স্যামসন এইচ চৌধুরী, জন্মশতবর্ষে শ্রদ্ধাঞ্জলি
প্রেরণার আলো হয়ে আছেন তিনি
স্ত্রী ও ছেলেমেয়ের সঙ্গে স্যামসন এইচ চৌধুরী :: পারিবারিক অ্যালবাম থেকে
আনোয়ার ইব্রাহীম
প্রকাশ: ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৫ | ০৭:১৯
সততা, নৈতিকতা, উদ্ভাবন এবং দায়িত্বশীল ব্যবসায় স্যামসন এইচ চৌধুরী বাংলাদেশের ব্যবসা জগতের ইতিহাসে এক উজ্জ্বল নাম। শুধু একজন সফল উদ্যোক্তাই নন; তিনি ছিলেন দৃঢ়চেতা ও দূরদৃষ্টিসম্পন্ন। সততা ও নৈতিকতা ছিল তাঁর জীবনের সফলতার সবচেয়ে বড় পুঁজি। পাবনার গ্রামের বাড়িতে বাবার ফার্মেসিতে বসে নিজের ওষুধ কোম্পানি গড়ার যে স্বপ্ন দেখেছিলেন, সেই স্বপ্ন আজ স্কয়ার নামে মহিরুহ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। বাংলাদেশের মানুষের কাছে স্কয়ার পরম আস্থার এক প্রতীক।
স্কয়ার এখন বহুমুখী ব্যবসা নিয়ে একটি বিস্তৃত গ্রুপের নাম। স্কয়ার হাসপাতাল দেশসেরা হাসপাতালের একটি। কনজুমার পণ্য, টয়লেট্রিজ, বস্ত্র, মিডিয়াসহ নানা ব্যবসায় সফলতার নাম স্কয়ার।
স্কয়ারের শুরুটা ছিল চার বন্ধু মিলে। যার যাত্রা হয় ঢাকা থেকে প্রায় ১২৮ কিলোমিটার দূরে, পাবনা জেলার আতাইকুলা গ্রামে। স্যামসন এইচ চৌধুরী ও তাঁর তিন বন্ধু ডা. কাজী হারুন অর রশীদ, ডা. পি কে সাহা এবং রাধাবিনোদ রায় মিলে ১৯৫৮ সালে ১৭ হাজার রুপি প্রাথমিক পুঁজি নিয়ে স্কয়ার ফার্মা প্রতিষ্ঠা করেন। প্রথম তিন বছর ব্যবসায় মুনাফা হয়নি। পরে পুঁজি আরও বাড়ান। চতুর্থ বছরে গিয়ে মুনাফা পান। এর মধ্যে ডা. পি কে সাহা এবং রাধাবিনোদ রায় ভারতে চলে যান। তাতে পথচলা থেমে থাকেনি স্কয়ারের। ১৯৬২ সালে ব্যবসা সম্প্রসারণে ঢাকার হাটখোলায় শাখা খোলেন স্যামসন চৌধুরী।
স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালস এখন প্রায় ৭০ হাজার শেয়ারহোল্ডারের কোম্পানি, যার সম্পদমূল্য সাড়ে ১৩ হাজার কোটি টাকা। এখন দেশের শেয়ারবাজারে সবচেয়ে নামকরা কোম্পানি, যার বাজারমূল্য ১৯ হাজার ৩৩৭ কোটি টাকা। গত বছর মুনাফা করে নিট ২ হাজার ৯৩ কোটি টাকা। শুধু সাধারণ শেয়ারহোল্ডারদের নগদে ৫৫০ কোটি টাকা লভ্যাংশ দিয়েছে স্কয়ার ফার্মা।
জীবনের পথ পাল্টে যায় যেভাবে
বৈচিত্র্যময়, বর্ণাঢ্য জীবন স্যামসন এইচ চৌধুরীর। ডাক্তার বাবা ইয়াকুব হোসেন চৌধুরী ও মা লতিকা চৌধুরীর ঘরে তাঁর জন্ম একশ বছর আগে, ১৯২৫ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর। সরকারি চাকরিতে বাবার পোস্টিং ছিল গোপালগঞ্জের আড়ুয়াকান্দিতে। শিক্ষাজীবনে নানা স্কুলে পড়েছেন তিনি। মাঝে লন্ডনেও যান। পড়াশোনার জন্য বাবা তাঁকে কলকাতায়ও পাঠিয়েছিলেন। তবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হলে ফিরে আসেন পাবনায় নিজ গ্রামে। সেখানেই ১৯৪৩ সালে ম্যাট্রিকুলেশন পাস করেন।
