শান্তিকার্ড দেওয়ার আশ্বাসে বালাগঞ্জে নির্মম গণহত্যা
×
আফতাব আহমদ
প্রকাশ: ১৫ ডিসেম্বর ২০১৯ | ১২:০০
সিলেটের বিভিন্ন এলাকায় যখন যুদ্ধ করছি, তখন বালাগঞ্জ উপজেলায় আমাদের গ্রামের বাড়ি ও আশপাশে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী তাদের দোসরদের সহযোগিতায় ব্যাপক তাণ্ডব চালায়। যুদ্ধের সময় কিছু শুনলেও চোখে দেখতে পারিনি। ১৬ ডিসেম্বর চূড়ান্ত বিজয়ের পর এলাকায় এসে আদিত্যপুর, সুরীকোনা, বুরুঙ্গা, ভাটেরা গালিমপুরে পাকিস্তানি সেনার হাতে নির্মম হত্যাকাণ্ডের চিহ্ন দেখতে পাই। সেই সময় বুরুঙ্গা ও সুরীকোনা বৃহত্তর বালাগঞ্জ উপজেলার অধীন হলেও এখন এই দুটি জায়গা ওসমানীনগর উপজেলায় পড়েছে। ২৫ মে বিকেলে পাকিস্তানি বাহিনী বুরুঙ্গা ইউনিয়ন কার্যালয়ে আসে। এতে পুরো এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছিল। সেই সময় ইউপি চেয়ারম্যান ইনজদ আলী স্থানীয় বাজারে সবাইকে জানান, পাকিস্তানিরা খারাপ উদ্দেশ্যে আসেনি। পাকিস্তানি বাহিনীর সঙ্গে দীর্ঘক্ষণ বৈঠক শেষে চেয়ারম্যান পরদিন সকালে বুরুঙ্গা উচ্চ বিদ্যালয়ে শান্তি কমিটি গঠন হবে জানিয়ে দেন।
প্রত্যেক গ্রামের সবাইকে বাধ্যতামূলক আসার কথা জানিয়ে বলা হয়, শান্তি কার্ডধারীদের (ড্যান্ডি কার্ড) নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে পাকিস্তান সরকার। সেই নির্দেশে ২৬ মে সকাল ৮টায় বুরুঙ্গা স্কুল মাঠে কয়েকশ' মানুষ সমবেত হন। সকাল ১০টায় পাকিস্তানি বাহিনী সভার কথা বলে স্কুল মাঠে সমবেতদের মধ্য থেকে হিন্দু-মুসলিমদের আলাদা করে। তারপর হিন্দুদের বিদ্যালয়ের অফিস কক্ষে ও মুসলিমদের দক্ষিণ দিকের একটি ক্লাস রুমে ঢুকিয়ে দেয়। কলেমা পড়তে বলে ১০-১২ জন মুসলিমকে রেখে বাকিদের ছেড়ে দেওয়া হয়। তারপর পাকিস্তানি বাহিনী বন্দি থাকা মুসলিমদের নির্দেশ করে- চারজন করে হিন্দুকে একসঙ্গে বাঁধার। তখন সাবেক চেয়ারম্যান বাদশা মিয়া 'এটা ইসলামের বিধান না' বললে তাকে ধমক দিয়ে থামিয়ে দেওয়া হয়। সেদিন সিলেট জজ কোর্টের প্রভাবশালী উকিল রাম রঞ্জন ভট্টাচার্যকে একটি চেয়ারে বসিয়ে রাখা হলেও একপর্যায়ে তাকে ছেড়ে দেওয়ার কথা বলে গুলি করে হত্যা করা হয়। এদিকে রশি দিয়ে বাঁধার মুহূর্তে কৌশলে ভবনের জানালা খুলে প্রীতি রঞ্জন চৌধুরী ও রানু মালাকার জানালা দিয়ে পালিয়ে যান। সেদিন রাম রঞ্জনসহ স্কুল মাঠে ৭১ জনকে গুলি করে হত্যা করে পাকিস্তানিরা।
