নিখোঁজ থেকে পথশিশু
ছবি:: লিডোর সৌজন্যে
শাহেরীন আরাফাত
প্রকাশ: ০৪ অক্টোবর ২০২৬ | ০৮:০১
| প্রিন্ট সংস্করণ
হালিমা খাতুনের বয়স ৬০ পেরিয়েছে। মা-হারা নাতনি মাইমুনাকে তিন বছর বয়স থেকে তিনি বড় করেছেন। এক দুপুরে বাথরুমে ঢুকেছিলেন। বেরিয়ে দেখেন, মাইমুনা নেই। পঁয়তাল্লিশ দিন পর ঢাকায় এক সংবাদ সম্মেলনে কাঁপা গলায় বললেন, শহরের এমন কোনো গলি নেই, যেখানে খোঁজেননি। প্রতিটি ফুট ওভারব্রিজে উঠেছেন, নেমেছেন।
ফুট ওভারব্রিজের নিচটা এই শহরের এক অদ্ভুত ঠিকানা। রাতে সেখানে ঘুমায় সেই শিশুরা, যাদের নিজের কোনো ঠিকানা নেই। নানি যেখানে নাতনিকে খুঁজছেন, সেখানেই হয়তো শুয়ে আছে অন্য কোনো ঘরের হারানো সন্তান। থানার খাতায় যে শিশু ‘নিখোঁজ’, ফুটপাতে সে-ই ‘পথশিশু’।
হিসাব মেলে না
পুলিশ সদরদপ্তরের হিসাবে, এ বছরের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত ১৫ হাজার ৭১৭ শিশু নিখোঁজের জিডি হয়েছে। দিনে গড়ে ৭৪ জন। ফিরেছে ১৩ হাজার ৬৭৯ জন। খোঁজ মেলেনি ২ হাজার ৩৮ শিশুর। তাদের ৬৮ জনের বয়স ৯ বছরের নিচে।
৮৭ শতাংশ উদ্ধারের হার কাগজে মন্দ শোনায় না। কিন্তু যে শিশু তিন দিন পর ফিরল আর যে তিন বছর পর, দুজনই একই ঘরে ‘উদ্ধার’। মাঝের দিনগুলো তারা কোথায় ছিল, কার হাতে পড়েছিল, কোনো খাতায় লেখা নেই। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের হিসাবে বছরের প্রথম আট মাসে নিখোঁজ অন্তত ৩৬ শিশুর লাশ মিলেছে।
পুলিশ কারণও জানিয়েছে। ছোটরা পথ হারায়। বড়রা রাগ করে ঘর ছাড়ে, পড়ার চাপে পালায়। তালিকাটা ভুল নয়। তবে দায়ের প্রায় সবটুকু গিয়ে পড়েছে শিশুর কাঁধে। অভাব, সৎ সংসারের মার, শিশুশ্রম–এই শব্দগুলো সেখানে নেই।
চাইল্ড হেল্পলাইন ১০৯৮-এর ব্যবস্থাপক চৌধুরী মো. মোহাইমেন বলেন, ‘যে শিশু হারিয়ে রাস্তায় নামে, ঘরে ফিরতে পারে না, সে-ই একসময় পথশিশু হয়ে যায়।’
সেতুর ওপর দুই মেয়ে
সদরঘাটে দিন শুরু হয় ভোর ৪টায়। লঞ্চ ভেড়ার আগেই শিশুরা নেমে পড়ে ফেলে দেওয়া বোতলের খোঁজে। দিন শেষে হাতে আসে দুই-তিনশ টাকা। কমলাপুরে তারা পানি বেচে, কুলির কাজ করে।
ঢাকার এক মাজারের চত্বরে শুয়ে ছিল ১২ বছরের রাকিব (ছদ্মনাম)। বাবা আবার বিয়ে করেছেন, মা-ও। কোনো সংসারে তার জায়গা হয়নি। বাবা আর সৎমায়ের মার খেয়ে সে বেরিয়ে পড়ে। মাসখানেক ধরে মাজারেই আছে।
এক পদচারী সেতুতে রাতে ঘুমানোর জোগাড় করছিল দুই মেয়ে, মিলি ও নিগার (ছদ্মনাম)। বয়স ১০ থেকে ১২-এর মধ্যে। মিলির বাড়ি জামালপুরের চরে। ভিটেটা নদী নিয়ে গেছে। বাবা মারা যাওয়ার পর মা আবার বিয়ে করেন। সৎবাবার নির্যাতন সইতে না পেরে সে পালিয়ে আসে। এখন সিগন্যালে পানি আর ফুল বেচে। নিগারের মা-বাবা নেই। চাচার বাড়ি থেকে তাকে শহরের এক বাসায় গৃহসহায়িকার কাজে পাঠানো হয়েছিল। সারাদিন খেটেও পেট ভরে খেতে পেত না। সেখান থেকে পালিয়ে এসেছে ফুটপাতে।