ওই বছরই বাড়ির কাউকে কিছু না বলে কয়েক বন্ধু মিলে প্রথমে কলকাতা, পরে বোম্বের (বর্তমানে মুম্বাই) পথ ধরেন স্যামসন এইচ চৌধুরী। বয়স মাত্র ১৮ বছর। সেখানে যোগ দেন রয়্যাল ইন্ডিয়ান নেভিতে। চেয়েছিলেন নেভির রাডার বিভাগে কাজ করতে। কিন্তু কর্তৃপক্ষ নিয়োগ দেয় সিগন্যাল বিভাগে। আদেশ উপেক্ষা করায় ঊর্ধ্বতনরা তাঁকে চার দিন আটকে রাখেন। সুশৃঙ্খল বাহিনীতে কর্তৃপক্ষের আদেশ উপেক্ষা করাই অপরাধ। তবে তিনি অনড় থাকেন নিজ সিদ্ধান্তে। নেভিতে যদি থাকতেই হয়, রাডার বিভাগে কাজ করবেন তিনি। শেষ পর্যন্ত তাঁকে রাডার বিভাগেই পোস্টিং দেওয়া হয়। তিন বছর চাকরির পর ১৯৪৬ সালে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসকদের বিরূদ্ধে নেভির বিদ্রোহে যোগ দেন। বলা যায়, এই বিদ্রোহে যোগদানই তাঁর জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়।
তখন তাঁর পোস্টিং ছিল মাদ্রাজে। নেভির বিদ্রোহে যোগ দেওয়ায় গ্রেপ্তার হয়ে পাঁচ দিন জেলে কাটান। জেল থেকে ছাড়িয়ে এক মাসের জন্য কনসেনট্রেশন ক্যাম্পে পাঠানো হয় তাঁকে। এর পর মুক্তি দেওয়া হয় এবং নেভি থেকে অব্যাহতির সার্টিফিকেট দিয়ে যে কোনো প্রশাসনিক পদে অথবা আইনশৃঙ্খলা সংস্থায় সরকারি চাকরির জন্য সুপারিশ করা হয়। পরের বছর সরকারি কর্মচারী হিসেবে ডাক বিভাগে যোগ দেন। ২২ বছরের যুবক স্যামসন ওই বছরেই পারিবারিকভাবে অনিতা বিশ্বাসকে বিয়ে করেন।
পাঁচ বছর পর ১৯৫২ সালে ডাকঘরের চাকরি ছেড়ে বাড়ি ফিরে আসেন স্যামসন চৌধুরী। বাবার পরামর্শে নিজেদের ওষুধের দোকান ‘হোসেন ফার্মেসি’ চালাতে শুরু করেন। চিন্তা করলেন– শুধু অন্য কোম্পানির ওষুধ কেন বিক্রি করবেন। ভাবলেন, নিজের কোম্পানির ওষুধ বিক্রি করবেন। এ ভাবনা থেকে স্ত্রী অনিতা চৌধুরীকে নিয়ে বাসাতে নিজেরাই একটি সিরাপ তৈরি করেন। কীসের সিরাপ ছিল, তা এখন আর জানা যায় না। তবে তাঁর ছেলে (স্কয়ার ফার্মার ব্যবস্থাপনা পরিচালক) তপন চৌধুরী জানান, সেই ওষুধটি ‘এস্টন সিরাপ’ জাতীয় কিছু একটা ছিল।
ওষুধ কোম্পানি গড়ার স্বপ্নে ১৯৫৬ সালে বাবার অনুপ্রেরণায় ‘ইসন্স’ নামে একটি ছোট ওষুধ কোম্পানি খোলেন। ‘ইসন্স’ বলতে ইয়াকুব এবং তাঁর ছেলেদের বোঝানো হয়েছে। কোম্পানি আরও বড় করতে তিন বন্ধুকে সঙ্গে নিয়ে ১৯৫৮ সালে প্রতিষ্ঠা করেন ‘স্কয়ার ফার্মা’।
বিস্তারের গল্প