আদিত্যপুরেও শান্তি কমিটি গঠনের কথা বলে নির্মম হত্যাযজ্ঞ চালায় পাকিস্তানি সেনারা। ১৪ জুন ভোরে একসঙ্গে তিনটি পাকিস্তানি সাঁজোয়া যান প্রবেশ করে আদিত্যপুরে। রিফাতপুর, আদিত্যপুর, সত্যপুর, নারায়ণপুর গ্রামে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। কয়েকজন রাজাকার দু'জন পাকিস্তানি সেনাসহ প্রতিটা ঘরে গিয়ে পুরুষদের খুঁজতে থাকে। আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখতে সবাইকে আদিত্যপুর প্রাথমিক বিদ্যালয়ে আসতে বলা হয়।
স্বাভাবিকভাবে তাদের কথায় আস্থা রাখতে পারেনি সাধারণ মানুষ। মহিলা ও শিশু-কিশোররা আশ্রয় নেয় গ্রামের পেছনের হাওরে। প্রায় ৫ ঘণ্টা রিফাতপুর, আদিত্যপুর, সত্যপুর, নারায়ণপুর গ্রাম তছনছ করে ৬৫ জন পুরুষকে ধরে আনার পর ব্রাশফায়ার করে পাকিস্তানি সেনারা। এদের মধ্যে ৬৩ জন শহীদ হলেও শরীরে গুলি নিয়ে ভাগ্যক্রমে বেঁচে যান শিব প্রসাদ সেন ও সুখময় বাবু।
আমাদের বালাগঞ্জে সর্বপ্রথম গণহত্যার ঘটনা ঘটেছিল ভাটেরা গালিমপুরে। ১৫ মে ধান কাটাকে কেন্দ্র করে পূর্ব পৈলনপুরের ভাটেরা গালিমপুর ও পার্শ্ববর্তী পশ্চিম পৈলনপুর ইউনিয়নের বল্লভপুর গ্রামের কয়েক যুবকের মধ্যে ঝগড়া হয়। এই ঝগড়ার বিষয়টা শান্তি বাহিনীর লোকজন পার্শ্ববর্তী সাদিপুর ও শেরপুরে অবস্থানরত পাকিস্তানি সেনাদের অবগত করে। শেরপুর ক্যাম্পের পাকিস্তানি ক্যাপ্টেন নিজে বিষয়টি খতিয়ে দেখতে বল্লভপুর ও ভাটেরা-গালিমপুরে আসার খবর ছড়িয়ে পড়ে।
সেই সময় ক্যাপ্টেনের আসা ঠেকাতে গ্রামবাসী চাঁদা তুলে কিছু টাকাও দেন। এরপরও ২০ মে বেলা ১১টার দিকে একটি বড় নৌকা নিয়ে সাদিপুর ক্যাম্পে অবস্থানরত ১২ জন পাকিস্তানি সেনা ভাটেরা গালিমপুরে প্রবেশ করে। এতে ভাটেরা গালিমপুরের তিন শতাধিক হিন্দু পরিবারে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। এ সময় কয়েকজন হিন্দু শান্তি কার্ড দেখালেও পাকিস্তানিরা ব্রাশফায়ার করে পাঁচজনকে খুন করে। সেদিন তারা গ্রামে অভিযান চালিয়ে ২৭ জনকে হত্যা করে।
পাকিস্তানি বাহিনী চলে যাওয়ার পর শোকে হতবিহ্বল গ্রামবাসী প্রথমে নিহত প্রথম পাঁচজনকে সেখানেই মাটি চাপা দেয়। অন্য শহীদ অনেকের লাশ কাপড় জড়িয়ে কুশিয়ারা নদীতে ভাসিয়ে দেওয়া হয়; কয়েকজনকে মাটি চাপা দেওয়া হয়। এ ছাড়া তিনদিকে নদীবেষ্টিত বালাগঞ্জের সাদিপুর ইউনিয়নের অন্তর্গত প্রত্যন্ত অঞ্চল সুরীকোনায় গণহত্যা চালায় পাকিস্তানি বাহিনী।
