মনে পড়ে
মনের আয়নায় মিষ্টি মেয়ে কবরী
কবরী (১৯৫০-২০২১)
ফরিদুর রেজা সাগর
প্রকাশ: ১৬ জুলাই ২০২৬ | ০৭:২৬
| প্রিন্ট সংস্করণ
একটি স্মৃতি খুব মনে পড়ে। একবার দিল্লি গেলাম কবরী আপার সঙ্গে। তখন তিনি সংসদ সদস্য। তিনি আমাদের দলনেতা। দিল্লিতে আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব। আমরা সেখানে যাচ্ছি। এয়ারপোর্টে এসে দেখা গেল কবরী আপার ভিসা শেষ হয়ে গেছে দুই মাস আগে। তিনি খেয়াল করেননি। শিল্পীসুলভ ভুলোমন। কবরী আপা ছিলেন খুবই সরল। সরকারি প্রতিনিধি এবং সংসদ সদস্য। এই জন্য ভিসা ছাড়াই তিনি যেতে পারলেন। সরকারি বিশেষ ব্যবস্থায় তিনি দিল্লি চলচ্চিত্র উৎসবে অংশ নিলেন। কিছুদিন ধরে কবরী আপা বলতেন, সাগর, আমি একটা ছবি বানাতে চাই। তুমি হবে প্রযোজক।
আমি বললাম, রাজি। কিছুদিনের মধ্যেই ‘এই তুমি সেই তুমি’ সিনেমার চিত্রনাট্যের জন্য অনুদান পেলেন। ইমপ্রেস টেলিফিল্মের সঙ্গে যৌথভাবে ছবিটা শুরু করলেন। একদিন আমাদের অফিসে তাঁর সঙ্গে ফিল্ম নিয়ে কথা হচ্ছে। এমন সময় খবর পাওয়া গেল সংগীত পরিচালনার জন্য রুনা লায়লা জাতীয় পুরস্কার পেয়েছেন। শুনে কবরী আপা খুব খুশি।
তারপর কবরী আপা আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, সাবিনা ইয়াসমিন কি সংগীত পরিচালক হিসেবে জাতীয় পুরস্কার পেয়েছেন?
আমি বললাম, না।
তবে আপনার সাম্প্রতিক ছবিতে তাঁকে নিতে পারেন।
সাবিনা ইয়াসমিন কী কাজ করবেন?
তিনি বললেন, কেন নয়।
এই প্রসঙ্গে আরেকটি গল্প মনে পড়ছে। সাবিনা ইয়াসমিনের কণ্ঠে ‘রংবাজ’ ছবিতে কবরীর কণ্ঠে সেই বিখ্যাত গানটি। সে যে কেন এলো না...। গানটির শুরুতে ... ‘ধ্যাততারি’ একটা শব্দ আছে। সেই শব্দটি খুব বিখ্যাত হয়। কিন্তু গল্পটা হচ্ছে– কবরীর জন্য অপেক্ষা করতে করতে সাবিনা ইয়াসমিন ধৈর্যহারা হয়ে যান। তারপর গানের শুরুতে ‘ধ্যাততারি’ শব্দটি বলে উঠেছিলেন অনেকটা মেজাজ খারাপ করেই। শব্দটির উচ্চারণ ও প্রাসঙ্গিক হওয়ায় সংগীত পরিচালকও তা আর কেটে ফেলেননি। গল্পটি শোনাতেই কবরী আপা হেসে উঠলেন।
মনে আছে, একবার ঠিক হলো প্রতিবারের মতো কচি-কাঁচার মেলার ভাইবোনেরা মিলে পিকনিকে যাওয়া হবে। বাসায় ফিরে যেই না বলেছি নায়িকা কবরী পিকনিকে যাবেন শুনে তো কনা লাফ দিয়ে উঠল।