ছোট ওষুধ কোম্পানি থেকে শুরু করে স্যামসন এইচ চৌধুরী ধীরে ধীরে স্কয়ারকে গড়ে তুলেছেন বিশাল শিল্পগোষ্ঠী হিসেবে। বাবার সফলতার গল্প শোনাতে গিয়ে ছেলে তপন চৌধুরী বলেন, পঞ্চাশের দশকে বাংলাদেশের গ্রামীণ পরিবেশে ব্যবসা শুরু করা সহজ ছিল না। সীমিত মূলধন ও সীমাহীন চ্যালেঞ্জের মধ্যেও তাঁর বাবা স্বপ্ন দেখেছিলেন বিশ্বমানের ওষুধ তৈরির। বন্ধুদের সঙ্গে নিয়ে স্কয়ার নামে যে কোম্পানি গড়েছিলেন, তা শুধু চার প্রতিষ্ঠাতার সংখ্যা বোঝায়নি। বরং মান, শুদ্ধতা ও পূর্ণতার প্রতীক করে তুলেছেন।
তপন চৌধুরী জানান, ১৯৭৪ সালে মার্কিন কোম্পানি জনসন অ্যান্ড জনসন ইন্টারন্যাশনালের সহযোগী প্রতিষ্ঠান বেলজিয়ামের জ্যানসেন ফার্মাসিউটিকার সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হয়ে আন্তর্জাতিক মানের ওষুধ তৈরি শুরু করে স্কয়ার। ১০ বছরের মধ্যে ১৯৮৫ সালে স্কয়ার দেশের সমস্ত জাতীয় এবং বহুজাতিক ওষুধ কোম্পানির মধ্যে সবার থেকে এগিয়ে যায়। বাজারের এক নম্বর কোম্পানি হয়ে ওঠে। ১৯৮৭ সালে স্কয়ার প্রথম বাংলাদেশি কোম্পানি হিসেবে ওষুধ রপ্তানি করে।
তপন চৌধুরী বলেন, এটি সম্ভব হয়েছিল তাঁর বাবার সততা ও স্বচ্ছ ব্যবসায়িক নীতির কারণে। তিনি প্রচুর পড়তেন। উদ্ভাবন ও নতুন কিছুর চিন্তা তাঁর সব সময় ছিল। পণ্যের মানে কোনো অবস্থাতেই তিনি আপস করতেন না। এটিই ক্রেতাদের আস্থা অর্জনে সবচেয়ে বেশি সহায়তা করেছে স্কয়ারকে।
নীতি ও দর্শন
স্যামসন এইচ চৌধুরীর ব্যবসায়িক দর্শনের কেন্দ্রে ছিল– গুণমানের সঙ্গে কোনো আপস নয়। কর্মীদের প্রতি দায়বদ্ধতা ও সমাজের প্রতি দায়িত্ববোধকে তিনি সবসময় অগ্রাধিকার দিয়েছেন। অংশীদার সকলকে পরিবার সদস্য করে নেন। ১৯৯১ সালে যখন কোম্পানিকে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত করার পরিকল্পনা জানান, তখন ঘোষণা দেন, যারা স্কয়ারের শেয়ার কিনবেন তারা টেক্সটাইলেরও শেয়ার পাবেন। বাদ সাধল সরকার। তিনি হাইকোর্টে মামলায় জিতে শেয়ারহোল্ডারদের সেই শেয়ার দেন।
তপন চৌধুরী বলেন, সততা ও নীতির মূল্য ছিল তাঁর বাবার কাছে সবচেয়ে বেশি মূল্যবান। এগুলো কোনো সম্পদ বা অর্থ– কোনো কিছুর কাছেই বিকোতেন না। তাঁর দৃঢ়তা, স্বপ্ন, নৈতিকতা– এগুলো এক দিনে হয়নি।
স্বীকৃতি