১৯ জুলাই রাত সাড়ে ৩টার দিকে দুটো লঞ্চযোগে শতাধিক পাকিস্তানি সেনা রাজাকারদের সহযোগিতায় সুরীকোনা গ্রাম ঘেরাও করে। ভোরের আজানের সঙ্গে সঙ্গে গ্রামের প্রায় ৩৫ জন ও অন্যান্য এলাকা থেকে ধরে আনা সবাইকে নদীর তীরে দাঁড় করানো হয়। এরপর নির্বিচারে গুলি ছুড়তে থাকে পাকিস্তানিরা। গুলিবিদ্ধ অবস্থাতেই প্রাণ বাঁচাতে অনেকে নাটকিলা ও কুশিয়ারা নদীতে ঝাঁপিয়ে পড়েন।
২১ জুলাই যুদ্ধের ময়দানে ৪ নম্বর সেক্টরের অধীনে ধলই বিওপি মুক্তিবাহিনী আক্রমণ করে সরাসরি চার্জে যায়। ১৭ জন মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হন, গুরুতর আহত হন ২৭ জন মুক্তিযোদ্ধা। আহত কোম্পানি কমান্ডার মহিউদ্দিনকে উদ্ধার করে কমলপুর হাসপাতালে নিয়ে এসেছিলাম। ১৪ আগস্ট ধলই ও পাত্রখলা আবারও আমরা আক্রমণ করেছিলাম। অক্টোবর মাস থেকে ইনডাকশনে সিলেট সদরে জালালপুরে ৪২ জন মুক্তিযোদ্ধা অবস্থান নেন; যাদের মধ্যে আমিও ছিলাম। তখন বালাগঞ্জের গণহত্যার ঘটনাগুলো অনেকখানি শুনতে পাই। হ
অনুলিখন : চয়ন চৌধুরী, ব্যুরো প্রধান, সিলেট
লেখক
মুক্তিযুদ্ধের সেকশন কমান্ডার,
সাবেক উপজেলা কমান্ডার, মুক্তিযোদ্ধা সংসদ, বালাগঞ্জ
প্রত্যেক গ্রামের সবাইকে বাধ্যতামূলক আসার কথা জানিয়ে বলা হয়, শান্তি কার্ডধারীদের (ড্যান্ডি কার্ড) নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে পাকিস্তান সরকার। সেই নির্দেশে ২৬ মে সকাল ৮টায় বুরুঙ্গা স্কুল মাঠে কয়েকশ' মানুষ সমবেত হন। সকাল ১০টায় পাকিস্তানি বাহিনী সভার কথা বলে স্কুল মাঠে সমবেতদের মধ্য থেকে হিন্দু-মুসলিমদের আলাদা করে। তারপর হিন্দুদের বিদ্যালয়ের অফিস কক্ষে ও মুসলিমদের দক্ষিণ দিকের একটি ক্লাস রুমে ঢুকিয়ে দেয়। কলেমা পড়তে বলে ১০-১২ জন মুসলিমকে রেখে বাকিদের ছেড়ে দেওয়া হয়। তারপর পাকিস্তানি বাহিনী বন্দি থাকা মুসলিমদের নির্দেশ করে- চারজন করে হিন্দুকে একসঙ্গে বাঁধার। তখন সাবেক চেয়ারম্যান বাদশা মিয়া 'এটা ইসলামের বিধান না' বললে তাকে ধমক দিয়ে থামিয়ে দেওয়া হয়। সেদিন সিলেট জজ কোর্টের প্রভাবশালী উকিল রাম রঞ্জন ভট্টাচার্যকে একটি চেয়ারে বসিয়ে রাখা হলেও একপর্যায়ে তাকে ছেড়ে দেওয়ার কথা বলে গুলি করে হত্যা করা হয়। এদিকে রশি দিয়ে বাঁধার মুহূর্তে কৌশলে ভবনের জানালা খুলে প্রীতি রঞ্জন চৌধুরী ও রানু মালাকার জানালা দিয়ে পালিয়ে যান। সেদিন রাম রঞ্জনসহ স্কুল মাঠে ৭১ জনকে গুলি করে হত্যা করে পাকিস্তানিরা।