দিনটা কাজে কেটে যায়। ভয় রাত নিয়ে। দুজন তাই পালা করে ঘুমায়। একজন ঘুমালে আরেকজন পাহারা দেয়। পাশেই শুয়ে ছিলেন এক নারী, হাতের কাছে একটা লাঠি। মিলি বলে, ‘এইহানে আমরার কুনু আপন নাই। সবাই খালি মারতে চায়।’
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সোহেল (ছদ্মনাম) হারিয়েছিল ৬-৭ বছর বয়সে। তার মা এই প্রতিবেদককে বলেন, বাজারে ছেলের হাত ছেড়ে দোকানির সঙ্গে দুটো কথা বলেছিলেন। ফিরে দেখেন, ছেলে নেই। ওই কয়েক মুহূর্তের জন্য তিনি আজও নিজেকে দোষ দেন। সেদিনই জিডি করেছিলেন। সোহেলের পরের তিন বছর কেটেছে স্টেশনে স্টেশনে। এক সমাজকর্মী কাছে ডেকে গল্প করতে করতে গত বছর তার গ্রামের নাম বের করেন। মা এসে ছেলেকে নিয়ে যান।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ২০২২ সালের জরিপ বলছে, প্রতি দশজন পথশিশুর আটজন পথচারীর হাতে হয়রানির শিকার হয়। ৩০ শতাংশ ঘুমের মধ্যে সহিংসতার মুখে পড়ে।
ফিরেও ফেরা হয় না
সমাজসেবা অধিদপ্তরের মনোসামাজিক কাউন্সেলর মোহাম্মদ ফরহাদ হোসেন বলেন, ‘পথে আসা শিশুর ভেতরে প্রথমে যা পাই, তা ট্রমা। সামান্য শব্দে চমকে ওঠে। আমাদের পেশায় সবচেয়ে কঠিন কাজ পথশিশুর বিশ্বাস পাওয়া।’
গাইবান্ধার ১২ বছরের এক ছেলেকে বগুড়া রেলস্টেশনে পাওয়া গিয়েছিল ঘর ছাড়ার ২২ দিন পর। সৎবাবার সংসারে পান থেকে চুন খসলেই মার। রাস্তায় সৎবাবার গড়নের কাউকে দেখলে সে কুঁকড়ে যেত। কাউন্সেলিংয়ের পর তাকে পরিবারে ফেরানো হয়। খাতায় সেটি সাফল্য। পরে খোঁজ নিতে গিয়ে দেখা গেল, সে আবার ওই ঘর থেকে বেরিয়ে গেছে।
খুলনার রূপসার সোনিয়া (ছদ্মনাম) নানির বাড়িতে আপনজনের হাতেই নিপীড়িত হয়েছে। পালিয়ে ঘাটের আশপাশে থাকত। তাকে পাঠানো হয় সরকারি শিশু পরিবারে। দুই বছর ধরে সে সেখানে পড়াশোনা করছে। দুই শিশুর তফাত একটাই। মেয়েটি একটা নিরাপদ জায়গা পেয়েছিল। মিলি আর নিগার পায়নি।
বিবিএসের জরিপে ৬৪ শতাংশ পথশিশু বলেছে, তারা পরিবারে ফিরতে চায় না। ৩৬ শতাংশের বেশি শিশুর বাড়ির পরিবেশ সহিংস। অর্থাৎ হারানো শিশুকে খুঁজে পাওয়া অর্ধেক কাজ। বাকি অর্ধেক ঘরটাকে ফেরার মতো করে তোলা।
রাষ্ট্র কী বলছে
সমাজসেবা অধিদপ্তরের পরিচালক ও সমন্বিত শিশু পুনর্বাসন কেন্দ্র কর্মসূচির পরিচালক মোহাম্মদ আবদুল হামিদ মিয়া বলেন, ‘পথশিশুদের সমাজের মূলস্রোতে ফিরিয়ে আনা সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।’ তিনি জানান, সরকার ঝুঁকিপূর্ণ শিশুদের জন্য দীর্ঘমেয়াদি ও সমন্বিত উদ্যোগ বাস্তবায়ন করছে।
