ঢাকা রোববার, ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬

নারী উদ্যোক্তা

সুতার বুননে জয়গাথা

সুতার বুননে জয়গাথা
×

মারিয়া গোমেজ ও তাঁর ‘প্যাচওয়ার্ক’

মালিহা মেহনাজ

প্রকাশ: ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ১৪:৫৯

বন্দরনগরী চট্টগ্রামের কোলাহলময় এক কোণে ১৫ বছর আগে ছায়াসুনিবিড় এক স্বপ্নের বীজ রোপণ করা হয়েছিল। মূলধন বলতে ছিল মাত্র ৯২৫ টাকা আর বুকভরা অমিত আত্মবিশ্বাস। সেই ক্ষুদ্র বীজই আজ মহিরুহে পরিণত হয়ে দাঁড়িয়েছে ‘মোহিনী’ নামে। 

মারিয়া গোমেজের শৈশব কেটেছে মিশনারি হোস্টেলের সুশৃঙ্খল আবহে। সহপাঠীরা যখন খেলার মাঠে সময় কাটাত, মারিয়ার মন তখন পড়ে থাকত মিশনারি সিস্টারদের সূচিশিল্পের নিপুণ ভাঁজে। মায়ের হাত ধরে শেখা ‘ভরাট স্টিচ’ ছিল তাঁর প্রথম পাঠ। নেভি ব্লু সুতি কাপড়ের ওপর রঙিন সুতার আল্পনায় তিন মাসের একনিষ্ঠ পরিশ্রমে ফুটিয়ে তুলেছিলেন আস্ত একটি শাড়ি। মায়ের পরনে সেই ছয় গজ কাপড়ের হাসিমুখই মারিয়ার ভেতরে বুনে দিয়েছিল আজীবনের সৃষ্টিশীলতার তন্তুময় স্বপ্ন।

পরবর্তী সময়ে কাজের সূত্রে বিদেশি অতিথিদের সান্নিধ্যে আসা। গৃহকোণে এসে বিদেশি ক্রেতাদের অর্ডার দেওয়ার দ্বিধা দূর করতে এক জার্মান বান্ধবী পরামর্শ দেন একটি স্থায়ী প্রদর্শনী কেন্দ্র বা শপের। সেই জার্মান বান্ধবী প্রায়ই বলতেন, মারিয়ার হাতের নিখুঁত কাজ আর আন্তরিকতা যে কাউকে বিমোহিত করবে। সেই বিমোহিত করার আকুলতা থেকে জন্ম নেয় তাঁর প্রতিষ্ঠান ‘মোহিনী’। ‘মোহিনী’ অর্থাৎ যা মুগ্ধতা ছড়ায়।

এর সঙ্গে আরও জড়িত মাতৃত্ব ও স্বাধীন কর্মক্ষেত্রের প্রশ্নও। করপোরেট জীবনের ৯টা-৫টা ঘড়ির কাঁটা অনেক সময় নারীর মাতৃত্বকে মুখোমুখি দাঁড় করায় কঠিন সামাজিক পরীক্ষার। মারিয়া গোমেজ তাঁর কন্যাসন্তানকে অন্যের ভরসায় রেখে চাকরি করতে চাননি। তিনি চেয়েছিলেন এমন এক স্বাধীন পেশা, যেখানে কাজের পাশাপাশি সন্তানকেও নিজের ছায়াতলে আগলে রাখা যায়। মাতৃত্বের এই কোমল অনুভূতির সঙ্গে ব্যবসায়িক স্বাধীনতার মেলবন্ধন ঘটিয়ে তিনি পা বাড়ান উদ্যোক্তার পথচলায়।

শুরুর চার-পাঁচ বছর মোহিনীর শোরুম সাজানো ছিল শতভাগ নিজস্ব কারিগরদের হাতে তৈরি পণ্যে–ব্লক, বাটিক, টাই-ডাই, হ্যান্ডপেইন্ট আর সূচিশিল্পের মনকাড়া সব সম্ভারে। সময়ের পরিক্রমায় কারিগর সংকট দেখা দিলে ব্যবসা থমকে দাঁড়ানোর উপক্রম হয়।

