মুহূর্তের মধ্যে পুরো এলাকা ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়
×
বিজয় দাস
প্রকাশ: ১৫ ডিসেম্বর ২০১৯ | ১২:০০
'তোরা আমারে লইয়া যা, ওরা আমারে মাইরা ফালাইবো। আগুন ধরাইয়া দিবো। আমারে একলা বাড়িতে রাইখ্যা যাইস না।' আশি ছুঁই ছুঁই আমার ঠাকুরমা জয়ধ্বনি রানী দাস বারান্দার খুঁটি ধরে অস্পষ্ট কণ্ঠে এভাবেই তাকে নিয়ে যাওয়ার জন্য আকুতি করছিলেন। কিন্তু ঠাকুরমাকে সঙ্গে নিয়ে যেতে পারিনি। মা ও বাবাকে নিয়ে পালিয়ে বাঁচলেও নরপশুদের ছোড়া গুলিতে ঠাকুরমার দেহ ঝাঁজরা হয়ে যায়।
১৯৭১ সাল। ১৪ মে। শুক্রবার। নির্দিষ্ট রণাঙ্গন বলতে কিছু নেই। সারাদেশেই যুদ্ধ চলছে। বাঙালিদের ওপর পাকিস্তানিরা নির্বিচারে নির্যাতন চালাচ্ছে। পাখির মতো গুলি করে মানুষ হত্যা করছে। থেমে নেই বাঙালিরাও। শত্রুপক্ষের সঙ্গে লড়ে চলছেন বীরযোদ্ধারা। সেদিন জুমার নামাজের আজান হয়ে গেছে মসজিদে। গাজীপুরের বেলাই বিলের দক্ষিণ-পশ্চিম পাড়ের গ্রাম বাড়িয়া। হিন্দু অধ্যুষিত এলাকা। মুসলিম পরিবারের কর্তাদের কেউ কেউ দূরের মসজিদে জুমার নামাজ আদায় করতে গেছেন। দুপুর ১টার ঠিক আগ মুহূর্তে বাড়িয়া গ্রামে প্রবেশ করে অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর দুই শতাধিক সদস্য। কয়েকটি ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়ে তারা। আচমকা শুরু হয় গুলি আর ব্রাশফায়ার। চারদিকে গুলির শব্দ। ভয়ে কাঁপতে থাকে মানুষগুলো। চলতে থাকে হত্যা না করার গগণবিদারী আর্তনাদ। গুলি আর ব্রাশফায়ারের শব্দ শুনে বৃদ্ধ, নারী-পুরুষ আর শিশুরা আত্মরক্ষার জন্য পালিয়ে যেতে থাকেন বেলাই বিলের পাড়ের জয়রাম বেড়, বড় কয়ের, বক্তারপুরসহ বিভিন্ন গ্রামে। অসংখ্য মানুষ সাঁতরে ও নৌকায় চড়ে বিল পাড়ি দিতে পারলেও হতভাগ্য অন্তত ২০০ মানুষ আর আত্মরক্ষা করতে পারেননি। এ সময় বিভিন্ন এলাকা থেকে এসে এ গ্রামে আশ্রয় নেওয়া আরও ৫২ জনকে খুঁজে পাওয়া যায়নি। হত্যা করা হয় বহিরাগত এই মানুষজনকেও। প্রত্যেকটি বাড়ি জ্বালিয়ে দেওয়া হয়। লুটপাট করে স্থানীয় রাজাকাররা। গণহত্যার এই মিশন চলে চার থেকে পাঁচ ঘণ্টা। মুহূর্তের মধ্যে পুরো বাড়িয়া ধ্বংসরূপে পরিণত হয়। সারি সারি লাশ পড়ে থাকে বেলাইয়ের তীরে। আমি তখন দশম শ্রেণির ছাত্র। ওই পরিস্থিতিতে মানুষ বাঁচার জন্য দিজ্ঞ্বিদিক ছোটাছুটি করতে শুরু করে। মা আর বাবাকে সঙ্গে নিয়ে আমিও পালিয়ে যাই। কিন্তু ঠাকুরমা নিয়ে যেতে পারিনি। ঠাকুরমাকে যদি সঙ্গে করে নিয়ে বের হতাম তাহলে বাড়িয়ার সেই গণহত্যায় গুলিবিদ্ধ হয়ে প্রাণ হারাতে হতো আমাদেরও। হয়তো একসঙ্গেই পাকা ধানক্ষেতের মাঝখানে পড়ে থাকত আমাদের লাশও।