সফল শিল্পপতি স্যামসন এইচ চৌধুরী নানা পুরস্কারে ভূষিত হন। ২০১০ সালে তিনি বাংলাদেশ সরকারের সেরা শিল্প উদ্যোক্তা পুরস্কার পান। মৃত্যুর পরের বছর ২০১৩ সালে রাষ্ট্রীয় সম্মাননা ‘একুশে পদক’ পান। তবে এসব ছাপিয়ে তাঁর সবচেয়ে বড় পুরস্কার মানুষের ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা; বললেন তপন চৌধুরী। যখনই সুযোগ পেতেন, মানুষকে সাহায্য করতেন, যা কেউ জানত না। কারণ তিনি জানাতেন না। তিনি স্কুল-কলেজ করেছেন কোম্পানির টাকায় নয়, নিজের টাকায়। স্কয়ার হাসপাতালে মালিকদেরও পুরো টাকা দিয়ে চিকিৎসা নিতে হয়। তবে গ্রুপের কর্মীদের দিতে হয় ৫০ শতাংশ। বাকি ৫০ শতাংশ সংশ্লিষ্ট কোম্পানি দেয়।
পরিবার ও উত্তরাধিকার
স্যামসন চৌধুরীর প্রয়াণের পর সন্তানদের নিয়ে স্ত্রী অনিতা চৌধুরী হাল ধরেন। পুরো পরিবারই স্কয়ার গ্রুপের দায়িত্ব কাঁধে তুলে নেয়। বড় ছেলে স্যামুয়েল এস. চৌধুরী বর্তমানে স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালসের চেয়ারম্যান, মেয়ে রত্না পাত্র ভাইস চেয়ারম্যান। ছেলে তপন চৌধুরী ব্যবস্থাপনা পরিচালক। পরিচালক হিসেবে আছেন অঞ্জন চৌধুরী। পরিবারের সম্মিলিত প্রচেষ্টা ও দীর্ঘ দিনের ব্যবস্থাপনা কাঠামোর কারণে আজও স্কয়ার গ্রুপ সাফল্যের ধারাবাহিকতা বজায় রেখেছে। পাশে আছে স্যামসন এইচ চৌধুরীর বন্ধু ও পার্টনার ডা. হারুন অর রশীদের ছেলে কাজী ইকবাল হারুন।
তপন চৌধুরী বলেন, ‘মা ছিলেন আমাদের পরিবারের সব। সবাইকে আগলে রাখতেন। মাকে বাবা অসম্ভব বেশি ভালোবাসতেন। বাবা যখন মৃত্যুশয্যায় আইসিইউতে, মাকে পাশে থাকতে বললেন।’ এক কথায়, বাবা স্যামসন এইচ চৌধুরীকে কী বলবেন– প্রশ্ন শুনে গলা ধরে আসে তপন চৌধুরীর। বললেন, ‘যখন বাবার কথা মনে পড়ে, মনে হয়, তিনিই ছিলেন আমার সবচেয়ে কাছের মানুষ। অ্যা কমপ্লিট ম্যান, গাইড অ্যান্ড ফিলোসফার।’
তপন চৌধুরী বলেন, ‘বাবার গাইড্যান্স মিস করি এই বয়সে এসেও। তিনি সোজা রাস্তায় চলার কথা বলতেন। প্রথমে মনে হতো, পুরোনো জমানার মানুষের নীতি-নৈতিকতার কথা, দার্শনিক কথাবার্তা একালে চলে না। পরে বুঝেছি, জীবনে প্রতিষ্ঠিত হতে গেলে এই মৌলিক গুণগুলো না থাকলে আর্থিকভাবে হয়তো বড় কিছু হওয়া যাবে, তবে সবার সম্মান, ভালোবাসা ও আস্থার প্রতীক হয়ে ওঠা হবে না। বাবা চ্যালেঞ্জকে জীবনের অংশ হিসেবে মনে করতেন। সোজা পথে চলেও যে সাফল্য পাওয়া যায়– তাঁর কাছ থেকে শিখেছি।’
শতবর্ষে স্মরণ
২০১২ সালের জানুয়ারিতে স্যামসন এইচ চৌধুরী পৃথিবী ছেড়ে চলে গেলেও তাঁর জীবনদর্শন এখনও প্রাসঙ্গিক। সততা, গুণমান আর সাহসী উদ্যোগ– এই তিন মূল্যবোধকে ধারণ করেই স্কয়ার এগিয়ে চলেছে। জন্মশতবর্ষে তাঁকে স্মরণ করা মানে কেবল একজন উদ্যোক্তাকে শ্রদ্ধা জানানো নয়, বরং বাংলাদেশের শিল্প ও অর্থনীতির ইতিহাসে এক অনন্ত প্রেরণাকে নতুনভাবে উপলব্ধি করা।
- বিষয় :
- স্যামসন এইচ চৌধুরী
