ঢাকা বৃহস্পতিবার, ১৬ জুলাই ২০২৬

দ্য ওডিসি

মহাকাব্যিক অভিযান

মহাকাব্যিক অভিযান
×

‘দ্য ওডিসি’ সিনেমার দৃশ্য

মীর সামী

প্রকাশ: ১৬ জুলাই ২০২৬ | ০৭:২৩

| প্রিন্ট সংস্করণ

ক্রিস্টোফার নোলানের নতুন সিনেমা মানেই যেন বিশ্বজুড়ে এক অন্যরকম উৎসব। প্রতিটি পোস্টার, টিজার, এমনকি শুটিং সেটের একটি ছবিও হয়ে ওঠে আলোচনার বিষয়। কারণ, নোলান এমন একজন নির্মাতা, যিনি প্রতিবারই পরিচিত গল্প বলার সীমা ভেঙে দর্শকদের নিয়ে যান নতুন এক সিনেমাটিক অভিজ্ঞতায়। ‘মেমেন্টো’ থেকে ‘ইনসেপশন’, ‘ইন্টারস্টেলার’, ‘ডানকার্ক’ কিংবা ‘ওপেনহেইমার’। প্রতিটি সিনেমাতেই তিনি প্রমাণ করেছেন, বাণিজ্যিক সফলতা ও শিল্পমান একই সুতোয় গাঁথা যেতে পারে। সেই ধারাবাহিকতায় এবার তিনি নিয়ে আসছেন বিশ্বসাহিত্যের অন্যতম প্রাচীন ও প্রভাবশালী মহাকাব্য ‘দ্য ওডিসি’। 
প্রায় তিন হাজার বছর ধরে পাঠকদের মুগ্ধ করে আসা হোমারের সেই অমর কাহিনি এবার নোলানের নির্মাণশৈলী এবং অত্যাধুনিক আইম্যাক্স প্রযুক্তির সংমিশ্রণে হাজির হচ্ছে বড়পর্দায়। আগামীকাল শুক্রবার মুক্তি পাচ্ছে বহুল আলোচিত ‘দ্য ওডিসি’। বিশ্বের অন্যান্য দেশের পাশাপাশি একই দিনে বাংলাদেশের দর্শকরাও রাজধানীর স্টার সিনেপ্লেক্সে দেখতে পারবেন এই সিনেমাটি। 
সাহিত্যের ইতিহাসে এমন কিছু সৃষ্টি রয়েছে, যেগুলো সময়কে অতিক্রম করে প্রজন্মের পর প্রজন্ম মানুষের কল্পনাশক্তিকে প্রভাবিত করেছে। গ্রিক কবি হোমারের ‘দ্য ওডিসি’ তেমনই এক অমর মহাকাব্য। ‘ইলিয়াড’-এর পরবর্তী এই কাহিনি শুধু একজন যোদ্ধার জন্মভূমিতে ফেরার গল্প নয়; এটি মানুষের ধৈর্য, বুদ্ধি, ভালোবাসা, বিশ্বস্ততা, ভাগ্যের নির্মমতা এবং বেঁচে থাকার অদম্য আকাঙ্ক্ষার গল্প। 
হাজার বছরেরও বেশি সময় ধরে ‘দ্য ওডিসি’ অসংখ্য ভাষায় অনূদিত হয়েছে। এবার সেই চিরন্তন কাহিনিকেই আধুনিক প্রযুক্তিতে নতুন করে জীবন্ত করে তুলছেন নোলান।
