মোড়কের ভেতর যে প্রতিশ্রুতি থাকে
পণ্যের পরিকল্পনা থেকে বাজারজাতকরণ–প্রতিটি ধাপেই আস্থা গড়ে ওঠে, নয়তো ক্ষয় হয়
আব্দুল্লাহ যোবায়ের
প্রকাশ: ০৪ অক্টোবর ২০২৬ | ০৭:৫৯
| প্রিন্ট সংস্করণ
দোকানের তাক থেকে এক টিউব ক্রিম বা এক বোতল তেল হাতে তুলে নেওয়ার সময় আমরা আসলে একটা নাম কিনি না। কিনি একটা ভরসা। মোড়কে যা লেখা, ভেতরে তা-ই আছে; বিজ্ঞাপনে যা বলা হয়েছে, পণ্য সেটাই করবে। কারখানা, বিতরণব্যবস্থা বা বিজ্ঞাপনের বাজেট নয়–এ ভরসাটুকু একটি ব্র্যান্ডের সবচেয়ে বড় পুঁজি। প্রতিশ্রুতি আর অভিজ্ঞতার মাঝে ফাঁক না থাকলে ভরসা জন্মায়। সে ভরসা ভাঙলে ধাক্কা লাগে পুরো বাজারে।
দেশে মধ্যবিত্ত বাড়ছে। মোবাইলের পর্দায় কেনাকাটা এখন গ্রামেও পৌঁছেছে। ক্রেতাও আগের চেয়ে সজাগ। তিনি শুধু দাম আর মান মেলান না; দেখেন প্রতিষ্ঠানটি কথা রাখে কিনা। প্রতিযোগিতা যত বাড়ছে, প্রতিষ্ঠানের দায়ও তত ভারী হচ্ছে। এ দায় কোনো একটি বিভাগের একার নয়। পণ্যের পরিকল্পনা, গবেষণা, উৎপাদন, মান যাচাই, মোড়ক, বিজ্ঞাপন, সরবরাহ ও বিক্রি–প্রতিটি ধাপে আস্থা গড়ে ওঠে, নয়তো ক্ষয় হয়। ক্রেতা কারখানা আর বিপণন দলকে আলাদা করে চেনেন না। তাঁর কাছে ব্র্যান্ড একটাই, প্রতিশ্রুতিও একটাই। কোথাও একটু গরমিল হলে দাগ লাগে পুরো নামে।
বিজ্ঞাপনে পণ্যের গুণ তুলে ধরা স্বাভাবিক। কিন্তু দাবি চটকদার হলে দায়িত্বশীল হয় না। পেছনে নির্ভরযোগ্য প্রমাণ থাকতে হয়। স্বাস্থ্য, কার্যকারিতা বা পরিবেশ নিয়ে দাবির বেলায় সেই মাপকাঠি আরও কড়া হওয়া দরকার। শুধু কী বলা হলো তা নয়, দর্শক কী বুঝলেন সেটাও বিবেচনার বিষয়।
ভুল বোঝার দাম কত চড়া হতে পারে, তার একটি উদাহরণ সমকালেই ছাপা হয়েছিল। ত্বক টানটান ও উজ্জ্বল হবে, কোনো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নেই, অনলাইনে এমন বিজ্ঞাপন দেখে ফার্মগেট থেকে একটি কোরিয়ান জেল কিনেছিলেন সায়েরা খানম। আমদানিকারকের স্টিকার, মেয়াদ, দাম–সব মিলিয়ে দেখেও জেলটি ছিল নকল। মুখের দানা সারাতে তাঁকে তিনবার চিকিৎসকের কাছে যেতে হয়। খরচ ছাড়ায় পাঁচ হাজার টাকা।
বিজ্ঞাপনের পর ক্রেতার সবচেয়ে বড় ভরসা মোড়ক। দরকারি তথ্য সেখানে থাকলেই চলে না; তা যেন সহজে চোখে পড়ে, বোঝা যায়, অন্য পণ্যের সঙ্গে মেলানো যায়। এ জন্য দায়িত্বশীল প্রতিষ্ঠান শুরু থেকে আইন, নিয়ন্ত্রক বিষয়, গবেষণা, উৎপাদন, সরবরাহ ও বিপণন দলকে এক টেবিলে বসায়। সিদ্ধান্ত পাকা হওয়ার পর ভুল শোধরানোর চেয়ে শুরুতে ঠিক পথে হাঁটা সস্তা, টেকসইও।
