ঢাকা বুধবার, ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

স্থায়ী কমিটির সভাপতি পদ 

কমিটিতে থাকার শর্ত বিএনপির, জবরদস্তি বলছে জামায়াত

কমিটিতে থাকার শর্ত বিএনপির, জবরদস্তি বলছে জামায়াত
×

জাতীয় সংসদ ভবন

সমকাল প্রতিবেদক

প্রকাশ: ৩১ আগস্ট ২০২৬ | ০৭:৪৩

সরকার ও বিরোধী দলের অভ্যন্তরীণ দরকষাকষি এবার প্রকাশ্যে চলে এসেছে। সংসদের বৈঠকেই এ নিয়ে বাহাসে লিপ্ত হয়েছেন তারা। সংবিধান সংশোধন-সংক্রান্ত বিশেষ কমিটিতে যোগ না দেওয়ার কথা জানিয়ে জুলাই সনদ অনুযায়ী মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটির সভাপতি পদ দেওয়ার দাবি জানিয়েছে বিরোধী দল। কিন্তু সরকারি দল বলেছে, বিরোধী দল বিশেষ কমিটিতে নাম না দিলে তাদের সভাপতি পদ দেওয়া হবে না। গতকাল রোববার সংসদের বৈঠকে সরকারি দল ও বিরোধী দলের নেতারা এ অবস্থান তুলে ধরেন। পদ বণ্টন নিয়ে সংসদে দুই পক্ষের মধ্যে বিতর্কও হয়। 

ক্ষমতাসীন দল বলেছে, বিরোধী দল জুলাই সনদের ভিত্তিতে বিভিন্ন দাবি তুললেও সনদ বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ায় সহযোগিতা করছে না। এটি তাদের বিপরীতমুখী অবস্থান। আর বিরোধী দল বলেছে, কোনো কমিটিতে যোগ দেওয়ার শর্তে সংসদীয় কমিটির সভাপতি পদ দেওয়ার প্রস্তাব এক ধরনের জবরদস্তি। জুলাই সনদ অনুযায়ী সংসদীয় কমিটিগুলোর ২৬ শতাংশের সভাপতি পদ পাওয়ার অধিকার তাদের রয়েছে।

দুই পক্ষের এমন অবস্থানের পর বৈঠকের সভাপতির আসনে থাকা ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল দেশের স্বার্থে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ এবং প্রয়োজনে সরকারি দল ও বিরোধী দলের শীর্ষ নেতাদের ‘ক্লোজড ডোর (রুদ্ধদ্বার)’ আলোচনার পরামর্শ দেন। রোববারের বৈঠকে সংসদীয় কমিটি গঠনের কথা থাকলেও দুই পক্ষের বিতর্কের পর নতুন কমিটি গঠন করা হয়নি। তবে কয়েকটি কমিটি পুনর্গঠন করা হয়েছে। গত ১৩ জুলাই সংবিধান সংশোধনের লক্ষ্যে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদকে সভাপতি করে ১২ সদস্যের বিশেষ কমিটি গঠন করা হয়। বিরোধী দলকে ওই কমিটিতে পাঁচজনের নাম দেওয়ার অনুরোধ জানানো হলেও তারা নাম দেয়নি। কমিটি প্রত্যাখ্যান করে তারা বলেছে, গণভোটের রায়ের আলোকে জুলাই সনদ অনুযায়ী সংবিধান সংস্কার করতে হবে। বিরোধী দল প্রতিনিধি না দিলেও সংবিধান সংশোধন-সংক্রান্ত বিশেষ কমিটি এরই মধ্যে কাজ শুরু করেছে। 

বিধান কী?
বিদ্যমান ব্যবস্থায় বিরোধী দলকে সংসদীয় কমিটির সভাপতি পদ দেওয়ার বাধ্যবাধকতা নেই। তবে ‘রাজনৈতিক সমঝোতার দলিল’ হিসেবে সই করা জুলাই সনদের প্রস্তাবে বলা হয়েছিল, সরকারি হিসাব, বিশেষ অধিকার, অনুমিত হিসাব ও সরকারি প্রতিষ্ঠান কমিটির সভাপতি পদে বিরোধীদলীয় সদস্যরা দায়িত্ব পালন করবেন। এ ছাড়া বিভিন্ন মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সভাপতি পদে সংসদে আসনের সংখ্যানুপাতে বিরোধী দলের মধ্য থেকে নির্বাচন করা হবে। সংবিধানে এই বিধান যুক্ত করা হবে। জুলাই সনদের এই প্রস্তাবে বিএনপিসহ ৩০টি দল ও জোট একমত হয়েছিল।