‘দ্য ওডিসি’ সিনেমায় দেখা যাবে ট্রয় যুদ্ধ শেষ হয়েছে। দশ বছর ধরে যুদ্ধ করে বিজয় অর্জন করেছেন ইথাকার রাজা ওডিসিউস। কিন্তু প্রকৃত যুদ্ধ তখনও বাকি। নিজ রাজ্য, স্ত্রী পেনেলোপি এবং পুত্র টেলেমেকাসের কাছে ফিরে যাওয়ার যাত্রাই হয়ে ওঠে তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা। উত্তাল সমুদ্র, ভয়ংকর সাইক্লোপস, রহস্যময় সাইরেন, জাদুকরী সির্সি, সমুদ্রদানব স্কিলা ও ক্যারিবডিস। প্রতিটি ধাপে মৃত্যুর মুখোমুখি হতে হয় তাঁকে। অন্যদিকে ইথাকায় পেনেলোপি বছরের পর বছর স্বামীর প্রত্যাবর্তনের অপেক্ষায় থেকেও রাজ্যের ক্ষমতালোভী প্রার্থীদের চাপ সামলাতে থাকেন। এই দীর্ঘ বিচ্ছেদ, অপেক্ষা এবং পুনর্মিলনের আকাঙ্ক্ষাই ‘দ্য ওডিসি’কে শুধু পৌরাণিক অভিযান নয়, মানবিক আবেগেরও এক অনন্য দলিলে পরিণত করেছে। 
নোলানের সিনেমায় গল্পের পাশাপাশি চরিত্র নির্বাচনও আলোচনায় থাকে। এবারও তার ব্যতিক্রম হয়নি। ‘দ্য ওডিসি’ সিনেমায় ওডিসিউসের চরিত্রে অভিনয় করেছেন ম্যাট ডেমন। দীর্ঘ ক্যারিয়ারে অসংখ্য বৈচিত্র্যময় চরিত্রে অভিনয় করা এই অভিনেতার জন্য এটিকে অন্যতম চ্যালেঞ্জিং চরিত্র বলেই মনে করছেন সমালোচকরা। 
ছবিতে আরও অভিনয় করেছেন টম হল্যান্ড, জেনডায়া, অ্যান হ্যাথাওয়ে, রবার্ট প্যাটিনসন, শার্লিজ থেরন, লুপিতা নিয়ং’ও, জন বার্নথাল, বেনি সাফদি এবং আরও অনেক তারকা অভিনয়শিল্পী। নোলানের ছবিতে বড় তারকারা কখনোই শুধু নামমাত্র উপস্থিত থাকেন না; প্রত্যেক চরিত্রই গল্পের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে ওঠে। ফলে এই এত এত অভিনয়শিল্পী দলকে ঘিরেও দর্শকদের কৌতূহল তুঙ্গে। 
নোলান সবসময়ই বাস্তব লোকেশন, ব্যবহারিক এফেক্ট এবং ফিল্ম ক্যামেরার ওপর ভরসা করেন। কম্পিউটারনির্ভর দৃশ্যের বদলে বাস্তবতাকে যতটা সম্ভব ক্যামেরাবন্দি করাই তাঁর নির্মাণ দর্শন। ‘দ্য ওডিসি’ সেই দর্শনকে আরও এক ধাপ এগিয়ে নিয়েছে। 
চলচ্চিত্র ইতিহাসের প্রথম মূলধারার ফিচার ফিল্ম হিসেবে এর প্রতিটি দৃশ্য ধারণ করা হয়েছে আইম্যাক্স ৭০ মিলিমিটার ফিল্ম ক্যামেরায়। এই প্রযুক্তি শুধু পর্দায় অসাধারণ রেজল্যুশনই দেয় না; বরং আলো, গভীরতা এবং দৃশ্যের ব্যাপ্তিকেও অন্য মাত্রায় নিয়ে যায়। ফলে সমুদ্রযাত্রা, যুদ্ধের দৃশ্য, পৌরাণিক প্রাণী কিংবা প্রাচীন সভ্যতার বিশাল স্থাপত্য। সবই দর্শকের সামনে আরও জীবন্ত হয়ে উঠবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। শুধু প্রযুক্তিই নয়, এই ছবির নির্মাণ পর্বও ছিল বেশ কঠিন। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের দুর্গম লোকেশন, বিশাল সেট, সমুদ্রকেন্দ্রিক শুটিং এবং অ্যাকশন দৃশ্য নিয়ে কাজ করেছে বিশাল এক ইউনিট। 
