ঢাকা রোববার, ১৮ অক্টোবর ২০২৬

প্রয়োজন থেকে স্বপ্নযাত্রা

প্রয়োজন থেকে স্বপ্নযাত্রা
×
×

 রিক্তা রিচি

প্রকাশ: ১৮ অক্টোবর ২০২৬ | ০৭:৩৭

| প্রিন্ট সংস্করণ

জীবনের ছক সবসময় মানুষের নিজের ইচ্ছেমতো আঁকা হয় না। কখনও কখনও নিয়তি আর পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতি এমন কিছু বাধ্যবাধকতা সামনে এনে দাঁড় করায়, যা নিমেষেই বদলে দেয় চেনা পথ। হাফসা মোসলেমের গল্পটাও ঠিক তেমনি। ছোটবেলা থেকে শাড়ি আর গহনার প্রতি তাঁর ছিল এক অকৃত্রিম মুগ্ধতা। সেই মুগ্ধতাকে পুঁজি করে কখনও ব্যবসায়ী হওয়ার স্বপ্ন তিনি দেখেননি। বরং তাঁর সাদামাটা ইচ্ছে ছিল গতানুগতিক চাকরি বা ব্যবসার ইঁদুরদৌড়ে না গিয়ে ঘরে বসে সন্তানকে সময় দেওয়া। জীবনের অপ্রত্যাশিত ঝড় আর বাস্তবতার কঠিন প্রয়োজন তাঁর সেই ভাবনাকে আমূল বদলে দেয়।
২০২১ সাল। সংসার আর সন্তানের প্রয়োজন মেটাতে পিঠ যখন দেয়ালে ঠেকে গেছে, সামনে যখন কোনো পথই আর খোলা নেই, তখন এক বুক অনিশ্চয়তা নিয়ে হাফসা শুরু করেন এক নতুন পথচলা। সম্বল বলতে নিজের জমানো মাত্র ১০ হাজার টাকা আর গহনার প্রতি সেই পুরোনো ভালোবাসা। সেই ছোট্ট বিন্দু থেকে শুরু হওয়া উদ্যোগ ‘আট কুঠুরি নয় দরজা’ আজ ডানা মেলেছে। অদম্য ইচ্ছাশক্তি আর পরিশ্রমে ভর করে আজ তাঁর মাসিক বিক্রির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে আট থেকে ১০ লাখ টাকায়।

ঢাকায় জন্ম ও বেড়ে ওঠা হাফসার প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাও কোনো সাধারণ বিষয়ের ওপর ছিল না। ফাইন্যান্স অ্যান্ড ব্যাংকিংয়ে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেছেন তিনি। আমাদের সমাজে ব্যাংকিং বা ফাইন্যান্সের ছাত্রীদের কাছে পরিবার স্বভাবতই একটি নিরাপদ ও সম্মানজনক চাকরির প্রত্যাশা করে। হাফসার পরিবারও এর ব্যতিক্রম ছিল না। পুঁথিগত বিদ্যায় লাভ-ক্ষতির সমীকরণ মেলানো হাফসা নিজের জীবনের জন্য বেছে নেন এক কঠিন সমীকরণ–উদ্যোক্তা জীবন।
শুরুর দিকে কী নিয়ে কাজ করবেন, তা নিয়ে বিস্তর দ্বিধা ছিল। তবে তিনি জানতেন, সফল হতে হলে পণ্য সম্পর্কে গভীর জানাশোনা থাকাটা পূর্বশর্ত। সেই ভাবনা থেকে নিজের সবচেয়ে পছন্দের বিষয় ‘গহনা’কে ক্যানভাস হিসেবে বেছে নেন তিনি। প্রথম দিনের কথা আজও তাঁর চোখে ভাসে। ফেসবুকে একটি পেজ খুলে পোস্ট দিয়েছিলেন–‘আজ থেকে গহনা বিক্রি শুরু করছি।’ প্রথম অর্ডারটি এসেছিল কলেজজীবনের এক বান্ধবীর কাছ থেকে। দীর্ঘদিন যোগাযোগ না থাকা সত্ত্বেও সেই বন্ধুই তাঁর প্রথম ক্রেতা। এরপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। পরিবারের সদস্যরা শুরুতে সন্দিহান থাকলেও, হাফসার একাগ্রতা দেখে তারাও একসময় পূর্ণ সমর্থন জোগাতে শুরু করেন।

