করেছেন। জীবনে অনেক পুরস্কার পেয়েছি। এ পুরস্কারের আনন্দ সবার ওপরে মনে হচ্ছে। 
পুরস্কারটি আপনার আরও আগে পাওয়া উচিত ছিল বলে কী মনে করেন?
আমি কী মনে করছি সেটা এখন বড় বিষয় না। বড় বিষয় হচ্ছে, আমাকে সম্মাননা দেওয়া হয়েছে। তবে এটি ঠিক অনেকবার মনে হয়েছে অনেকেই তো সম্মাননাটা পাচ্ছে, আমি কেন পাচ্ছি না। এতদিন পাইনি এখন পেলাম।  
একুশে পদকটি আপনি জহির রায়হানকে উৎসর্গ করেছেন। কারণ কী?
জহির রায়হান আমাকে চলচ্চিত্রে এনেছেন। আজকের যে ববিতা আপনারা দেখছেন, তার গোড়াপত্তন ও আমাকে তৈরি করাটা তো তাঁর মাধ্যমেই। কাজেই তাঁকেই তো উৎসর্গ করব নাকি? এ ছাড়াও আমার দীর্ঘ ক্যারিয়ারে দর্শক থেকে শুরু করে আমার শুভাকাঙ্ক্ষি সবার অবদান রয়েছে। তাদের প্রতি ভালোবাসা, কৃতজ্ঞতা। 
সিনেমার জন্যই তো সম্মাননা পেলেন। কিন্তু আজকাল তো আপনাকে সিনেমায় দেখা যায় না?
দেখুন, পাশের দেশে এখনও  অমিতাভ বচ্চন ও রেখাদের বেইজ করে গল্প তৈরি হয়। আমাদের এখানে তো তা হয় না। আমাদের বেলায় হয়– আরও অভিনয় করবেন ববিতা। কেবল মা-বাবার একটু চরিত্র দিয়েই শেষ। চরিত্রের কোনো গভীরতা থাকে না, অভিনয়ের কোনো জায়গা থাকে না। এমন হলে তো অভিনয় করা হবে না। তাহলে আর অভিনয় করবেন না?
কেন করব না, আমি কোথাও বলিনি অভিনয় থেকে বিদায় নিয়েছি। শিল্পীদের অবসর হয় না। আমি তো অভিনয় করতে চাই। সেটি কেবল ‘আরও অভিনয় করবেন ববিতা’ এ জাতীয় অভিনয় না। 

 

মাসুদ পারভেজ

ববিতা এককথায় ভালো অভিনেত্রী ছিল। চলচ্চিত্রের অভিনেত্রী হতে যা যা লাগে, সবই তার মধ্যে বিদ্যমান। ববিতার সঙ্গে অনেক ছবিতেই কাজ করা হয়েছে আমার। সেটি দর্শকদের চাহিদার কারণেই করা হয়েছে। বলা যায়, আমি আর ববিতা সিনেমায় একরকম জুটি হয়েই সিনেমা করতে থাকি। ববিতা সেই শুরু থেকেই নিজের প্রতি দারুণ সচেতন। একটি ঘটনা বলি, আমি যখন অসুস্থ হয়ে চিকিৎসার জন্য সিঙ্গাপুরে গিয়েছিলাম, সেখানে গিয়েও ববিতার সঙ্গে দেখা হয়। জিজ্ঞাসা করি তুমি এখানে কী কর, সে জানাল বডি চেকআপ করাতে এসেছে। জানতে চাইলাম কোনো অসুখ-বিসুখ হয়েছে কিনা। সে জানায়, না। এমনিতে শরীর চেকআপ করাতে গিয়েছে। তার মানে এখনও সে কতটা সচেতন নিজেকে নিয়ে। এটা ববিতার বেশ ভালো একটা গুণ। এখন ববিতা একুশে পদক প্রাপ্তির সম্মাননা পেয়েছে। তার জন্য শুভকামনা থাকল। 

উজ্জ্বল

ববিতার সঙ্গে অভিনয় করেছি ‘অরুণোদয়ের অগ্নিসাক্ষী’, ‘ইয়ে করে বিয়ে’, ‘ঘরবাড়ি’, ‘অপবাদ’, ‘বীরাঙ্গনা সখিনা’, ‘শনিবারের চিঠি’, ‘বন্ধু’সহ আরও বেশ কয়েকটি চলচ্চিত্রে। রোমান্টিক ধারার সিনেমায় নায়ক হিসেবে দর্শকের ভালোবাসা পাওয়ার পর সামাজিক ও ভিন্নধর্মী গল্পের সিনেমায় কাজের প্রস্তাব পেতে শুরু করি। তেমনি একটি উল্লেখযোগ্য সিনেমা ছিল ‘শনিবারের চিঠি’। এতে ববিতার সঙ্গে আমার জুটিকে দর্শক বেশ সাদরে গ্রহণ করেছিলেন। সিনেমায় ববিতার ছিল আলাদা গ্রহণযোগ্যতা ও মর্যাদা। অভিনয়ের প্রতি নিষ্ঠা, সংলাপ বলার ভঙ্গি আর ক্যামেরার সামনে তাঁর উপস্থিতি ছিল মুগ্ধ করার মতো। শুধু দেশেই নয়, আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলেও তিনি কৃতিত্বের স্বাক্ষর রেখেছেন। 

ইলিয়াস কাঞ্চন

বরেণ্য নির্মাতা সুভাষ দত্তের ‘বসুন্ধরা’ সিনেমার মাধ্যমে চলচ্চিত্রে অভিষেক ঘটে আমার। এ সিনেমায় আমার বিপরীতে অভিনয় করেন ববিতা। সিনেমাটি মুক্তির পর অনেকেই আমাদের নিয়ে সিনেমা নির্মাণের প্রস্তাব দেন। এরপর জুটি হয়ে তাঁর সঙ্গে অনেক কাজ করেছি। তবে প্রথম সিনেমার শুটিংয়ে স্মৃতি আজও অমলিন। ববিতার প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান থেকে নির্মিত চলচ্চিত্রেও নায়ক ছিলাম আমি। তাঁর সঙ্গে যখন আমার অভিষেক হয় তখন ববিতার অনেকগুলো সিনেমা মুক্তি পেয়েছে, পরিচিতি এসেছে। আমাদের কাজ দর্শকপ্রিয়তাও পেয়েছে, ব্যবসা সফলও হয়েছে। ব্যক্তি মানুষ হিসেবে অমায়িক। যখনই কথা হতো মুখে হাসি লেগেই থাকত। শুটিং সেটে অনেক হাসি আনন্দে সময় কাটত দুজনের। সিনেমার বাইরেও পারিবারিক একটা সম্পর্ক গড়ে উঠে আমাদের মাঝে। সুন্দর সম্পর্কটা এখনও বিদ্যমান। 

আরও পড়ুন

×