ঢাকা রোববার, ১৮ অক্টোবর ২০২৬

বাল্যবিবাহ কমেনি, কমেছে খবর

বাল্যবিবাহ কমেনি, কমেছে খবর
×
×

অলংকরণ :: সাফায়েত সাগর

শাহেরীন আরাফাত

প্রকাশ: ১১ অক্টোবর ২০২৬ | ০৭:৪৫ | আপডেট: ১১ অক্টোবর ২০২৬ | ১৬:২৯

| প্রিন্ট সংস্করণ

সাতক্ষীরার শ্যামনগরের একটি বালিকা বিদ্যালয়ে ষষ্ঠ শ্রেণিতে ভর্তি হয়েছিল ৪০টি মেয়ে। দশম শ্রেণিতে ওঠার আগেই তাদের অর্ধেকের বিয়ে হয়ে গেছে। অথচ একই জেলায় ঠেকানো বাল্যবিবাহের হিসাব বছর বছর কমছে। ২০২৩ সালে ঠেকানো হয়েছিল প্রায় ১ হাজার ৮৪৬টি বিয়ে। ২০২৪ সালে সংখ্যাটা নামে ১ হাজার    ৪৭৪-এ, ২০২৫ সালে ৯৬৮-তে। চলতি বছর এখন পর্যন্ত খাতায় উঠেছে প্রায় ৪৭৯টি। মাঠের মানুষ বলছেন, বিয়ে কমেনি। কমেছে খবর। বাল্যবিবাহ এখন হয় দূরের গ্রামে কিংবা নকল খাতায়। লিখেছেন শাহেরীন আরাফাত
---------------------------------------------------------------------------

সংখ্যার ভেতরের সংখ্যা
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) ও ইউনিসেফের বহু নির্দেশক ক্লাস্টার জরিপ বা মাল্টিপল ইন্ডিকেটর ক্লাস্টার সার্ভে (এমআইসিএস) ২০২৫ বলছে, ২০ থেকে ২৪ বছর বয়সী নারীদের ৪৭.২ শতাংশের বিয়ে হয়েছে আঠারোর আগে। ২০১৯ সালে হার ছিল ৫১.৪ শতাংশ। একই সময়ে ১৫ থেকে ১৯ বছরের বিবাহিত কিশোরীর হার ৩২.৯ থেকে বেড়ে হয়েছে ৩৮.৯ শতাংশ। সাতক্ষীরায় বাল্যবিবাহের হার ৬২ শতাংশের বেশি।

মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রী সংসদে জানিয়েছেন, জুলাই ২০২৩ থেকে জুন ২০২৬ পর্যন্ত সরকারি উদ্যোগে চার হাজার আটটি বাল্যবিবাহ ঠেকানো গেছে। ঠেকানো বিয়েও সব সময় ঠেকে থাকে না।

গত বছর জামালপুরে এ প্রতিবেদকের উদ্যোগে প্রশাসন ১২ বছরের তামান্নার (ছদ্মনাম) বিয়ে আটকে দেয়। পরের মাসেই জন্মসনদে বয়স বাড়িয়ে তাকে অন্য এলাকায় নিয়ে বিয়ে দেওয়া হয়। কাজি বিয়ে নিবন্ধন করেননি। নদীভাঙনে নিঃস্ব মা বলেন, ‘আমগর ঘরবাড়ি নাই। উঠুলি থাহি। মাইয়ার বাপে আরেক সংসার করছে। আমি একলা অর দায়িত্ব নিবার পারতাছি না।’ ১২ বছরের মেয়েটি এখন সংসার করছে।

মেয়েকে বোঝা ভাবার মন
বাল্যবিবাহের কারণ হিসেবে প্রথমে আসে দারিদ্র্য। এটা অর্ধেক সত্য। ব্রেকিং দ্য সাইলেন্সের নির্বাহী পরিচালক রোকসানা সুলতানার মতে, আসল সমস্যা মেয়েকে বোঝা ভাবার মন। তাঁর ভাষায়, ‘বাল্যবিবাহ শুধু গরিব পরিবারে হয়, এ ধারণা ভুল। উচ্চবিত্তের ঘরটা আমরা দেখি না।’ এমআইসিএসও বলছে, সবচেয়ে গরিব পরিবারে হার ৬৫ শতাংশ, সবচেয়ে ধনী পরিবারেও ৪১ শতাংশ।

রাজধানীর একটি ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলের ১৬ বছরের আনিকার (ছদ্মনাম) বিয়ে আগে থেকেই ঠিক করা ছিল। ও-লেভেলে ভালো ফলের পরপরই ঘরোয়া অনুষ্ঠানে বিয়ে হয়। প্রজনন স্বাস্থ্য নিয়ে কিছু না জানায় অল্প দিনেই সে অন্তঃসত্ত্বা হয়। আপাতত তাকে পড়া ছাড়তে হয়। তার বোন বললেন, ‘ও গর্ভবতী হয়ে পড়বে, এটা আমরা ভাবিনি।’