হাফসার এ উদ্যোগের সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিকটি সম্ভবত এর নাম–‘আট কুঠুরি নয় দরজা’। এই নামের পেছনে লুকিয়ে আছে তাঁর জীবনের এক গভীর দর্শন ও যন্ত্রণার গল্প। ফকির লালন শাহের ‘খাঁচার ভেতর অচিন পাখি’ গানটি হাফসাকে গভীরভাবে নাড়া দেয়। মানুষের এই দেহরূপী খাঁচার আটটি কুঠুরি আর ৯টি দরজা পার হয়ে যেমন অচিন পাখি যাতায়াত করে, তেমনি জীবনের যত বড় সংকটই আসুক না কেন, তা থেকে মুক্তির কোনো না কোনো দরজা ঠিকই খোলা থাকে। স্রষ্টা বিপদে ফেললে উদ্ধারের পথও তিনিই তৈরি করে দেন–এ বিশ্বাস থেকে নিজের ব্র্যান্ডের নাম রাখেন ‘আট কুঠুরি নয় দরজা’।
তাঁর এ উদ্যোগ কেবল গহনা বিক্রির কোনো সাধারণ প্ল্যাটফর্ম নয়। হাফসার ভাষায়, ‘পুরোনো গহনাকে নতুন রূপ দেওয়া এবং তুলনামূলক কম দামে টেকসই গহনা ক্রেতার কাছে পৌঁছে দেওয়াই আমাদের লক্ষ্য।’ এ জন্যই তাদের ট্যাগলাইন–‘হোয়ার ট্র্যাডিশন ব্লেন্ডস উইথ ট্রেন্ড’ (যেখানে ঐতিহ্যের সঙ্গে আধুনিকতার মেলবন্ধন ঘটে)।

বাংলাদেশের ডিজাইনার গহনার বাজারে ‘কালো গহনা’ বা ব্ল্যাক জুয়েলারি জনপ্রিয় করার পেছনে হাফসার বিশেষ ভূমিকা রয়েছে। তিনিই প্রথম স্থানীয় মোটিফে কালো গহনার কাজ শুরু করেন। এর পাশাপাশি গোল্ড প্লেটেড, সিলভার প্লেটেড, তামা আর পিতল নিয়েও তাঁর নিরীক্ষামূলক কাজ রয়েছে। গ্রাহকের রুচি, চাহিদা আর দেশীয় ঐতিহ্যের মিশেলে নিজেই গহনার নকশা করেন।
বর্তমানে হাফসার এ স্বপ্নের কারখানায় কাজ করছেন ১০ জন দক্ষ কারিগর। রয়েছেন চারজন স্থায়ী কর্মী এবং চুক্তিবদ্ধ আরও বেশ কয়েকজন। অনলাইনের পাশাপাশি রাজধানীর ধানমন্ডিতে গড়ে তুলেছেন নিজেদের একটি আউটলেটও।
যে নারী একসময় শুধু নিজের পৃথিবী সাজাতে চেয়েছিলেন, আজ তিনি অনেকের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করেছেন। হাফসা মনে করেন, ব্যবসার মূল পুঁজি শুধু টাকা নয়, বরং সততা আর নিরলস পরিশ্রম। সততা আর কাজের প্রতি একাগ্রতাই তাঁকে আজকের অবস্থানে এনেছে। হাফসার গল্পটি আমাদের মনে করিয়ে দেয়–সব গল্প স্বপ্ন থেকে শুরু হয় না, কিছু গল্প প্রয়োজন থেকেও জন্ম নেয়; সে প্রয়োজনই একসময় পরিণত হয় জীবনের সবচেয়ে সুন্দর স্বপ্নে। 

আরও পড়ুন

×