তিন কোটি মনের ভার দেড় হাজার জোড়া হাত
অধ্যাপক কামাল চৌধুরী
প্রকাশ: ১১ অক্টোবর ২০২৬ | ০৭:৪৪ | আপডেট: ১১ অক্টোবর ২০২৬ | ১৬:৩২
| প্রিন্ট সংস্করণ
এবারের বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবসের প্রতিপাদ্য ‘লিভড এক্সপেরিয়েন্সেস হার্ড: রিয়েল ভয়েসেস, রিয়েল চেঞ্জ’। অর্থাৎ যারা মানসিক কষ্টের ভেতর দিয়ে যাচ্ছেন, তাদের কথা শুনতে হবে। তাদের অভিজ্ঞতাকে গুরুত্ব দিয়ে সামনে আনতে হবে।
কথাটা খাঁটি। তবে শোনার তালিকা থেকে আরেক দল মানুষ বাদ পড়ে যায়। তারা এ সেবার ভেতরের মানুষ। শহরের চেম্বার থেকে প্রত্যন্ত গ্রামের উঠান পর্যন্ত যে মনোসামাজিক কর্মীরা মানুষের পাশে থেকে নিরলস খাটছেন, তাদের কথাও শোনা দরকার। চাহিদা কত বড় আর সামর্থ্য কত ছোট, তারাই সবচেয়ে কাছ থেকে দেখেন।
হিসাব শুরু হোক সংখ্যা দিয়ে। জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের সমীক্ষা বলছে, দেশের প্রাপ্তবয়স্কদের প্রায় ১৮ শতাংশ কোনো না কোনো মানসিক সমস্যায় ভুগছেন। ১৮ বছরের কম বয়সীদের মধ্যে এই হার প্রায় ১৩ শতাংশ। মাথা গুনলে প্রায় তিন কোটি মানুষ।
এর বিপরীতে মনোরোগ বিশেষজ্ঞ আর সনদপ্রাপ্ত মনোবিজ্ঞানী মিলিয়েও সংখ্যাটা এক হাজারেরও কম। সাইকোথেরাপিস্ট, ক্লিনিক্যাল সোশ্যাল ওয়ার্কার আর মনোসামাজিক কাউন্সেলর যোগ করলে দাঁড়ায় দেড় হাজারের মতো। অর্থাৎ প্রতি ২০ হাজার ভুক্তভোগীর জন্য একজন পেশাজীবী। শুধু মনোরোগ বিশেষজ্ঞের হিসাব আরও করুণ।
বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা প্রতি লাখ মানুষে অন্তত একজন রাখতে বলে। আমাদের আছেন সাড়ে তিনশর মতো, অর্থাৎ প্রায় পাঁচ লাখ মানুষে একজন। তাদের বেশির ভাগ আবার ঢাকায়। এই সেবা রাজধানীর বাইরে কার্যত মেলে না।
সবচেয়ে উদ্বেগের তথ্য হলো, আক্রান্তদের ৯০ শতাংশের বেশি কখনও কোনো পেশাজীবীর কাছে যান না। কারণ অনেক। সচেতনতার অভাব আছে, গ্রাম আর শহরের বৈষম্য আছে। পেশাজীবী কম, সেবাকেন্দ্রও হাতেগোনা। আছে লোকলজ্জা। ‘পাগল’ তকমার ভয়ে অনেক পরিবার অসুখটাকে ঘরের ভেতর চেপে রাখে।
এ ঘাটতি সামনে আরও বড় সংকট ডেকে আনবে। একজন বিশেষজ্ঞ তৈরি হতে অনেক বছর লাগে। ততদিন হাত গুটিয়ে বসে থাকার সুযোগ নেই। তাই মানসিক চিকিৎসাকে হাসপাতাল আর বিশেষজ্ঞের চার দেয়ালে আটকে রাখা চলবে না। অসুখ হলে তবে চিকিৎসা, এই ভাবনা থেকে সরে আসতে হবে। আগে প্রতিরোধ, তারপর শুরুতেই রোগ চিনে ফেলা। সীমিত জনবলে এটাই সবচেয়ে টেকসই পথ।