সেদিন বাড়িয়া এলাকার সেই নারকীয়তায় আমার ঠাকুরমা জয়ধ্বনি রানী দাসকে গুলি করে পাকিস্তানিরা। ক্ষতবিক্ষত এই ঠাকুরমার প্রাণহীন দেহ পড়ে থাকে পাকা ধানক্ষেতের মাঝখানে। বার্ধক্যের কাছে অসহায় ঠাকুরমা সেদিন পালিয়ে যেতে পারেননি। চেষ্টা করেছিলেন বেলাই বিল পার হয়ে জয়রামবেড় গ্রামে পালিয়ে যেতে। কিন্তু অক্ষম বাসনার কাছে হেরে যান তিনি। মৃত্যুকেই আলিঙ্গন করতে হয় ঠাকুরমাকে। আমরা চলে যাওয়ার পর ঠাকুরমা লাঠি ভর করে পাকা ধানক্ষেতের মাঝখান দিয়ে একাই বিলের কাছাকাছি চলে যান। ততক্ষণে আমরা বেলাইয়ের জলে সাঁতার শুরু করেছি। এ সময় পাকিস্তানি সেনাদের একটি দল ধানক্ষেতের আইল দিয়ে বিলের পাড়ের দিকে যাচ্ছিল। বিল সাঁতরে পার হওয়ার সময় সতর্ক চোখে এদিক-ওদিক তাকাচ্ছিলেন আমি। পেছন ফিরে দেখি ধানক্ষেতের মাঝখানে পাকিস্তানিদের জটলা। গুলি ছোড়ছে একের পর এক। ঠাকুরমাকে লক্ষ্য করে পাকিস্তানিরা কয়েকটি গুলি করে ফেলেছে এরই মধ্যে। পুরো দেহ ঝাঁজরা হয়ে গেছে ঠাকুরমার। ধানক্ষেতেই পড়ে থাকে তার মরদেহ। আমরা এই ফাঁকে চলে যাই জয়রামবেড় গ্রামে। সপ্তাহখানেক পর গ্রামে ফিরে আসি আমরা। বাড়িয়ার বাতাসে তখনও শুধুই লাশের গন্ধ। বেলাই বিলের সেই ধানক্ষেতের মাঝখানে গিয়ে দেখি, ঠাকুরমার দেহ শিয়ালে খেয়ে ফেলেছে। হাড়গুলো পড়ে আছে। হাড়গুলোর মধ্যে অসংখ্য পিঁপড়া।
স্থানীয় ও আশ্রয় নেওয়া নারী-পুরুষ মিলিয়ে ২০০-এর অধিক মানুষকে হত্যা করে তারা। স্থানীয়দের অধিকাংশই হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষ। তাদের মূল টার্গেটই ছিল বেছে বেছে হিন্দুদের হত্যা করা। গণহত্যায় শহীদ হওয়ার তালিকায় বাড়িয়ার শীলপাড়া ও হাটিপাড়ায় ৪৮ জন ও বিরলপাড়ায় আটজন রয়েছেন। এ ছাড়া বাড়িয়া দক্ষিণপাড়া, উত্তরপাড়া ও ঠাকুরপাড়ায় আশ্রয় নেওয়াসহ স্থানীয়দের হত্যা করা হয়। শীলপাড়ায় একটি পরিবারেরই ছয়জনকে হত্যা করে পাকিস্তানিরা। মাত্র ৫ ঘণ্টার মিশনে বাড়িয়া এলাকা ভগ্নস্তূপে পরিণত করা হয়। সপ্তাহখানেক পর লোকজন এলাকায় ফিরে এসে দেখেন, লাশগুলো শিয়াল-কুকুরে খেয়ে ফেলেছে। বাড়িয়ায় ঘটে যাওয়ায় এই নির্মমতা দেখে আর ঘরে বসে থাকতে পারলাম না। চলে গেলাম যুদ্ধের ময়দানে। হ