তখন কালেকশনভিত্তিক তৈরি পোশাকের পাশাপাশি মারিয়া বিশ্বজুড়ে সমাদৃত অপচয়হীন ফ্যাশন (জিরো ওয়েস্ট) ও কাপড়ের গুণগত পুনর্ব্যবহার (আপসাইক্লিং)-এর ওপর জোর দেন। ফেলে দেওয়া কাপড়ের ছোট ছোট টুকরো জোড়া দিয়ে ঐতিহ্যবাহী কাঁথা স্টিচের বুননে তিনি তৈরি করতে শুরু করেন ব্যাগ, পার্স, ল্যাপটপ পাউচ, নোটবুক কাভার।

একসময় যে ‘প্যাচওয়ার্ক’ বা জোড়াতালির কাজ নিয়ে অনেকে হাসি-ঠাট্টা করেছিল, মারিয়ার নান্দনিক ছোঁয়ায় তা-ই আজ আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে সমাদৃত। জার্মানি ও যুক্তরাষ্ট্রের বাজারেও পৌঁছে গেছে তাঁর তৈরি পরিবেশবান্ধব প্যাচওয়ার্কের পণ্য। ফেলে দেওয়া কাপড় থেকে মূল্যবান শিল্পকর্ম তৈরির এই শিল্পবোধ ‘মোহিনী’কে দিয়েছে এক আলাদা উচ্চতা।

১৫ বছরের দীর্ঘ যাত্রায় ৯২৫ টাকার ক্ষুদ্র পুঁজি আজ রূপ নিয়েছে প্রায় ৯০ লাখ টাকার মূলধনে। তবে মারিয়া গোমেজের কাছে এই সংখ্যাগত লাভ-ক্ষতির চেয়ে বড় অর্জন ক্রেতার হৃদয় জয় করা। তিনি জানান, চট্টগ্রামের কোনো রেস্তোরাঁয় যখন অচেনা কেউ তাঁকে নিজের কাজের জন্য চিনে নেন কিংবা কক্সবাজার থেকে কেবল মোহিনীর প্যাচওয়ার্কের জন্য ৫-৬ ঘণ্টা জার্নি করে আসেন–এসবই তাঁর আসল মূলধন।

মারিয়া গোমেজের স্বপ্ন এখন কেবল একটি দোকানের সীমানায় আবদ্ধ নেই। তিনি এমন একটি স্বাচ্ছন্দ্যময় কর্ম পরিবেশ তৈরি করতে চান, যেখানে অন্তত ৫০০ নারী আত্মসম্মানের সঙ্গে কাজ করতে পারবেন। তরুণ উদ্যোক্তাদের উদ্দেশে মারিয়ার বার্তা অত্যন্ত স্পষ্ট ও জীবনঘনিষ্ঠ–‘শুধু অর্থ বিনিয়োগ করলেই ব্যবসা হয় না। আগে কাজটিকে ভালোবাসতে হবে, কাজটি শিখতে হবে। কাজের প্রতি মায়া না থাকলে সৃষ্টিশীল ব্যবসা টিকিয়ে রাখা সম্ভব নয়।’

‘মোহিনী’ আজ কেবল পোশাক কিংবা অনুষঙ্গের কোনো ব্র্যান্ড নয়; এটি চট্টগ্রাম শহরে এক নারীর অধ্যবসায়, নান্দনিকতা এবং টেকসই জীবনের অনন্য দলিল। মারিয়া প্রমাণ করেছেন– ভালোবাসা আর কাজের প্রতি সততা থাকলে ৯২৫ টাকার স্বপ্নও একদিন কোটি টাকার মূলধনে রূপ নিতে পারে।

আরও পড়ুন

×