এক বাক্যে বলল, আমিও যাব পিকনিকে। কবরী আমার প্রিয় নায়িকা। তাঁর সঙ্গে কথা হবে। দারুণ ব্যাপার।
পিকনিকের দিন কনা কবরী আপাকে দেখে মুগ্ধ। কাছে গিয়ে গড়গড় করে বলতে লাগল কী কী সিনেমা সে দেখেছে নানা সময়ে।
সব শুনে কবরী আপা মিষ্টি করে হাসতে লাগলেন।
আমিও অতি উচ্ছ্বাস ভরে নানা কথা বলতে লাগলাম।
কবরী আপা অতি অমায়িকভাবে বললেন, তোমরা একদিন বাসায় এসো। তোমাদের সঙ্গে গল্প হবে। দুপুরে খাবার সময় কবরী আপা কনাকে পাশে ডেকে নিলেন। খাবার সময়েও তাঁর ব্যক্তিগত জীবনের অনেক গল্প বলতে লাগলেন কনাকে।
কনা মহামুগ্ধ। কবরী আপার অসম্ভব আন্তরিক ব্যবহারে মুগ্ধ না হয়ে উপায় নেই।
চ্যানেল আই শুরু হবার পর নানাভাবে এর সঙ্গে যুক্ত হয়ে গেলেন কবরী আপা। আমন্ত্রণ জানালেই আমাদের নানা ইভেন্টে অতিথি হিসাবে আসতেন।
কবরী আপার প্রথম পরিচালিত ছবি আয়না। কত স্মৃতিই না মনে পড়ে কবরী আপার সঙ্গে।
‘আয়না’ ছবি করতে গিয়ে তিনি বললেন, যে কোনো উপায়ে হোক সুভাষ দত্তকে এই ছবিতে অভিনয় করাতে হবে। কারণ, সুভাষ দত্ত আমার প্রথম গুরু এবং তিনি ঠিকই গুরুকে দিয়ে একটি দৃশ্যে অভিনয় করিয়েছিলেন।
কবরী আপা একদিন গান রেকর্ডিং করতে করোনার মধ্যেই চ্যানেল আই স্টুডিওতে এলেন। সংগীত নিয়ে কাজ হবে। শিল্পী সাবিনা ইয়াসমিনকেও নিয়ে আসা হলো। কবরী আপা আমাকে ফোন দিলেন।
বললেন, সাগর তুমি না এলে কী করে হয়? আজ তো ঐতিহাসিক মুহূর্ত। কবরী-সাবিনা একসঙ্গে কাজ করছে।
আমি বিনয়ের সঙ্গে বললাম, আপা আমাকে তো বাসা থেকে বের হতে দিচ্ছে না। আম্মা খুব দুশ্চিন্তা করেন। শুটিংয়ের সময় আমি অবশ্যই যাব। আপনার কোনো অসুবিধা হবে না।
কবরী আপা বললেন, সুবিধা-অসুবিধার ব্যাপার না। তুমি এলে খুশি হতাম।
যথারীতি গানটা রেকর্ডিং হলো।
গান রেকর্ডিং-এর সময় আপার সঙ্গে দেখা হলো না! চ্যানেল আইয়ের জন্য কবরী আপা একটি ধারাবাহিক নাটক নির্মাণের আবদার করেছিলেন। আমি রাজি হলাম। ‘আবার আসিব ফিরে’ শিরোনামে কবরী আপা তৈরি করলেন সেই সিরিজটি। আসছে ১৯ জুলাই কবরী আপার জন্মদিন। তাঁকে জানানো যাবে না জন্মদিনের শুভেচ্ছা। হবে না কোনো কেক কাটা। কিন্তু প্রতিটি জন্মদিনেই কবরী আপাকে মনে পড়ে। মনে পড়বে আমাদের। মনে পড়বে তাঁকে ঘিরে অনেক স্মৃতি। মনের আয়নায় চিরদিন থাকবেন মিষ্টি মেয়ে কবরী।
- বিষয় :
- বিনোদন