নকল পণ্য ব্র্যান্ডের মেধাস্বত্বে আঘাত করে ঠিকই, কিন্তু সবচেয়ে বড় ঝুঁকিতে ফেলে ক্রেতাকে। তিনি ভাবছেন চেনা ব্র্যান্ড কিনছেন, অথচ হাতে যা পাচ্ছেন তা তৈরি হয়েছে মান নিয়ন্ত্রণের বাইরে। ঝুঁকির মাত্রা বোঝা যায় সাম্প্রতিক এক পরীক্ষায়। খোলাবাজার থেকে তোলা ৩৪টি আমদানি করা প্রসাধনীর অর্ধেক বিএসটিআই ভেজাল, অনুমোদনহীন বা মানহীন হিসেবে শনাক্ত করেছে। প্রসাধনীর বড় ক্রেতা নারী। সে কারণে এ ক্ষতির ভার পড়ে সবচেয়ে বেশি তাদের শরীরে। আবার জিনিসপত্রের দাম চড়া থাকায় কম দামের নকল সাবান-টয়লেট্রিজের দিকে ঝুঁকছেন নিম্ন আয়ের মানুষ। অর্থাৎ যার সামর্থ্য সবচেয়ে কম, ঝুঁকি তাঁরই বেশি। এ কারণে ভোক্তার সুরক্ষা শুধু বাণিজ্যের প্রশ্ন নয়, অধিকারেরও প্রশ্ন।
অনলাইন বাজার এ লড়াইকে আরও জটিল করেছে। একটি ভুয়া বিজ্ঞাপন কয়েক ঘণ্টায় লাখো মানুষের কাছে পৌঁছে যায়। তাই বিক্রেতা যাচাই, দ্রুত বিজ্ঞাপন সরানো আর তথ্য আদান-প্রদানের কার্যকর ব্যবস্থা গড়তে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম, ব্র্যান্ড, নিয়ন্ত্রক ও আইনপ্রয়োগকারী সংস্থাকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।
প্রতিষ্ঠানগুলো যখন মান, উদ্ভাবন আর সেবা দিয়ে লড়ে, তখন লাভ ক্রেতার। কিন্তু বাজারে ঢোকার পথ আটকানো বা আধিপত্যের অপব্যবহার শেষ পর্যন্ত ক্রেতার পছন্দের জায়গাই ছোট করে। যে বাজারে আস্থা মজবুত, সেখানে দায়িত্বশীল ব্যবসা উৎসাহ পায়, দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ আসে।
এই বাস্তবতায় প্রতিষ্ঠানের আইনজীবীর ভূমিকাও বদলাচ্ছে। শুধু সিদ্ধান্ত আইনসম্মত কিনা, তা দেখা তাঁর কাজ নয়। ব্যবসার লক্ষ্য, ক্রেতার প্রত্যাশা আর সম্ভাব্য ঝুঁকির মধ্যে ভারসাম্য রেখে দায়িত্বশীল সিদ্ধান্তে সাহায্য করাই এখন তাঁর আসল দায়।
ক্রেতার নিজের হাতেও অস্ত্র আছে। ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ আইন, ২০০৯ তাঁকে প্রতিকার চাওয়ার অধিকার দিয়েছে; জাতীয় ভোক্তা অভিযোগ কেন্দ্রের হটলাইন ১৬১২১-এ অভিযোগ জানানো যায়। প্রতারিত হয়ে চুপ থাকলে প্রতারকের সুবিধা।
শেষ পর্যন্ত ক্রেতার চাওয়া খুব সরল। যে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলো, তিনি যেন ঠিক সেটাই পান। এই সরল চাওয়া রক্ষা করা গেলে আস্থা জন্মায়। সে আস্থার ওপর দাঁড়ায় দায়িত্বশীল ব্যবসা, শক্ত বাজার আর টেকসই অর্থনীতি।
- বিষয় :
- পণ্য