ঢাকা সোমবার, ২২ জুন ২০২৬

সাধারণ থেকেও অসাধারণ হয়ে ওঠার আখ্যান

সাধারণ থেকেও অসাধারণ হয়ে ওঠার আখ্যান
×

.স্যামসন এইচ চৌধুরী

 এবিএম ফজলুর রহমান, পাবনা

প্রকাশ: ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৫ | ০৭:১৬ | আপডেট: ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৫ | ১০:২৫

পাবনার মানুষ তাঁকে একজন শিল্পপতি হিসেবে নয়, একান্ত আপনজন, দাতা ও সমাজসেবক হিসেবে চেনেন। তিনি স্যামসন এইচ চৌধুরী– স্কয়ার গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা, বাংলাদেশের শিল্পায়নের ইতিহাসে উজ্জ্বল নাম। জন্মশতবার্ষিকীতে তাঁকে স্মরণ করছে তাঁর প্রিয় পিতৃভূমি পাবনা।

স্যামসন এইচ চৌধুরীর জীবন সৃষ্টি আর অর্জনের গল্প। দেশ বিভাগ-পরবর্তী অনিশ্চিত সময়ে তিনি ওষুধ শিল্পের উদ্যোগ নিলেন। ছোট্ট শুরু; পরবর্তী সময়ে হয়ে উঠল স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালস, যা আজ বাংলাদেশের ওষুধ শিল্পের অন্যতম প্রধান স্তম্ভ। শুধু ওষুধেই থেমে থাকেননি তিনি। আশির দশকের শেষদিকে শুরু করেন নতুন খাতে বিনিয়োগ– স্কয়ার ফুড অ্যান্ড বেভারেজ, স্কয়ার টয়লেট্রিজ, স্কয়ার হারবাল, কেমিক্যাল, কীটনাশক, ফার্মা প্যাকেজেস। এভাবেই গড়ে ওঠে স্কয়ার নামের বড় শিল্প গ্রুপ।
এই শিল্প গ্রুপের সঙ্গে জড়িয়ে আছে পাবনার হাজারো পরিবার। প্রত্যেক মহল্লা, গ্রামের কেউ না কেউ কর্মসংস্থানের সুযোগ পাচ্ছেন স্কয়ারে। এই সামাজিক অন্তর্ভুক্তির কারণে এই উদ্যোগ কেবল ব্যবসা হিসেবে থাকে না, হয়ে ওঠে মানুষের জীবনের অংশ। 

শিক্ষার আলো ছড়ানো
স্যামসন এইচ চৌধুরী বিশ্বাস করতেন, জ্ঞান ছাড়া মানুষের মুক্তি নেই। তাই শুধু প্রতিষ্ঠান নির্মাণ নয়, শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ গড়ে তোলার দায়িত্বও নিলেন নিজের কাঁধে। তিনি গড়ে তোলেন স্কয়ার হাইস্কুল অ্যান্ড কলেজ, স্কয়ার কিন্ডারগার্টেন, বৈকুণ্ঠপুরের এস্ট্রাস পৌর প্রাথমিক বিদ্যালয়সহ বহু প্রতিষ্ঠান।
সমাজসেবায় অনিতা-স্যামসন ফাউন্ডেশন নানামুখী উদ্যোগ রয়েছে এখানে। দরিদ্র শিক্ষার্থীদের প্রযুক্তি প্রশিক্ষণ দিতে দিশারী কম্পিউটার ট্রেনিং সেন্টার। বিনা খরচে প্রতি বছর শতাধিক শিক্ষার্থী এখানে কম্পিউটার প্রশিক্ষণ নেয়। এ পর্যন্ত প্রায় এক হা জার তরুণ-তরুণী দক্ষ হয়ে সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি পেয়েছে। আরও দুই হাজার শিক্ষার্থী ফাউন্ডেশনের বৃত্তি নিয়ে উচ্চ শিক্ষার পথ ধরেছে।

সংস্কৃতি, ক্রীড়া ও সমাজসেবা
স্যামসন এইচ চৌধুরী ছিলেন সংস্কৃতিপ্রেমী। প্রায় দুই কোটি টাকা ব্যয়ে পুনর্নির্মাণ করেন পাবনা টাউন হল, যেখানে গড়ে ওঠে মুক্তিযোদ্ধা রফিকুল ইসলাম বকুল স্বাধীনতা চত্বর। টেনিস ছিল তাঁর প্রিয় খেলা। তাই পাবনা শহীদ আমিন উদ্দিন স্টেডিয়ামে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন স্যামসন এইচ চৌধুরী টেনিস গ্রাউন্ড– যা ক্রীড়াপ্রেমীদের প্রাণকেন্দ্র।
পাবনার গৌরবময় ঐতিহ্য অন্নদা গোবিন্দ পাবলিক লাইব্রেরি যখন ভগ্নদশায়, তখন তিনিই এগিয়ে আসেন। নিজের অর্থায়নে গড়ে তোলেন পাঁচতলা আধুনিক ভবন। আজ সেখানে সংরক্ষিত আছে দুই শতাব্দী আগের তালপাতার পুঁথি, দুর্লভ বই ও সংবাদপত্র। প্রতিদিন শত শত মানুষ সেখানে জ্ঞানের আলো খুঁজে পান। শুধু লাইব্রেরি নয়, তিনি আধুনিকায়ন করেছেন বনমালী শিল্পকলা 
কেন্দ্র, সহায়তা দিয়েছেন চার্চ, প্রেস ক্লাব ও নানা প্রতিষ্ঠান। পাবনা প্রেস ক্লাবের তিনি ছিলেন আজীবন সম্মানিত সদস্য।

দুর্যোগে আশ্রয়দাতা
মানবিকতা ছিল তাঁর চরিত্রের অবিচ্ছেদ্য অংশ। রমজানে তিনি নিশ্চিত করতেন পাবনা সদর হাসপাতালে রোগী ও তাদের স্বজনদের সেহরি। করোনাকালে তিনি প্রায় ৫০ হাজার পরিবারকে খাদ্যসামগ্রী দিয়েছেন। সিডর, আইলা কিংবা যে কোনো দুর্যোগে মানুষের পাশে পৌঁছেছে তাঁর উদ্যোগে স্কয়ারের ত্রাণ।
স্যামসন এইচ চৌধুরী ২০১২ সালে মৃত্যুবরণ  করেন। কিন্তু তিনি যেন এখনও আছেন– পাবনার মানুষের প্রয়োজন মেটাতে।

আরও পড়ুন

×