সুযোগ পেলে মেয়েরা কী পারে, তার প্রমাণও আছে। এ বছর এইচএসসি পরীক্ষায় ছেলেদের চেয়ে ২৬ হাজার ৬৪৫ জন বেশি ছিল। অনেকে সে পর্যন্ত পৌঁছায় না। জামালপুরের এক চরের স্কুলের ছাত্রীরা জানাল, পরীক্ষায় খারাপ করলে ছেলেরা আবার সুযোগ পায়। মেয়েদের আগেই শুনিয়ে রাখা হয়, ফেল করলে বিয়ে।

উপকূলে চাপ বাড়িয়েছে জলবায়ু। বাবা কাজের খোঁজে শহরে বা ইটভাটায়, একা মেয়েকে নিয়ে মায়ের ভয় বাড়ে। আন্তর্জাতিক উদ্ধার কমিটির (আইআরসি) গবেষণায় ভোলা ও সাতক্ষীরায় দুর্যোগের পর বাল্যবিবাহ ৩৯ শতাংশ বেড়ে যাওয়ার তথ্য মিলেছে। ভয়ের সঙ্গে আছে কলঙ্কের চাপ। সামাজিক নিরাপত্তার উন্নতি না হওয়াকে বাল্যবিবাহের অন্যতম কারণ বলে মনে করেন নারীপক্ষের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য শিরীন হক। তাঁর কথায়, ‘পথে মেয়ের বিপদ হলে সমাজ দোষ দেয় মেয়েটিকেই। অপরাধ করে একজন, কলঙ্ক বয় আরেকজন। তাই অনেক মা-বাবা স্কুলের চেয়ে বিয়েকে নিরাপদ ভাবেন।’

শ্যামনগরের ১৫ বছরের সানিয়া (ছদ্মনাম) নবম শ্রেণিতে পড়ত। গত বছর বিয়ের পর পড়া বন্ধ। আইলায় ভিটে হারানোর পর বাবা ঢাকায় আরেক সংসার পেতেছেন। মা বলেন, ‘এই পানিতি চেহারা নষ্ট হইয়ে যায়। বাপ নেই, মাইয়েডারে নিয়ে ভয়ও লাগে।’ সানিয়া বলে, ‘আমি একনো ইস্কুলির কথা ভাবি।’

সাতক্ষীরা সদরের ইউএনও অর্ণব দত্তের মতে, এ দায় স্কুলেরও। তিনি বলেন, ‘শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে একজন ছাত্রী ভর্তি থাকা অবস্থায় তার বাল্যবিবাহ ঠেকানোর দায়িত্ব থেকে প্রতিষ্ঠানপ্রধান নিজেকে দূরে রাখতে পারেন না।’

গোনার বাইরে দলিত মেয়েরা
দলিত মেয়েরা প্রান্তিক তিনভাবে। মেয়ে বলে, গরিব বলে, আবার দলিত বলে। অথচ জাতীয় জরিপে তাদের বাল্যবিবাহের হার আলাদা করে গোনাই হয় না। বেসরকারি সংস্থা দলিতের কর্মসূচি প্রধান তপন কুমার জানান, তাদের কাজের এলাকায় এই হার ৯০ শতাংশের বেশি। বেশির ভাগ মেয়ের বিয়ে হয় ১৩ থেকে ১৫ বছরে।

এশিয়া দলিত রাইটস ফোরামের বাসন্তি সাহা বলছেন, কলোনির মেয়েরা কাছের প্রাথমিক বিদ্যালয় পেরোলেই আটকে যায়। মা-বাবার আগ্রহ কম, সরকারি মাধ্যমিকে ভর্তির প্রস্তুতিও নেই। মেয়ে বেশি পড়লে যৌতুক বেশি লাগবে– এই হিসাবেও বিয়ে এগিয়ে আসে।

ঢাকার একটি হরিজনপল্লিতে দেখা গেল, ছেলেরা কলেজে পড়লেও বেশির ভাগ মেয়ে প্রাথমিকও শেষ করেনি। সংসারে একজনকে পড়ানোর সামর্থ্য, আর সেই একজন ভাই। ১৫ বছরের কাল্কীর (ছদ্মনাম) বিয়ে ঠিক হয়ে গেছে। সে বলল, ‘আমি পঞ্চম শ্রেণি শেষ করতে পারিনি। এখন ঘরের কাজ করেই দিন কাটে।’ যাদের গোনা হয় না, তাদের জন্য নীতিও তৈরি হয় না।

বিয়ের পর যা শুরু হয়
সাতক্ষীরায় অনেক বিয়ে হয় নকল ভলিউম বইয়ে। এক কাজি জানালেন, কোথাও ভুয়া কাগজে বয়স বাড়িয়ে টাকা নেওয়া হয়। নিবন্ধন না থাকলে তালাকের পর মেয়েটি দেনমোহর বা ভরণপোষণ দাবি করতে পারে না। সদরের একটি মাদ্রাসায় দেড় বছরে ১৬ ছাত্রীর বিয়ে হয়েছে, তিনজন এরই মধ্যে ফিরে এসেছে।