মাঠের ছবিটা ভিন্ন। অপরাধী চক্র মাদক আর অস্ত্র বহনে এই শিশুদের ব্যবহার করে। ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের এক পদস্থ কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘পথশিশুদের গ্রেপ্তার করা হলে পরে আরও বড় অপরাধী হয়ে বের হয়। কারণ তাদের পুনর্বাসনের যথাযথ সুবিধা আমাদের হাতে নেই।’ অথচ শিশু আইন ২০১৩ অনুযায়ী সব থানায় শিশুবিষয়ক ডেস্ক থাকার কথা। দেশে সমাজকর্মী চার হাজারের মতো। ইউনিসেফের হিসাবে দরকার এক লাখের বেশি। মোহাইমেনের আক্ষেপ, ‘আপনি-আমি শিশুদের নিয়ে ভাবছি, কিন্তু আমরা সংখ্যালঘু। কারণ আমার-আপনার কোনো জোট নেই।’
অপরাধ না করেও অনেক পথশিশু আটকা পড়ে শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রে। এক কিশোর তার কাউন্সেলরকে বলেছিল, ‘আমার নামের পাশে তো লাল কালি পইড়া গেছে। এখন ভালো হওয়ার চিন্তা কইরা লাভ কী?’ বিবিএসের জরিপে ৭৯ শতাংশ পথশিশু পুনর্বাসনকেন্দ্রে থাকতে চায়নি, কারণ সেখানে স্বাধীনতা নেই। পথশিশুদের সংগঠন লিডোর প্রতিষ্ঠাতা ফরহাদ হোসেন বলেন, ‘তাকে তুলে নিয়ে বলা হলো, এখানেই থাকবে, বাইরে বেরোতে পারবে না। তার সম্মতি নেওয়া হয়নি। তিন বেলা ভাত দিলে সে থেকে যাবে, এটা ভাবা ভুল। সুযোগ পেলে সে পালাবে।’ তিনি আরও বলেন, ‘একজন শিশু যখন রাস্তায় ঘুমায়, তখন আপনার-আমার গায়ে আর কাপড় থাকে না। রাষ্ট্রের গায়েও থাকে না।’
যেখান থেকে শুরু করা যায়
বিশেষজ্ঞদের মতে, রাস্তায় এক রাত কাটালে অনেক শিশুর ভেতরটা বদলে যায়। ভয় বাসা বাঁধে। মানুষ ও সমাজের ওপর অনাস্থা জন্মায়। সে ধরে নেয়, রাস্তা ছাড়া বাঁচার আর কোনো জায়গা নেই। এই মনটা না বুঝে কোনো উদ্যোগ সফল হতে পারে না।
এজন্য যে কাজগুলো করতে হবে তাও অচেনা নয়। থানার জিডি আর রাস্তা থেকে পাওয়া শিশুর তথ্য এক তথ্যভান্ডারে আনতে হবে, যাতে স্টেশনে পাওয়া শিশুর ছবি সেদিনই মিলিয়ে দেখা যায়। থানা, স্টেশন, ঘাট আর টার্মিনালে চাই শিশু সহায়তা ডেস্ক, যেখানে একা ঘোরা শিশুকে তাড়ানো হবে না, ডেকে কথা বলা হবে। ফেরানোর আগে পরিবারটির পাশে দাঁড়াতে হবে নগদ সহায়তা আর কাউন্সেলিং নিয়ে। যার ফেরার ঘর নেই, বিশেষ করে মেয়েদের জন্য, খাঁচা নয়, চাই ঘরের মতো স্থায়ী, শিশুবান্ধব আশ্রয়, যেখানে সে থাকবে, কাউন্সেলিং পাবে, পড়বে। লেখাপড়ার সঙ্গে হাতের কাজ শেখার সুযোগ রাখতে হবে। তাতে সে দক্ষতা পাবে, জীবন নিয়ে নতুন করে ভাবতেও শিখবে।
পথশিশুদের পুনর্বাসনে ৪২০ কোটি টাকার সরকারি উদ্যোগের খবর এসেছে। প্রশ্ন একটাই। যাদের জন্য এই টাকা, তাদের কাছে কি জানতে চাওয়া হয়েছে তারা কী চায়?
- বিষয় :
- নিখোঁজ