ঢাকা বুধবার, ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

যুক্তরাষ্ট্র-ভেনেজুয়েলা

৬৫ বিলিয়ন ব্যারেল তেল, ১০০ বছরের চুক্তি—বিনিময়ে কী পেল ভেনেজুয়েলা?

৬৫ বিলিয়ন ব্যারেল তেল, ১০০ বছরের চুক্তি—বিনিময়ে কী পেল ভেনেজুয়েলা?
×

চুক্তিটিকে সাফল্য হিসেবে তুলে ধরেছেন ট্রাম্প ও দেলসি রদ্রিগেজ

বিবিসি

প্রকাশ: ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ১৫:০৯

ভেনেজুয়েলার ১৭টি তেলক্ষেত্রের ওপর ১০০ বছরের জন্য ছাড় (কনসেশন) দিয়েছে দেশটির অন্তর্বর্তী সরকার। যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন একটি কোম্পানির সঙ্গে করা এই চুক্তির আওতায় রয়েছে প্রায় ৬৫ বিলিয়ন ব্যারেল অপরিশোধিত তেল। ভেনেজুয়েলার প্রমাণিত তেল মজুতের এক-পঞ্চমাংশেরও বেশি এর আওতায় পড়ছে।

বুধবার রাজধানী কারাকাসে চুক্তিটি সই হয়। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এটিকে ‘বিশ্বের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় তেল চুক্তি’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। ভেনেজুয়েলার অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট দেলসি রদ্রিগেজও চুক্তিটিকে ‘ঐতিহাসিক’ আখ্যা দিয়েছেন। তার দাবি, এর মাধ্যমে ভেনেজুয়েলায় ১০০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ এবং ২০০ বিলিয়ন ডলারের বেশি কর রাজস্ব আসতে পারে।

তবে চুক্তির শর্ত নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন বিশ্লেষক ও ভেনেজুয়েলার বিভিন্ন রাজনৈতিক পক্ষ। ট্রাম্পের ভেনেজুয়েলা ও ইরানবিষয়ক সাবেক বিশেষ প্রতিনিধি এলিয়ট অ্যাব্রামস বলেছেন, এটি ‘ভয়াবহ চুক্তি’। তার ভাষায়, রদ্রিগেজ দেশের জাতীয় সম্পদের ২০ শতাংশ ‘বিনা মূল্যে দিয়ে দিয়েছেন’।

চুক্তির কাঠামো অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র সরকার ভেনেজুয়েলার বেসরকারি তেল কোম্পানি নর্থ আমেরিকান ব্লু এনার্জি পার্টনার্সের (ন্যাবেপ) সঙ্গে কাজ করবে। দেশটির বেসরকারি তেল উৎপাদকদের মধ্যে ন্যাবেপ দ্বিতীয় বৃহত্তম, শেভরনের পরেই এর অবস্থান।

চুক্তির সবচেয়ে আলোচিত শর্তগুলোর একটি হলো, ন্যাবেপের পরিচালনা পর্ষদের যেকোনো সদস্য নিয়োগে যুক্তরাষ্ট্র সরকারের ভেটো দেওয়ার ক্ষমতা থাকবে। পাশাপাশি পরিচালনা পর্ষদের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যকে মার্কিন নাগরিক হতে হবে।

মার্কিন প্রশাসনের দাবি, ভেনেজুয়েলার তেল উৎপাদন বাড়লে বিশ্ব জ্বালানি বাজারে মধ্যপ্রাচ্যের ওপর নির্ভরতা কমবে। যুক্তরাষ্ট্রের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ডগ বার্গাম বলেছেন, এই চুক্তির মাধ্যমে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের ভূরাজনৈতিক কেন্দ্র মধ্যপ্রাচ্যের ‘সংকটপূর্ণ পথ’ থেকে পশ্চিম গোলার্ধে ফিরে আসবে।

তবে জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভেনেজুয়েলার বিপর্যস্ত তেল খাত দ্রুত আগের অবস্থায় ফিরবে-এমন আশা বাস্তবসম্মত নয়। ট্রাম্প দুই থেকে তিন বছরের মধ্যে চুক্তি থেকে লাভ আসবে বলে জানিয়েছেন। কিন্তু বিশেষজ্ঞদের মতে, বাস্তবে এতে এক দশক পর্যন্ত সময় লাগতে পারে।