অনুলিখন :
ইজাজ আহ্মেদ মিলন, গাজীপুর প্রতিনিধি
লেখক
মুক্তিযোদ্ধা
১৯৭১ সাল। ১৪ মে। শুক্রবার। নির্দিষ্ট রণাঙ্গন বলতে কিছু নেই। সারাদেশেই যুদ্ধ চলছে। বাঙালিদের ওপর পাকিস্তানিরা নির্বিচারে নির্যাতন চালাচ্ছে। পাখির মতো গুলি করে মানুষ হত্যা করছে। থেমে নেই বাঙালিরাও। শত্রুপক্ষের সঙ্গে লড়ে চলছেন বীরযোদ্ধারা। সেদিন জুমার নামাজের আজান হয়ে গেছে মসজিদে। গাজীপুরের বেলাই বিলের দক্ষিণ-পশ্চিম পাড়ের গ্রাম বাড়িয়া। হিন্দু অধ্যুষিত এলাকা। মুসলিম পরিবারের কর্তাদের কেউ কেউ দূরের মসজিদে জুমার নামাজ আদায় করতে গেছেন। দুপুর ১টার ঠিক আগ মুহূর্তে বাড়িয়া গ্রামে প্রবেশ করে অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর দুই শতাধিক সদস্য। কয়েকটি ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়ে তারা। আচমকা শুরু হয় গুলি আর ব্রাশফায়ার। চারদিকে গুলির শব্দ। ভয়ে কাঁপতে থাকে মানুষগুলো। চলতে থাকে হত্যা না করার গগণবিদারী আর্তনাদ। গুলি আর ব্রাশফায়ারের শব্দ শুনে বৃদ্ধ, নারী-পুরুষ আর শিশুরা আত্মরক্ষার জন্য পালিয়ে যেতে থাকেন বেলাই বিলের পাড়ের জয়রাম বেড়, বড় কয়ের, বক্তারপুরসহ বিভিন্ন গ্রামে। অসংখ্য মানুষ সাঁতরে ও নৌকায় চড়ে বিল পাড়ি দিতে পারলেও হতভাগ্য অন্তত ২০০ মানুষ আর আত্মরক্ষা করতে পারেননি। এ সময় বিভিন্ন এলাকা থেকে এসে এ গ্রামে আশ্রয় নেওয়া আরও ৫২ জনকে খুঁজে পাওয়া যায়নি। হত্যা করা হয় বহিরাগত এই মানুষজনকেও। প্রত্যেকটি বাড়ি জ্বালিয়ে দেওয়া হয়। লুটপাট করে স্থানীয় রাজাকাররা। গণহত্যার এই মিশন চলে চার থেকে পাঁচ ঘণ্টা। মুহূর্তের মধ্যে পুরো বাড়িয়া ধ্বংসরূপে পরিণত হয়। সারি সারি লাশ পড়ে থাকে বেলাইয়ের তীরে। আমি তখন দশম শ্রেণির ছাত্র। ওই পরিস্থিতিতে মানুষ বাঁচার জন্য দিজ্ঞ্বিদিক ছোটাছুটি করতে শুরু করে। মা আর বাবাকে সঙ্গে নিয়ে আমিও পালিয়ে যাই। কিন্তু ঠাকুরমা নিয়ে যেতে পারিনি। ঠাকুরমাকে যদি সঙ্গে করে নিয়ে বের হতাম তাহলে বাড়িয়ার সেই গণহত্যায় গুলিবিদ্ধ হয়ে প্রাণ হারাতে হতো আমাদেরও। হয়তো একসঙ্গেই পাকা ধানক্ষেতের মাঝখানে পড়ে থাকত আমাদের লাশও।