জাতীয় সংসদের আইন শাখার কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সনদের এই প্রস্তাব বাস্তবায়নের জন্য সংবিধান সংশোধন করতেই হবে, এমন নয়। সরকার চাইলে এখনই এটি বাস্তবায়ন করতে পারে। কারণ, সংসদীয় কমিটির সভাপতি কোন দল থেকে দেওয়া হবে, তা সংবিধান বা সংসদের কার্যপ্রণালি বিধির কোথাও নির্ধারণ করে দেওয়া নেই।

সংসদে বিতর্ক
গতকাল সংসদে অনির্ধারিত আলোচনায় বিরোধীদলীয় উপনেতার সঙ্গে কথোপকথনের কথা উল্লেখ করে চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি বলেন, সংবিধান সংশোধন-সংক্রান্ত কমিটিতে নাম দেওয়ার জন্য আগে তাদের (বিরোধী দল) আহ্বান করা হয়েছিল। তারা কিছুটা নমনীয় ছিলেন। তারা আজকে (রোববার) বলেছে, সংবিধান সংশোধন কমিটিতে তারা থাকবেন। সে কারণে সংবিধান সংশোধন কমিটি পুনর্গঠন এবং সংসদীয় স্থায়ী কমিটি গঠন-সংক্রান্ত কমিটিগুলো এখন উত্থাপন করতে চান না। তার আগে বিরোধীদলীয় উপনেতাকে ফ্লোর দেওয়ার জন্য তিনি স্পিকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন।

এরপর ফ্লোর পেয়ে বিরোধীদলীয় উপনেতা সৈয়দ আব্দুল্লাহ মো. তাহের বলেন, সংসদ সদস্যদের সংখ্যা অনুসারে সংসদীয় কমিটিতে সদস্য এবং অন্যান্য বিষয় বণ্টন হওয়ার বিষয়ে ঐকমত্য হয়েছিল। কমিটিগুলোর সভাপতি পদের ২৬ শতাংশ বিরোধী দল থেকে হওয়ার কথা। কিন্তু যে কয়টি কমিটি চূড়ান্ত হয়েছে, সেখানে বিরোধী দলের পক্ষ শুধু একটি সভাপতি করা হয়েছে। মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত কোনো কমিটির সভাপতি করা হয়নি।

চিফ হুইপের সঙ্গে কথোপকথনের বিষয়টি উল্লেখ করে বিরোধীদলীয় উপনেতা বলেন, তিনি সংবিধান সংশোধন কমিটিতে যাওয়ার কথা বলেননি। একটার সঙ্গে আরেকটা সম্পর্কিত হতে পারে না। তিনি বলেন, ‘বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন করেই এখানে আসছি। আমরা চাই না যে, এই সংসদেও বৈষম্য প্রতিষ্ঠিত হোক। কিছু সংসদ সদস্য বেশি অধিকার পাবেন, আবার কিছু সংসদ সদস্য বঞ্চিত হবেন। এমন উদাহরণ এখানে নতুন করে যেন না হয়।’ 

আব্দুল্লাহ মো. তাহের বলেন, ১০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সংসদ চলবে। এর ভেতর একটা সমঝোতা হলে সুন্দর হবে। বৈষম্যবিরোধী পার্লামেন্টের একটা নজির স্থাপিত হবে।
জবাবে চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি বলেন, স্বাধীনতার পর বিগত দিনে কখনও বিরোধী দল থেকে কোনো কমিটির সভাপতি করা হয়নি। জিয়াউর রহমান পাবলিক কমিটির (সরকারি হিসাব সম্পর্কিত কমিটি) সভাপতি করেছিলেন। ইতোমধ্যে এটা বিরোধী দলকে দেওয়া হয়েছে।

