খাল খনন প্রকল্পে ভূতুড়ে শ্রমিকের ছড়াছড়ি
জয়পুরহাট প্রতিনিধি
প্রকাশ: ১৬ জুলাই ২০২৬ | ০৮:৪৫ | আপডেট: ১৬ জুলাই ২০২৬ | ০৯:০৩
| প্রিন্ট সংস্করণ
অতিদরিদ্র মানুষের কর্মসংস্থান নিশ্চিত করতে সরকারের কর্মসংস্থান কর্মসূচি (ইজিপিপি)। কিন্তু জয়পুরহাটের কালাই উপজেলার তালোড়া-বাইগুনি খাল পুনঃখনন প্রকল্পে সেই উদ্দেশ্যই প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। প্রায় ৫২ লাখ টাকার প্রকল্পে কাগজে-কলমে ১২৫ জন শ্রমিক দেখানো হলেও বাস্তবে কাজ করেছেন মাত্র ৬০ থেকে ৬৫ জন। অভিযোগ উঠেছে, শ্রমিক তালিকায় প্রকল্প সভাপতির নিকট আত্মীয়-স্বজন, সচ্ছল পরিবারের সদস্য এবং অন্য এলাকার লোকজনের নাম অন্তর্ভুক্ত করে সরকারি অর্থ আত্মসাতের চেষ্টা করা হয়েছে। একই সঙ্গে শ্রমনির্ভর প্রকল্পে নিয়ম ভেঙে অধিকাংশ কাজ করা হয়েছে এক্সক্যাভেটর (ভেকু) দিয়ে।
উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, উদয়পুর ইউনিয়নের তালোড়া-বাইগুনি এলাকায় ২ হাজার ১০০ মিটার খাল পুনঃখননের জন্য চলতি বছর ৫২ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। মে মাসে প্রকল্পের কাজ শুরু হয়ে ৩০ জুন শেষ হওয়ার কথা ছিল। তবে নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ না হওয়ায় ৮ লাখ ২৫ হাজার টাকা সরকারি কোষাগারে ফেরত দিতে হয়েছে। বর্তমানে প্রকল্পটির কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে বলে জানানো হলেও সরেজমিনে কয়েকজন শ্রমিককে হাতে কোদাল নিয়ে কাজ করতে দেখা যায়। তবে খালের অধিকাংশ অংশ ভেকু দিয়ে খনন করা হয়েছে।
স্থানীয়দের দাবি, প্রকল্প চলাকালে কোনো দিনই ৬০-৬৫ জনের বেশি শ্রমিক মাঠে কাজ করেননি। অথচ প্রকল্প সভাপতির জমা দেওয়া তালিকায় ১২৫ জন শ্রমিকের নাম রয়েছে। তালিকা পর্যালোচনায় দেখা গেছে, একাধিক ব্যক্তি পেশাদার দিনমজুর নন। তাদের মধ্যে রয়েছেন তুহিন মাহমুদ, আবুল হোসেন, সাজ্জাদুল ইসলাম, আনোয়ার হোসেন, রমজান আলী প্রামাণিক, রেজাউল হক, এনামুল হক সরকার, রুবেল হোসেন, মফিদুল ইসলাম, মামুনুর রশিদ প্রামাণিক, তারেকুল ইসলাম, তৌফিকুল ইসলাম, এনামুল হক প্রামাণিক, মাহমুদুল হাসান ও আবু জাহের ফকির। এ ছাড়াও তালিকায় প্রকল্প সভাপতি ও স্থানীয় বিএনপি নেতা আমজাদ হোসেনের আপন ছোট ভাই আলমগীর ও আমিনুল ইসলাম, চাচাতো ভাই জিয়াউর রহমান ও সুজাউল ইসলাম, মামা সানাউল হক মণ্ডল এবং ভাতিজা এসআই পাশার নামও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। একই তালিকায় স্থানীয় এক আওয়ামী লীগ নেতার শ্যালক এম এ ফারুক হোসেনের নামও রয়েছে।
শুধু তালিকায় নাম অন্তর্ভুক্ত করাই নয়, শ্রমিকদের ব্যাংক হিসাব নিয়েও হয়েছে অনিয়ম। তালিকার ৬১ নম্বর শ্রমিক রুবেল হোসেনের ব্যাংক হিসাবের সঙ্গে প্রকল্প সভাপতির ছোট ভাই আরিফুল ইসলামের মোবাইল নম্বর যুক্ত করা হয়েছে। একইভাবে ৬০ নম্বর শ্রমিক হাফেজ আকন্দের চেকে আরিফুল ইসলাম স্বাক্ষর করে টাকা উত্তোলন করেছেন বলে অভিযোগ। ওই হিসাবের সঙ্গে সভাপতির মেয়ে আমিনা খাতুন তিশার মোবাইল নম্বর যুক্ত ছিল বলেও দাবি স্থানীয়দের।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক শ্রমিক তালিকাভুক্ত কয়েকজন জানান, তাদের দিয়ে কখনও কাজ করানো হয়নি। শুধু চেকে স্বাক্ষর নেওয়া হয়েছিল। পরে ব্যাংক থেকে প্রায় ১০ হাজার টাকা করে উত্তোলন করা হলেও তাদের কেউ ৫০০ থেকে দেড় হাজার টাকা পেয়েছেন, আবার কেউ কোনো টাকাই পাননি।
স্থানীয় বিএনপি নেতা ও তালোড়া-বাইগুনি গ্রামের বাসিন্দা সুমির জালাল বলেন, প্রকল্পে ব্যাপক অনিয়ম হয়েছে। তালিকা যাচাই করলে ৭০ জনের বেশি প্রকৃত শ্রমিক পাওয়া যাবে না। বাকি অধিকাংশই প্রকল্প সভাপতির আত্মীয়-স্বজন।
অভিযোগ অস্বীকার না করে প্রকল্প সভাপতি আমজাদ হোসেন বলেন, ‘এখন প্রকল্পের কাজ করব না তো কী চুরি করে খাব? শ্রমিক তালিকায় আমার ভাই, ভাতিজা ও স্বজনদের নাম আছে তো কী হয়েছে? যা লেখার লিখেন।’
উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা হাসিবুল ইসলাম বলেন, শ্রমিক তালিকায় প্রকল্প সভাপতির কয়েকজন নিকট-আত্মীয় এবং একজন আওয়ামী লীগ নেতার আত্মীয়ের নাম থাকার বিষয়টি নজরে এসেছে। নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ না হওয়ায় ৮ লাখ ২৫ হাজার টাকা সরকারি কোষাগারে ফেরত দেওয়া হয়েছে। বর্তমানে প্রকল্পটি বন্ধ রয়েছে।
ইউএনও শামীম আরা বলেন, অনিয়ম হওয়ার কথা নয়। কাজ শেষ না হওয়ায় বিলও পরিশোধ হয়নি। তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে প্রকল্প সভাপতির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
- বিষয় :
- খাল
- খাল খনন কর্মসূচি
- জয়পুরহাট
- শ্রমিক