কুড়িগ্রামের জেসমিনের (ছদ্মনাম) বিয়ে হয় ১৪ বছরে। নির্যাতনের মুখে দুই বছরের সন্তান নিয়ে বাবার বাড়ি ফেরেন। নিবন্ধনের কাগজ না থাকায় দেনমোহর বা খোরপোশ কিছুই চাইতে পারেননি। একসময় বেঁচে থাকার ইচ্ছাও হারিয়েছিলেন। সন্তানের মুখ চেয়ে আবার দাঁড়িয়েছেন। ২০ বছরের জেসমিন এখন ঢাকায় গৃহকর্মীর কাজ করেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লিনিক্যাল সাইকোলজির অধ্যাপক কামাল চৌধুরী বলছেন, বিষণ্নতা আসে পড়ে। তার আগেই মেয়েটি নিজেকে বোঝা ভাবতে শেখে, হারায় আত্মপরিচয়।

বিবিএস ও ইউএনএফপিএর ২০২৪ সালের জরিপে স্বামীর সহিংসতার হার সবচেয়ে বেশি বিবাহিত কিশোরীদের মধ্যে। নির্যাতনের শিকার নারীদের ৬৪ শতাংশ কাউকে কিছু বলেননি।

শিশুরাই পথ দেখাচ্ছে
দুই বছর আগে কুড়িগ্রামের ১২ বছরের মিষ্টির (ছদ্মনাম) বিয়ের আয়োজন চলছিল। বিয়ের আগের দিন সে বন্ধুদের জানায়। বন্ধুরা এনজিও আর প্রশাসনের সহায়তায় বিয়ে থামায়। মিষ্টি এখন অষ্টম শ্রেণিতে, বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ কমিটির সক্রিয় সদস্য। তার মা বলেন, ‘স্কুল ও প্রশাসনের সহযোগিতা পেয়েছি। এখন ওকে বিয়ে দেব না।’ কুড়িগ্রাম ও চাঁপাইনবাবগঞ্জে ইউনিসেফের সহযোগিতায় গড়া কিশোর-কিশোরী দলগুলো এভাবে ২৪৪টি বাল্যবিবাহ বন্ধে ভূমিকা রেখেছে।

উনিশ ধারার খোলা দরজা
বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন ২০১৭ অনুযায়ী মেয়ের বিয়ের বয়স ১৮, ছেলের ২১। কিন্তু আইনের ১৯ ধারা বলছে, ‘বিশেষ প্রেক্ষাপটে’ অপ্রাপ্তবয়স্কের ‘সর্বোত্তম স্বার্থে’ আদালতের নির্দেশ আর মা-বাবার সম্মতিতে বিয়ে হলে তা অপরাধ নয়। এই ধারায় বয়সের কোনো নিচের সীমা নেই।

মানবাধিকার আইনজীবী সালমা আলী একে দেখেন আইনের ভেতরে রাখা একটি ফাঁক হিসেবে। তাঁর কথায়, ‘এমন বিয়েতে কোনো মেয়ে নিজের ইচ্ছায় রাজি হয় না। সিদ্ধান্তটা অন্য কেউ নেয়, সে শুধু মেনে নেয়।’ ধর্ষণের শিকার অন্তঃসত্ত্বা কিশোরীর কথা বলে বিধানটির পক্ষে যুক্তি দেওয়া হয়। অথচ সেই শিশুর প্রাপ্য বিচার ও চিকিৎসা, বিয়ে নয়। ২০১৭ সালে বাংলাদেশ জাতীয় মহিলা আইনজীবী সমিতি ও নারীপক্ষের রিটে হাইকোর্ট এ ধারা নিয়ে রুল জারি করেছিলেন। জাতিসংঘের সিডও কমিটিও কোনো ব্যতিক্রম ছাড়া ১৮ বছর রাখার সুপারিশ করেছিল। ধারাটি আজও বহাল।

অভিযান দরকার, কিন্তু যথেষ্ট নয়। আরও জরুরি–
* ১৯ ধারার বিশেষ বিধান বাতিল করা।
* জন্ম ও বিয়ে নিবন্ধন ডিজিটাল করে পরস্পর যুক্ত করা, যাতে কাগজে বয়স বাড়ানো না যায়।
* ঠেকানো প্রতিটি বিয়ের মেয়েকে অন্তত এক বছর নজরে রাখা, স্কুল ও উপবৃত্তিতে ধরে রাখা।
* জাতীয় জরিপে দলিত ও প্রান্তিক মেয়েদের আলাদা হিসাব রাখা।
* বিবাহিত কিশোরীদের পড়াশোনায় ফেরার সুযোগ ও কৈশোরবান্ধব স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা।

মিষ্টির বন্ধুরা নিজেদের কাজটা করেছে। এবার বড়দের পালা। যতদিন একটি মেয়েকেও বোঝা ভাবা হবে, ততদিন খাতার বাইরে বিয়ে চলতেই থাকবে।

আরও পড়ুন

×