ঢাকা বৃহস্পতিবার, ১৬ জুলাই ২০২৬

টানা বর্ষণে ৯৯ হেক্টর জমির ফসল পুরোপুরি নষ্ট

টানা বর্ষণে ৯৯ হেক্টর জমির ফসল পুরোপুরি নষ্ট
×

তলিয়ে যাওয়া জমির পানি সরাতে কৃষকেরা কেটে ফেলেন আঞ্চলিক মহাসড়কের একাংশ। বুধবার পটুয়াখালীর গলাচিপা উপজেলার কলাগাছিয়ায় সমকাল

মুফতী সালাহউদ্দিন, পটুয়াখালী

প্রকাশ: ১৬ জুলাই ২০২৬ | ০৮:৩৯ | আপডেট: ১৬ জুলাই ২০২৬ | ০৮:৫৮

| প্রিন্ট সংস্করণ

টানা বর্ষণে পটুয়াখালীতে রোপা আমনের বীজতলায় ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা না থাকায় জেলার গলাচিপার একটি এলাকার কৃষকেরা আঞ্চলিক মহাসড়ক কেটে দিয়েছেন। এতে ঢাকা-বরিশাল-বগা-গলাচিপা-উলানিয়া রুটে যাত্রীবাহী বাসসহ ভারী সব ধরনের যানবাহন চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে। 

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের দেওয়া তথ্যমতে, বর্ষণে ২ হাজার ৬১৫ হেক্টর জমির রোপা আমনের বীজতলা, আউশ আবাদ, গ্রীষ্মকালীন শাক-সবজি, পাট, পেঁপে, কলা, পানের বরজ, রকমেলন বা সাম্মাম, গ্রীষ্মকালীন মরিচ ও গ্রীষ্মকালীন তরমুজে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। এর মধ্যে ৯৯ হেক্টর জমির সব ফসল নষ্ট হয়েছে। আংশিক ক্ষতি হয়েছে ৯২৬ হেক্টর জমির ফসলের। এতে ৮ হাজার ৭৭০ কৃষক পরিবারের ক্ষতি পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১০ লাখ ৩০ হাজার টাকা। তবে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের এ হিসাবের সঙ্গে কৃষকদের দেওয়া তথ্যের মিল নেই। কৃষকেরা দাবি করছেন, ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ অন্তত কোটি টাকার, যা সরকারি হিসাবের চেয়ে কয়েকগুণ বেশি। 

পানি সরাতে সড়কে কোপ
জেলার গলাচিপা উপজেলার কলাগাছিয়া ইউনিয়নের ১ ও ২ নম্বর ওয়ার্ডের ১১টি ফসলের ক্ষেতের (স্থানীয় ভাষায় কোলা) ১ হাজার ২০০ একর জমির বীজতলা পানিতে তলিয়ে আছে। এতে কৃষকের রোপা আমনের বীজতলায় পচন ধরেছে। তারা পানি সরানোর জন্য গত ১২ ও ১৩ জুলাই পটুয়াখালী-গলাচিপা আঞ্চলিক মহাসড়কের একটি অংশ কেটে ফেলেন। তারা ভেতরের পাইপ দিয়ে পানি সরানোর চেষ্টা করেও ব্যর্থ হন। গতকালও সড়কটি কাটা অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখা যায়। 

কলাগাছিয়ার কৃষক মো. ইব্রাহীম খান বলেন, ‘বৃষ্টির পানিতে কোলা (ফসলের ক্ষেত) তলাইয়্যা রইছে। পানি নামার স্লুইস নাই। তাই রাস্তা একটু ছালাইয়্যা (কেটে) পানি নামানোর চেষ্টা করি। কিন্তু পানি নামাইতে পারিনি। চুঙ্গা (পাইপ) দেওয়া আছিল দুইডা। চাইছিলাম চুঙ্গার মুখ পরিষ্কার করে দিলেই পানি বাহির হইবো। কিন্তু পানি বাহির হয় নাই। অ্যাহোন তো কৃষক মরতে আছে।’

