মেয়েদের স্বপ্নের সামনে সমাজের দেয়াল
ঠাকুরগাঁওয়ের রাণীশংকৈলে রাঙ্গাটুঙ্গি ইউনাইটেড ফুটবল একাডেমিতে অনুশীলনরত মেয়েরা
মোশারফ হোসাইন
প্রকাশ: ১১ অক্টোবর ২০২৬ | ০৭:৪৩ | আপডেট: ১১ অক্টোবর ২০২৬ | ১৬:৩৪
| প্রিন্ট সংস্করণ
ঢাকার ইট-পাথরের কোলাহল থেকে ৩৯৮ কিলোমিটার দূরে ঠাকুরগাঁওয়ের রাণীশংকৈল। সেখানকার রাঙ্গাটুঙ্গি মহিলা ফুটবল একাডেমির মাঠটি যেন একদল কিশোরীর স্বপ্ন বোনার ক্যানভাস। প্রতিদিন কয়েক কিলোমিটার এবড়োখেবড়ো গ্রামীণ পথ সাইকেল চালিয়ে, সমাজের হাজারো ভ্রুকুটি উপেক্ষা করে এ মাঠে ছুটে আসে স্কুলপড়ুয়া একদল অদম্য মেয়ে। তবে সবুজ ঘাসে পা রাখার আগেই তাদের পার হতে হয় সামাজিক কটূক্তির এক অদৃশ্য কাঁটাতার।
‘মেয়ে মানুষ হয়ে ফুটবল খেলবে কেন?’, ‘প্যান্ট পরে মাঠে যাবে কেন?’–এমন অসংখ্য তীক্ষ্ণ প্রশ্ন আর তির্যক মন্তব্য প্রতিদিন ধেয়ে আসে তাদের দিকে। সেই নেতিবাচক কথার রেশ পৌঁছে যায় পরিবার পর্যন্ত, কখনও বা তা রূপ নেয় গুরুতর নিরাপত্তাহীনতায়। এমন নজিরও আছে, মেয়েরা খেলতে আসায় ক্ষুব্ধ হয়ে একটি গোষ্ঠী রাতের আঁধারে পুরো মাঠটিই কেটে নষ্ট করে দিয়েছিল।
পরিবারের চাপ, সমাজের টিপ্পনি আর পদে পদে প্রতিবন্ধকতা–সবকিছু পেছনে ফেলে মেয়েরা প্রতিদিন মাঠে হাজির হয়। কারণ, এই মেয়েদের কাছে ফুটবল নিছক কোনো খেলা নয়; এটি তাদের স্বপ্ন, মুক্তির আনন্দ এবং দেশের জার্সি গায়ে জড়ানোর এক তীব্র আকাঙ্ক্ষা। রাণীশংকৈলের বলিদ্বারা উচ্চ বিদ্যালয়ের অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থী তন্বী আক্তারের গল্পটাও আলাদা নয়। খুব ছোটবেলা থেকে সে ফুটবলের প্রেমে মগ্ন। পরিবার শুরু থেকে সমর্থন দিলেও, বাসা থেকে মাঠে আসার পথটুকু তার জন্য কখনও মসৃণ ছিল না। তন্বীর ভাষায়, ‘মেয়ে মানুষ প্যান্ট পরে খেলবে–এমন নানা আজেবাজে কথা বলে গ্রামের মানুষ। বাসায় গিয়েও অনেকে মা-বাবাকে বলেছে, কেন মেয়েকে খেলতে পাঠাচ্ছেন! এমনকি ধর্মীয় বিষয় টেনেও কথা শোনায় তারা। তবে আমার পরিবার আমাকে ভরসা দিয়েছে বলে এখনও মাঠে আসতে পারছি।’
একই শ্রেণির আরেক শিক্ষার্থী মুহিমা রানী খুশি। তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ার সময় ফুটবলে তার হাতেখড়ি। খুশির আক্ষেপ, ‘মেয়েদের ফুটবল খেলা ভালো না, এটা সমাজের সঙ্গে মানায় না– এসব কথা শুনে বড় হচ্ছি। যাতায়াতের পথেও মানুষ এমন সব অকথ্য ভাষা ব্যবহার করে, যা মুখে আনা সম্ভব নয়। এসব সহ্য করে মাঠে আসি, কারণ আমি খেলোয়াড় হতে চাই। মা-বাবার মুখ উজ্জ্বল করতে চাই।’
কখনও কি মনে হয়েছে এসব কটূক্তি সইতে না পেরে খেলা ছেড়ে দিই? এমন প্রশ্নে খুশির উত্তর, ‘প্রথম দিকে এমনটা হয়েছিল। মানুষের কথায় কষ্ট পেয়ে দুদিন খেলতে আসিনি। পরে একাকী ভেবে দেখলাম, মানুষের কথায় তো আর নিজের স্বপ্ন ছেড়ে দিলে চলবে না। আমরা মেয়ে মানুষ, আমাদের এসব কথা শুনতেই হবে। সেই জেদ থেকে দুদিন পর আবার মাঠে ফিরে আসি। আমরা যদি ছেলে হতাম, কেউ কিছু বলত না!’
নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী জয়া কিসকু বলে, ‘মা প্রায়ই বলে খেলতে না যাওয়া ভালো। আমি মেয়ে হয়ে জন্মেও নিজেকে ভাগ্যবান মনে করি। আমি ফুটবল খেলে আজ যতদূর এসেছি, অনেক ছেলে সেই পর্যায়ে যেতে পারেনি।’
মেয়েদের অদম্য আগ্রহের কথা জানান রাঙ্গাটুঙ্গি ইউনাইটেড মহিলা একাডেমির প্রশিক্ষক গোপাল মুর্মু সুগা। তিনি বলেন, ‘সাত কিলোমিটার দূর থেকেও মেয়েরা সাইকেল চালিয়ে অনুশীলন করতে আসে। প্রতিদিন ৫০ জনের বেশি মেয়ে মাঠে ঘাম ঝরায়। অথচ একসময় এলাকাবাসীর বাধায় এক সপ্তাহ খেলা বন্ধ রাখতে হয়েছে।’
মেয়েদের এই সংগ্রাম কি কেবল ফুটবলেই সীমাবদ্ধ? রংপুরের ‘ওমেন্স ড্রিমার ক্রিকেট একাডেমি’র পরিচালক ও প্রশিক্ষক আরিফা জাহান বীথি শোনালেন একই অভিজ্ঞতার কথা। তিনি বলেন, ‘সমাজের মানুষের কটূক্তির কারণে অনেক মেয়ে খেলা ছেড়ে দিয়ে ঘরে বসে কেঁদেছে। অনেককে বুঝিয়ে আবার মাঠে ফিরিয়ে আনতে হয়েছে। এমনও দিন দেখেছি, একজন নারী ক্রিকেটার খেলতে আসার জন্য আক্ষরিক অর্থে আমার হাত-পা ধরে কেঁদেছে।’
তবে অন্ধকারের পাশে থাকে আলোর রেখা। রাঙ্গাটুঙ্গি ইউনাইটেড মহিলা ফুটবল একাডেমির পরিচালক তাজুল ইসলাম জানালেন সমাজ পরিবর্তনের আশাজাগানিয়া কথা। তিনি বলেন, ‘আগে আমরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে হাতে-পায়ে ধরে মেয়েদের একাডেমিতে আনতাম। এখন অভিভাবকরাই এসে বলেন, আমার মেয়েটাকে খেলা শেখান।’ এই একাডেমি থেকে উঠে আসা স্বপ্না রানী সরকার, সাগরিকা ও কুহাতি কিসকুর মতো খেলোয়াড় আজ জাতীয় দলে খেলছেন। জাতিসংঘ শিশু তহবিলের (ইউনিসেফ) তথ্যও বলছে, সুযোগ পেলে মেয়েদের ক্রীড়াক্ষেত্রে অংশগ্রহণের আগ্রহ প্রবল। সংস্থাটির ক্রীড়াভিত্তিক কর্মসূচিতে ৪০ লাখের বেশি মেয়ে যুক্ত হয়েছে; যার মধ্যে ২০ লাখ সক্রিয়ভাবে খেলছে। ইউনিসেফের ‘গেম চেঞ্জার্স: বাংলাদেশে বাল্যবিবাহ বন্ধে খেলাধুলায় মেয়েদের ক্ষমতায়ন’ শীর্ষক প্রতিবেদনে মেয়েদের জন্য নিরাপদ পরিসর তৈরি, আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধি এবং বাল্যবিবাহ রোধে খেলাধুলার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার কথা তুলে ধরা হয়েছে। সরকারও মেয়েদের খেলাধুলায় আগ্রহী করতে নানা উদ্যোগ নিয়েছে। ক্রীড়াকে পেশা হিসেবে নেওয়ার সুযোগ, অসচ্ছল নারী খেলোয়াড়দের ভাতা ও আর্থিক সহায়তা প্রদান এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সাফল্যের জন্য পুরস্কারের ব্যবস্থা করা হয়েছে।
প্রকৃতপক্ষে, মাঠে মেয়েদের অংশগ্রহণের কোনো ঘাটতি নেই। ঘাটতি রয়েছে নিরাপদ পরিবেশ, সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা এবং অবকাঠামোগত সুযোগের। প্রান্তিক জনপদের এই মেয়েদের কথায় একটি বিষয় স্পষ্ট–কেবল আর্থিক সহায়তা বা প্রণোদনা নয়, তাদের সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন একটি নিরাপদ যাতায়াত ব্যবস্থা, ভয়হীন একটি মাঠ এবং সামাজিক স্বীকৃতি।
- বিষয় :
- অধিকার
- আন্তর্জাতিক কন্যাশিশু দিবস