এ পথের মূল ভরসা কমিউনিটি মানসিক স্বাস্থ্যকর্মী। উপজেলা থেকে সেবা ছড়াবে তাদের হাত ধরে। তারা মানুষের দোরগোড়ায় তথ্য পৌঁছে দেবেন। বোঝাবেন, শরীরের অসুখের মতো মনের অসুখেরও চিকিৎসা আছে। জটিল রোগ দ্রুত শনাক্ত করে ঠিক জায়গায় পাঠাবেন। এটা কল্পনার কথা নয়। জিম্বাবুয়ের ‘ফ্রেন্ডশিপ বেঞ্চ’ কিংবা ভারতের গোয়ায় প্রশিক্ষিত সাধারণ কর্মীদের পরামর্শে বিষণ্নতা কমার প্রমাণ মিলেছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও এভাবে কাজ ভাগ করে নেওয়ার পক্ষে। এই কাঠামো দাঁড় করাতে সরকার, এনজিও, নাগরিক সমাজ আর পেশাজীবী সংগঠনকে একসঙ্গে কয়েকটি কাজ করতে হবে।
প্রথম কাজ দক্ষ কর্মী গড়া। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার এমএইচগ্যাপ, মেন্টাল হেলথ ফার্স্ট এইড আর সাইকোলজিক্যাল ফার্স্ট এইডের মতো সহজ প্রশিক্ষণ দেশের বাস্তবতায় মানিয়ে নিতে হবে। কর্মীরা শিখবেন কোন লক্ষণ জটিল, প্রাথমিক মানসিক সহায়তা কীভাবে দিতে হয়, কখন রোগীকে বিশেষজ্ঞের কাছে পাঠাতে হয়। মানসিক চাপ, মৃদু বিষণ্নতা বা উদ্বেগের মতো সাধারণ সমস্যা তখন এলাকাতেই সামলানো যাবে। বিশেষায়িত হাসপাতালের ভিড়ও কমবে।
দ্বিতীয়ত, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স থেকে জেলা হাসপাতাল পর্যন্ত একটি স্পষ্ট রেফারেল নির্দেশিকা আর ডিজিটাল যোগাযোগব্যবস্থা লাগবে।
তৃতীয়ত, লোকলজ্জা ভাঙতে উঠান বৈঠক, স্কুল-কলেজ আর পাড়ার ক্লাবে খোলামেলা আলাপ চাই। পরিবার যেন ভয় না পেয়ে শুরুতেই চিকিৎসার দিকে হাঁটে।
চতুর্থত, মাঠের কর্মীদের পেশাগত স্বীকৃতি, ন্যায্য ভাতা ও সুরক্ষা দিতে হবে। নইলে কেউ দীর্ঘদিন টিকবেন না। রোগীর অগ্রগতি লিখে রাখার জন্য সহজ একটি মোবাইলভিত্তিক ব্যবস্থাও দরকার।
পঞ্চমত, আর্থিক সংস্থান। স্বাস্থ্য বাজেটের আধা শতাংশের মতো যায় মানসিক স্বাস্থ্যে। বৈশ্বিক গড় এর চার গুণের বেশি। এই বরাদ্দে কোনো বড় পরিকল্পনা দাঁড়ায় না। তাই স্বাস্থ্য বাজেট নতুন করে সাজাতে হবে।
ষষ্ঠত, প্রতিটি জেলা সদর হাসপাতালে মানসিক স্বাস্থ্যের বহির্বিভাগ ও অন্তর্বিভাগ চালু করতে হবে। তাহলে জটিল রোগী নিয়ে পরিবারকে পাবনা বা ঢাকায় ছুটতে হবে না। খরচ কমবে, সেবা কাছে আসবে।
শেষ কথাটা বিদ্যমান জনবল নিয়ে। যে ক’জন বিশেষজ্ঞ আছেন, তাদের ঠিক জায়গায় বসাতে হবে। জেলার বিশেষায়িত কেন্দ্র চিকিৎসা দেবে, মাঠকর্মীদেরও তত্ত্বাবধান করবে। গ্রামের কর্মী আর জেলার বিশেষজ্ঞ এক সুতোয় বাঁধা পড়লে প্রতিরোধ ও চিকিৎসার জাল মজবুত হবে।
২০৩০ সালের মধ্যে সবার জন্য মানসিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে চাইলে সরকারকে এখনই নড়েচড়ে বসতে হবে। প্রথম ধাপ বাজেট বাড়ানো। পরের ধাপ অন্তত জেলা সদরে বিশেষায়িত ইউনিট। মানসিক স্বাস্থ্য দিবস উপলক্ষে কথাগুলো বাস্তবায়নের দাবিটুকুই আমাদের। তা শুনে সেবা পর্যন্ত পৌঁছাতে না পারলে সেই শোনা অর্থহীন।
লেখক: অধ্যাপক, ক্লিনিক্যাল সাইকোলজি বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়