ঢাকা বৃহস্পতিবার, ১৬ জুলাই ২০২৬

ধানের লোকসান ভুলিয়েছে পাবদা রেণুপোনা

ধানের লোকসান ভুলিয়েছে পাবদা রেণুপোনা
×

ক্ষেতলালের রাণীপুকুর গ্রামে পুকুর থেকে পাবদা সংগ্রহ করছেন আব্দুল মজিদ সমকাল

 ক্ষেতলাল (জয়পুরহাট) প্রতিনিধি

প্রকাশ: ১৬ জুলাই ২০২৬ | ০৮:৪২ | আপডেট: ১৬ জুলাই ২০২৬ | ০৮:৫১

| প্রিন্ট সংস্করণ

জন্মের পর থেকেই কৃষির সঙ্গে জড়িয়ে ছিলেন ক্ষেতলাল উপজেলার রাণীপুকুর গ্রামের আব্দুল মজিদ। বছর বছর হাড়ভাঙা পরিশ্রম করে ধানের পর আলু,  আবার আলুর পর ধান বুনেছেন। লাভের মুখ দেখেননি। বছর শেষে ঋণ করে ফসল বুনে লোকসানের বৃত্তেই বন্দি ছিলেন। তবে গত দুই বছরে পাল্টে গেছে সেই দৃশ্যপট। মাঠের ফসলে ভাগ্য না ফিরলেও, মাত্র দুই বিঘার পুকুরে দেশি পাবদার রেণুপোনা চাষ করে বছরে সাড়ে তিন থেকে চার লাখ টাকা আয় করছেন।

আব্দুল মজিদের এই অভাবনীয় সাফল্য দেখে উদ্বুদ্ধ হয়ে এখন পুরো উপজেলায় ছড়িয়ে পড়েছে মাছের নার্সারি। বর্তমানে এই অঞ্চলের প্রায় ২০০ একর জলাশয়ে চাষ হচ্ছে পাবদা, গুলশা, টেংরা, তেলাপিয়া, চিতলসহ বিভিন্ন প্রজাতির দেশি মাছের রেণু।

বেসরকারি সংস্থা এহেড সোস্যাল অর্গানাইজেশন (এসো)-এর মৎস্য বিভাগের পরামর্শ ও সহযোগিতায় দুই বছর আগে মজিদ দুই বিঘার পুকুরে দেশি পাবদা মাছের রেণু চাষ শুরু করেন। প্রথমবার মাত্র ৭০ হাজার টাকা বিনিয়োগ করার ২৪ দিন পর দুই লাখ পাবদা মাছের পোনা বিক্রি করেন ১ লাখ ৫০ হাজার টাকায়। নিট লাভ হয় ৮০ হাজার টাকা। এভাবে বছরে পাঁচবার পাবদা রেণু চাষ করে চার লাখ টাকারও বেশি আয় করছেন।

সফল চাষি আব্দুল মজিদ বলেন, ‘‘ধান আর আলু চাষ করে কোনো উন্নতি করতে পারিনি। কিন্তু ‘এসো’ আমার চোখ খুলে দিয়েছে। দুই বিঘা পুকুরে রেণু চাষ করে আমার ভাগ্যের পরিবর্তন হয়েছে। এবার ভাবছি আরও দুই বিঘা পুকুরে দেশি টেংরা মাছের রেণু চাষ করব। এখন প্রতিদিন এলাকার কৃষকরা আমার পুকুর দেখতে আসেন, তারাও চাষ শুরু করেছেন। এলাকায় আমিই প্রথম দেশি মাছের নার্সারি করেছি, যা দেখে অন্যরা উদ্বুদ্ধ হচ্ছে–ভাবতেই খুব ভালো লাগে।’’

এই অঞ্চলের উৎপাদিত পোনা শুধু স্থানীয় পুকুরেই সীমাবদ্ধ নেই; বরং মোবাইল ফোনেই এর বড় বাজার গড়ে উঠেছে। মাছ বিক্রির উপযোগী হলেই দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জেলা যশোর ও খুলনা থেকে পাইকারি ক্রেতারা মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করে পুকুর পাড়ে এসে নগদ টাকা দিয়ে পোনা কিনে নিয়ে যাচ্ছেন। কৃষকদের মাছের রেণু সরবরাহ থেকে শুরু করে যাবতীয় কারিগরি সহযোগিতা দিয়ে যাচ্ছে বেসরকারি সংস্থা ‘এসো’।

রেণুপোনা চাষে ব্যাপক লাভ হওয়ায় উপজেলার বেলগাড়ি গ্রামের পরিশ্রমী যুবক আব্দুল আলিমও তাঁর দেড় বিঘা পুকুরে তেলাপিয়া মাছের রেণু চাষ শুরু করেছেন। তিনি জানান, তেলাপিয়া মাছের রেণু পুকুরে ছাড়ার মাত্র তিন মাস পর প্রথম চালানেই প্রায় আড়াই লাখ টাকা লাভ হয়েছে। পুকুরে এখনও যে মাছ আছে, সেগুলো বিক্রি করলে লাভ আরও বাড়বে। রেণু চাষে কিছুটা ঝুঁকি থাকলেও লাভ মাঠের ফসলের চেয়ে অনেক বেশি।

বেসরকারি সংস্থা ‘এসো’-এর আঞ্চলিক মৎস্য কর্মকর্তা নাজমুল হাসান বলেন, ‘মাত্র ৭০ হাজার টাকা পুঁজি খাটিয়ে আব্দুল মজিদ ২৪ দিনে ৮০ হাজার টাকা লাভ করেছেন, যা বছরে সাড়ে তিন থেকে চার লাখ টাকায় দাঁড়ায়। এই সফলতা দেখে এখন এলাকার প্রায় ২০০ একর জলাশয়ে দেশি মাছের রেণু চাষ হচ্ছে, যা আমরা নিয়মিত দেখাশোনা করছি।’

মৎস্য কর্মকর্তা মাসুদ রানা জানান, পুরো জেলায় দেশি মাছের চাষাবাদ উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। সরকারি মৎস্য বিভাগের পাশাপাশি বেসরকারি সংস্থার মৎস্য বিভাগও চাষিদের প্রশিক্ষণসহ বিভিন্ন পরামর্শ দিয়ে এই ধারাকে এগিয়ে নিতে কাজ করছে।

আরও পড়ুন

×