নোলানের চলচ্চিত্রে বাস্তব লোকেশনের ব্যবহার সবসময়ই দর্শকদের মুগ্ধ করেছে। ‘ইন্টারস্টেলার’ সিনেমায় বরফাচ্ছন্ন গ্রহ, ‘ডানকার্ক’-এর সমুদ্রসৈকত কিংবা ‘ওপেনহেইমার’-এর মরুভূমির মতোই ‘দ্য ওডিসি’তেও প্রকৃতি গল্পের একটি অসাধারণ এক চরিত্র হয়ে উঠবে বলেই প্রত্যাশা সিনেমাবোদ্ধাদের। 
‘দ্য ওডিসি’ মুক্তির আগেই বিশ্বের বিভিন্ন দেশে আইম্যাক্সের অগ্রিম টিকিট বিক্রিতে রেকর্ড গড়েছে। অনেক জায়গায় প্রথম কয়েক দিনের শোর টিকিট শেষ। সামাজিক মাধ্যমে সিনেমার ট্রেলার, পোস্টার কোটি কোটি মানুষের নজর কেড়েছে। চলচ্চিত্র বিশ্লেষকদের মতে, ‘দ্য ওডিসি’ শুধু একটি সাহিত্যনির্ভর সিনেমা নয়; এটি নোলানের ক্যারিয়ারের সবচেয়ে উচ্চাভিলাষী প্রকল্পগুলোর একটি। কারণ, এখানে তাঁকে একই সঙ্গে পৌরাণিক কাহিনির গভীরতা, মানবিক সম্পর্কের সূক্ষ্মতা, অ্যাকশন এবং প্রযুক্তির মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করতে হয়েছে। 
নোলান বরাবরই দর্শকের বুদ্ধিমত্তার ওপর আস্থা রাখেন। তিনি সহজ উত্তর দেন না; বরং প্রশ্ন তৈরি করেন। তাই অনেকের ধারণা, ‘দ্য ওডিসি’ও শুধু একটি রোমাঞ্চকর অভিযান নয়; বরং মানুষের পরিচয়, সময়, স্মৃতি, নিয়তি এবং ঘরে ফেরার আকাঙ্ক্ষা নিয়ে নতুনভাবে ভাবাবে। 
‘দ্য ওডিসি’ এক অমর মহাকাব্য, সবচেয়ে আলোচিত নির্মাতা, হলিউডের প্রথম সারির অভিনয়শিল্পীদের সমাবেশ এবং নতুন প্রযুক্তির ব্যবহার। সব মিলিয়ে ‘দ্য ওডিসি’কে ঘিরে প্রত্যাশার মাত্রা স্বাভাবিকভাবেই আকাশছোঁয়া। এটি শুধু আরেকটি হলিউড সিনেমা নয়; বরং এমন একটি চলচ্চিত্র, যা সাহিত্য, ইতিহাস, প্রযুক্তি এবং শিল্পকে এক সুতোয় গেঁথে নতুন এক সিনেমাটিক অভিজ্ঞতা উপহার দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে। 
আগামীকাল জানা যাবে, হোমারের তিন হাজার বছরের পুরোনো কাব্যকে ক্রিস্টোফার নোলান কীভাবে নতুন শতকের দর্শকদের জন্য পুনর্জন্ম দিয়েছেন। তবে মুক্তির আগেই একটি বিষয় নিশ্চিত ‘দ্য ওডিসি’ ইতোমধ্যে বছরের সবচেয়ে প্রতীক্ষিত এবং আলোচিত চলচ্চিত্রগুলোর একটি হয়ে উঠেছে। 

আরও পড়ুন

×