বিরোধীদলীয় উপনেতার সঙ্গে কথোপকথনের কথা উল্লেখ করে চিফ হুইপ বলেন, ‘বিগত দিনে কোনো রেওয়াজ সেই, আমরা সেটা দেব না এবং আমরা আপনাকে একটা কমিটির সভাপতি করেছি। আর সে কমিটি আমরা করতে পারব না।’ তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, জুলাই সনদ যেভাবে সই হয়েছে দাড়িকমাসহ সেভাবে বাস্তবায়িত হবে। বিরোধী দল সংবিধান সংশোধনের প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ করলে তারা যেভাবে চেয়েছে সেভাবে সভাপতি দিতে তারা রাজি।

পরে সৈয়দ আবদুল্লাহ মো. তাহের বলেন, বিরোধী দলের নীতিগত সিদ্ধান্ত হচ্ছে– সরকার সংবিধান সংশোধনে যে কমিটি করেছে, এই কমিটিতে তারা অংশ নেবেন না। তিনি বলেন, বিশেষ কমিটিতে যোগ দেওয়ার জন্য বিরোধী দলের ওপর শর্ত আরোপ করে জোরজবরদস্তি করার যে নীতি বা কথা বলা হচ্ছে, এটা তারা সঠিক মনে করেন না। তারা মনে করেন, স্থায়ী কমিটির সভাপতি পদেও ২৬ শতাংশ পদ পাওয়ার অধিকার বিরোধী দলের আছে।

বিতর্কের এই পর্যায়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, বিরোধী দল থেকে ডেপুটি স্পিকার পদে একজনের নাম দিতে বলা হয়েছিল। এ জন্য জুলাই সনদ বাস্তবায়ন পর্যন্ত অপেক্ষা করা হয়নি। সরকারি দল এ অফার করেছিল। কিন্তু বিরোধী দল বলেছিল, এ পর্যায়ে তারা ডেপুটি স্পিকারের পদ নেবে না।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘তখন আমরা ভাবলাম, জুলাই জাতীয় সনদ পূর্ণাঙ্গভাবে বাস্তবায়িত হলে অর্থাৎ সংবিধান সংশোধিত হলে সেই অনুযায়ী আমরা যাব।’ সংবিধান সংশোধন কমিটির কথা উল্লেখ করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, বিরোধী দলের নীতিগত সিদ্ধান্ত এই কমিটিতে আসবে না। আজকেও পুনরাবৃত্তি করেছে।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, সব অংশীজনের সঙ্গে আলোচনা শেষে সমৃদ্ধ সংবিধান সংশোধনী বিল আনা হবে। সেটা পাস হওয়ার পরই জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন হবে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে ঐকমত্য কমিশনের আলোচনার কথা উল্লেখ করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত অন্য কমিটিগুলো সংসদে আসনের সংখ্যানুপাতে বিরোধী দল সভাপতি পাবে। সে জন্য তো জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়িত হতে হবে। সংবিধান সংশোধন করা হবে। 

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘উদারতা দেখিয়ে চিফ হুইপ প্রস্তাব দিয়েছেন। আসুন, সংবিধান সংশোধনী-সংক্রান্ত বিশেষ কমিটিতে অংশ নিন। জুলাই জাতীয় সনদ একই সময়ে বাস্তবায়ন শুরু করি। সে অনুসারে সভাপতির পদ পাওয়া যাবে– এটি খুবই সঠিক যুক্তি।’ 

বিরোধী দলের উদ্দেশে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আরও বলেন, ‘আগে সব দিতে হবে, তারপরও সেই কমিটিতে আসবেন না– সেটা তো সহযোগিতা হলো না। একতরফা আপনাদের সকল দাবি মানতে হবে।’ সংবিধান সংশোধন কমিটিতে যোগ দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘কমিটিতে আসুন। আপনাদের বক্তব্য দেন। দ্বিমত হবেন, ভিন্নমত হবেন এবং কিছু কিছু প্রস্তাবে তো অবশ্যই একমত হবেন।’ তিনি বলেন, ‘সবই জুলাই জাতীয় সনদের ভিত্তিতে চাইবেন, অথচ সনদ বাস্তবায়নের জন্য সহযোগিতায় আসবেন না– এটি বিপরীতমুখী হয়ে যায়।’