হিউস্টনের রাইস ইউনিভার্সিটির বেকার ইনস্টিটিউটের লুইস পাচেকোর মতে, ৩০ বছর আগের উৎপাদনমাত্রায় ফিরতে ভেনেজুয়েলার প্রায় ১০০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ প্রয়োজন, যা করতে সময় লাগতে পারে আট বছর।

তবে শুধু বিনিয়োগ নয়, সেই অর্থ কে এবং কীভাবে পরিচালনা করবে-এ নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। পাচেকো বলেন, অতীতে যে ব্যক্তিরা দেশের বিপুল তেলসম্পদ থেকে পাওয়া অর্থের অপচয় করেছেন, তাদেরই যদি আবার অর্থ ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব দেওয়া হয়, তাহলে নতুন বিনিয়োগ কতটা সুফল বয়ে আনবে, তা নিয়ে সংশয় থেকেই যায়।

চুক্তিটি ভেনেজুয়েলার বিরোধী রাজনৈতিক শিবিরেও ক্ষোভ তৈরি করেছে। বিরোধীদের অভিযোগ, রদ্রিগেজ নিকোলা মাদুরোরই সরকারের অংশ ছিলেন। অথচ মাদুরো সরকারের বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও মাদক কারবারের অভিযোগ তুলে যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন কঠোর অবস্থান নিয়েছিল।

ভেনেজুয়েলার বিরোধী নেতা মারিয়া কোরিনা মাচাদোর সমর্থকদের কাছেও বিষয়টি অস্বস্তিকর। মাদুরো সরকারের পতনের পর দেশটিতে দ্রুত নির্বাচন আয়োজনের কোনো সুস্পষ্ট পরিকল্পনা না থাকায় বিরোধীদের একাংশ মনে করছে, যুক্তরাষ্ট্র গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার বদলে তেলসম্পদের নিয়ন্ত্রণকেই অগ্রাধিকার দিচ্ছে।

ভেনেজুয়েলার অর্থনীতিবিদ রিকার্দো হাউসম্যান মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর সমালোচনা করে বলেছেন, ভেনেজুয়েলাবাসীকে মুক্ত করার পরিবর্তে যুক্তরাষ্ট্র তাদের ‘নিপীড়কদের সঙ্গে জোট’ বেছে নিয়েছে। তার অভিযোগ, সাংবিধানিক শৃঙ্খলা ও গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার আগে একটি ‘অসাংবিধানিক’ চুক্তি চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে।

অন্যদিকে ভেনেজুয়েলার সমাজতান্ত্রিক শিবিরের একটি অংশও চুক্তিটির বিরোধিতা করছে। ক্ষমতাসীন সমাজতান্ত্রিক দল পিএসভি রদ্রিগেজকে সমর্থন করলেও অনেক সমাজতন্ত্রী মনে করছেন, ওয়াশিংটনের সঙ্গে দীর্ঘদিনের বিরোধের পর দেশের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ যুক্তরাষ্ট্রের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে।

ভেনেজুয়েলার রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানি পিডিভিএসএর সাবেক প্রধান ও সাবেক তেলমন্ত্রী রাফায়েল রামিরেজের ভাষায়, এই চুক্তি ‘যুক্তরাষ্ট্রের নতুন উপনিবেশবাদের দরজা খুলে দিচ্ছে’।

বিষয়টি আরও তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে ভেনেজুয়েলার সাবেক প্রেসিডেন্ট হুগো চাভেজের নীতির কারণে। ২০০৮ সালে এক টেলিভিশন অনুষ্ঠানে চাভেজ বলেছিলেন, দেশের তেলক্ষেত্রের নিয়ন্ত্রণ রাষ্ট্রের হাতেই থাকবে। মার্কিন কোম্পানির সম্পদ অধিগ্রহণের পর তিনি বলেছিলেন, ভেনেজুয়েলা আর কখনো তার তেলসম্পদের নিয়ন্ত্রণ হাতছাড়া করবে না।

প্রায় দুই দশক পর চাভেজের রাজনৈতিক উত্তরসূরিদের একজনের হাতেই যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে এমন দীর্ঘমেয়াদি তেল চুক্তি হলো। ফলে চুক্তিটি শুধু অর্থনৈতিক নয়, ভেনেজুয়েলার রাজনীতি ও দেশটির সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কের ক্ষেত্রেও বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
 

আরও পড়ুন

×