স্থানীয় আরেক চাষি শহিদুল ইসলাম বলেন, ‘কলাগাছিয়ার ১ ও ২ নম্বর ওয়ার্ডে ১১টি কোলা (ক্ষেত) পানিতে তলাইন্যা। একটা চুঙ্গা (পাইপ) দিয়া পানি নামতে পারে না। হের লাইগ্যা প্রতি বছর রাস্তা কাটতে হয় আমাগো। অথচ এইহানে স্লুইস থাকলে এই দুর্ভোগ হইত না। সব এমপি-মন্ত্রীর কাছে দরখাস্ত করেছি, ধর্ণা ধরেছি। তারা সবসময়ই বলতো এই দেই-দিচ্ছি-দেই। যে সরকারই আইছে সবাই শুধু প্রতিশ্রুতি দিছেন কিন্তু স্লুইস দেয় নাই কেউ।’  

সড়ক কেটে দেওয়ায় যাত্রী পরিবহনের দুর্ভোগের কথা জানান অটোবাইক চালক মো. শানু মিয়া ও আব্দুল বারী হাওলাদার। তাদের ভাষ্য, কাটা জায়গা দিয়ে ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করতে হচ্ছে। এখানে দুর্ঘটনা ঘটলে কারা দায় নেবেন? জরুরি ভিত্তিতে ওই জায়গা মেরামতের দাবি জানান তারা।

কলাগাছিয়া ইউপির ১ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য মোহাম্মদ রিপাউল ইসলাম বলেন, রাস্তা কাটার বিষয়ে তারা কিছুই জানতেন না। চেয়ারম্যানও জানেন না। ভুক্তভোগী কৃষকরা রাস্তা কেটে দিয়েছেন। জানার পরই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও এলজিইডি কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়। 

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে ১৩ হাজার ৪১২ হেক্টর জমিতে বিভিন্ন ধরনের ও জাতের ফসল আবাদ করা হয়েছে। কিন্তু গত ৪ থেকে ১১ জুলাই পর্যন্ত ৮ দিন টানা বৃষ্টিপাত হয়। এতে ৪৫৮ দশমিক ১১ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। বৃষ্টি ও নদনদীর পানিতে ২ হাজার ৬১৫ হেক্টর জমির ফসলে প্রভাব পড়েছে। উৎপাদিত ফসলের ক্ষতি হয়েছে ২৪৫ টন। 

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্র জানায়, এবার রোপা আমনের বীজতলা আবাদ হয়েছে ৯৭০ হেক্টর। এর মধ্যে ১৩ হেক্টর জমি পুরোপুরি নষ্ট হয়েছে। আউশের আবাদ হয়েছে ১০ হাজার ৪১৭ হেক্টর জমিতে, পুরো ক্ষতি হয়েছে ৩৩ হেক্টরে। গ্রীষ্মকালীন শাকসবজি আবাদ হয়েছে ৮৫০ হেক্টর জমিতে, সম্পূর্ণ ক্ষতি হয়েছে ১৯ হেক্টরে। পেঁপে আবাদ হয়েছে ২২০ হেক্টর জমিতে, সম্পূর্ণ ক্ষতি হয়েছে ১ হেক্টরে। পানের বরজ আবাদ হয়েছে ৬১২ হেক্টর জমিতে, পুরো ক্ষতি হয়েছে ৩ হেক্টরে। রকমেলনের আবাদ হয়েছে ৬০ হেক্টর জমিতে, সম্পূর্ণ ক্ষতি হয়েছে ২৭ হেক্টরে। গ্রীষ্মকালীন মরিচ আবাদ হয়েছে ৪ হেক্টর জমিতে, পুরো ক্ষতি হয়েছে ১ হেক্টরে। গ্রীষ্মকালীন তরমুজের আবাদ হয়েছে ৪ হেক্টর জমিতে, পুরো ক্ষতি হয়েছে ২ হেক্টরে। 

পটুয়াখালী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক ড. মোহাম্মদ আমানুল ইসলামের দাবি, যে পরিমাণ বৃষ্টিপাত হয়েছে সেই হারে ফসলের ক্ষতি হয়নি। গ্রীষ্মকালীন শাকসবজি ও রোপা আমনের বীজতলার সামান্য ক্ষতি হয়েছে। জেলায় মোট ৯৯ হেক্টর জমির ফসলের সম্পূর্ণ ক্ষতি হয়েছে। ৯২৬ হেক্টর জমির আংশিক ক্ষতি হয়েছে। যা টাকার অঙ্কে ১০ লাখ ৩০ হাজার হবে। 

আরও পড়ুন

×