কমিটি গঠন যেভাবে
জাতীয় সংসদে বিষয়ভিত্তিক ১১টি এবং মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটি আছে ৩৯টি। জুলাই সনদের প্রস্তাব অনুযায়ী, সংসদে এই ৫০টি কমিটির মধ্যে বিরোধী দলের ১৪টি কমিটির সভাপতি পদ পাওয়ার কথা। তবে এবার অন্তত ১১টির সভাপতি পদ পাওয়ার আশা করেছিল বিরোধী দল। এখন পর্যন্ত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদে ১৫টি সংসদীয় স্থায়ী কমিটি গঠন করা হয়েছে। এর মধ্যে শুধু সরকারি হিসাব কমিটির সভাপতি পদ বিরোধী দলকে দেওয়া হয়েছে। চলতি অধিবেশনেই বাকি ৩৫টি কমিটি গঠন করা হবে বলে চিফ হুইপ আগেই জানিয়েছিলেন। 

জাতীয় সংসদের প্রধান কাজ আইন প্রণয়ন ও নির্বাহী বিভাগের জবাবদিহি নিশ্চিত করা। এ দুটো ক্ষেত্রেই সংসদীয় স্থায়ী কমিটিগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। মন্ত্রণালয়ভিত্তিক সংসদীয় কমিটি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের কাজ পর্যালোচনা; অনিয়ম ও গুরুতর অভিযোগ তদন্ত করতে পারে। বিল পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে মন্ত্রণালয়কে পরামর্শ দেওয়া বা সুপারিশ করাও সংসদীয় কমিটির কাজ।

জাতীয় সংসদের কার্যপ্রণালি বিধিতে বলা আছে, সংসদে গৃহীত প্রস্তাব অনুযায়ী কমিটির সদস্যরা নিযুক্ত হবেন। সংসদ মনোনীত না করে থাকলে কমিটির সদস্যরা তাদের মধ্য থেকে একজনকে সভাপতি নির্বাচন করবেন। কার্যউপদেষ্টা কমিটি, পিটিশন কমিটিসহ কয়েকটি কমিটির সদস্য মনোনয়ন করেন স্পিকার। এর বাইরে বিষয়ভিত্তিক অন্য কমিটিগুলো এবং মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত কমিটিগুলো সংসদে ভোটের মাধ্যমে গঠিত হয়। সাধারণত সংসদ নেতার পক্ষে জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ কমিটি গঠনের প্রস্তাব সংসদে তোলেন। এই প্রস্তাব পাসের মাধ্যমে কমিটি গঠিত হয়। 

এর আগে একাদশ ও দ্বাদশ জাতীয় সংসদেও বিরোধী দলকে সরকারি হিসাব কমিটির সভাপতি পদ দেওয়া হয়েছিল। তখন জাতীয় পার্টি ছিল বিরোধী দলে। এর আগে নবম সংসদে বিএনপি ছিল বিরোধী দলে। এই সংসদে একাধিক কমিটির সভাপতির পদ বিরোধী দলকে দেওয়া হয়েছিল। ওই সংসদের মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটির সভাপতি ছিলেন বর্তমান সংসদের হুইপ আশরাফ উদ্দিন নিজান। একাদশ সংসদেও যোগাযোগ মন্ত্রণালয় এবং শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি হয়েছিল বিরোধী দল থেকে।

চলতি সংসদে এখন পর্যন্ত বিষয়ভিত্তিক ৬টি ও মন্ত্রণালয়ভিত্তিক ৯টি মিলিয়ে ১৫টি স্থায়ী কমিটি গঠন করা হয়েছে। কার্যপ্রণালি বিধিতে নতুন সংসদ যাত্রা শুরুর প্রথম তিনটি অধিবেশনের মধ্যে মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত কমিটি গঠনের বাধ্যবাধকতা আছে। ২৭ আগস্ট থেকে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের তৃতীয় অধিবেশন শুরু হয়। ৯ কার্যদিবসে আগামী ১০ সেপ্টেম্বর চলতি অধিবেশন শেষ হওয়ার কথা রয়েছে। 
 

আরও পড়ুন

×