সেদিন বাড়িয়া এলাকার সেই নারকীয়তায় আমার ঠাকুরমা জয়ধ্বনি রানী দাসকে গুলি করে পাকিস্তানিরা। ক্ষতবিক্ষত এই ঠাকুরমার প্রাণহীন দেহ পড়ে থাকে পাকা ধানক্ষেতের মাঝখানে। বার্ধক্যের কাছে অসহায় ঠাকুরমা সেদিন পালিয়ে যেতে পারেননি। চেষ্টা করেছিলেন বেলাই বিল পার হয়ে জয়রামবেড় গ্রামে পালিয়ে যেতে। কিন্তু অক্ষম বাসনার কাছে হেরে যান তিনি। মৃত্যুকেই আলিঙ্গন করতে হয় ঠাকুরমাকে। আমরা চলে যাওয়ার পর ঠাকুরমা লাঠি ভর করে পাকা ধানক্ষেতের মাঝখান দিয়ে একাই বিলের কাছাকাছি চলে যান। ততক্ষণে আমরা বেলাইয়ের জলে সাঁতার শুরু করেছি। এ সময় পাকিস্তানি সেনাদের একটি দল ধানক্ষেতের আইল দিয়ে বিলের পাড়ের দিকে যাচ্ছিল। বিল সাঁতরে পার হওয়ার সময় সতর্ক চোখে এদিক-ওদিক তাকাচ্ছিলেন আমি। পেছন ফিরে দেখি ধানক্ষেতের মাঝখানে পাকিস্তানিদের জটলা। গুলি ছোড়ছে একের পর এক। ঠাকুরমাকে লক্ষ্য করে পাকিস্তানিরা কয়েকটি গুলি করে ফেলেছে এরই মধ্যে। পুরো দেহ ঝাঁজরা হয়ে গেছে ঠাকুরমার। ধানক্ষেতেই পড়ে থাকে তার মরদেহ। আমরা এই ফাঁকে চলে যাই জয়রামবেড় গ্রামে। সপ্তাহখানেক পর গ্রামে ফিরে আসি আমরা। বাড়িয়ার বাতাসে তখনও শুধুই লাশের গন্ধ। বেলাই বিলের সেই ধানক্ষেতের মাঝখানে গিয়ে দেখি, ঠাকুরমার দেহ শিয়ালে খেয়ে ফেলেছে। হাড়গুলো পড়ে আছে। হাড়গুলোর মধ্যে অসংখ্য পিঁপড়া।
স্থানীয় ও আশ্রয় নেওয়া নারী-পুরুষ মিলিয়ে ২০০-এর অধিক মানুষকে হত্যা করে তারা। স্থানীয়দের অধিকাংশই হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষ। তাদের মূল টার্গেটই ছিল বেছে বেছে হিন্দুদের হত্যা করা। গণহত্যায় শহীদ হওয়ার তালিকায় বাড়িয়ার শীলপাড়া ও হাটিপাড়ায় ৪৮ জন ও বিরলপাড়ায় আটজন রয়েছেন। এ ছাড়া বাড়িয়া দক্ষিণপাড়া, উত্তরপাড়া ও ঠাকুরপাড়ায় আশ্রয় নেওয়াসহ স্থানীয়দের হত্যা করা হয়। শীলপাড়ায় একটি পরিবারেরই ছয়জনকে হত্যা করে পাকিস্তানিরা। মাত্র ৫ ঘণ্টার মিশনে বাড়িয়া এলাকা ভগ্নস্তূপে পরিণত করা হয়। সপ্তাহখানেক পর লোকজন এলাকায় ফিরে এসে দেখেন, লাশগুলো শিয়াল-কুকুরে খেয়ে ফেলেছে। বাড়িয়ায় ঘটে যাওয়ায় এই নির্মমতা দেখে আর ঘরে বসে থাকতে পারলাম না। চলে গেলাম যুদ্ধের ময়দানে। হ
অনুলিখন :
ইজাজ আহ্মেদ মিলন, গাজীপুর প্রতিনিধি
লেখক
মুক্তিযোদ্ধা