আদিত্যপুরেও শান্তি কমিটি গঠনের কথা বলে নির্মম হত্যাযজ্ঞ চালায় পাকিস্তানি সেনারা। ১৪ জুন ভোরে একসঙ্গে তিনটি পাকিস্তানি সাঁজোয়া যান প্রবেশ করে আদিত্যপুরে। রিফাতপুর, আদিত্যপুর, সত্যপুর, নারায়ণপুর গ্রামে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। কয়েকজন রাজাকার দু'জন পাকিস্তানি সেনাসহ প্রতিটা ঘরে গিয়ে পুরুষদের খুঁজতে থাকে। আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখতে সবাইকে আদিত্যপুর প্রাথমিক বিদ্যালয়ে আসতে বলা হয়।
স্বাভাবিকভাবে তাদের কথায় আস্থা রাখতে পারেনি সাধারণ মানুষ। মহিলা ও শিশু-কিশোররা আশ্রয় নেয় গ্রামের পেছনের হাওরে। প্রায় ৫ ঘণ্টা রিফাতপুর, আদিত্যপুর, সত্যপুর, নারায়ণপুর গ্রাম তছনছ করে ৬৫ জন পুরুষকে ধরে আনার পর ব্রাশফায়ার করে পাকিস্তানি সেনারা। এদের মধ্যে ৬৩ জন শহীদ হলেও শরীরে গুলি নিয়ে ভাগ্যক্রমে বেঁচে যান শিব প্রসাদ সেন ও সুখময় বাবু।
আমাদের বালাগঞ্জে সর্বপ্রথম গণহত্যার ঘটনা ঘটেছিল ভাটেরা গালিমপুরে। ১৫ মে ধান কাটাকে কেন্দ্র করে পূর্ব পৈলনপুরের ভাটেরা গালিমপুর ও পার্শ্ববর্তী পশ্চিম পৈলনপুর ইউনিয়নের বল্লভপুর গ্রামের কয়েক যুবকের মধ্যে ঝগড়া হয়। এই ঝগড়ার বিষয়টা শান্তি বাহিনীর লোকজন পার্শ্ববর্তী সাদিপুর ও শেরপুরে অবস্থানরত পাকিস্তানি সেনাদের অবগত করে। শেরপুর ক্যাম্পের পাকিস্তানি ক্যাপ্টেন নিজে বিষয়টি খতিয়ে দেখতে বল্লভপুর ও ভাটেরা-গালিমপুরে আসার খবর ছড়িয়ে পড়ে।
সেই সময় ক্যাপ্টেনের আসা ঠেকাতে গ্রামবাসী চাঁদা তুলে কিছু টাকাও দেন। এরপরও ২০ মে বেলা ১১টার দিকে একটি বড় নৌকা নিয়ে সাদিপুর ক্যাম্পে অবস্থানরত ১২ জন পাকিস্তানি সেনা ভাটেরা গালিমপুরে প্রবেশ করে। এতে ভাটেরা গালিমপুরের তিন শতাধিক হিন্দু পরিবারে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। এ সময় কয়েকজন হিন্দু শান্তি কার্ড দেখালেও পাকিস্তানিরা ব্রাশফায়ার করে পাঁচজনকে খুন করে। সেদিন তারা গ্রামে অভিযান চালিয়ে ২৭ জনকে হত্যা করে।
পাকিস্তানি বাহিনী চলে যাওয়ার পর শোকে হতবিহ্বল গ্রামবাসী প্রথমে নিহত প্রথম পাঁচজনকে সেখানেই মাটি চাপা দেয়। অন্য শহীদ অনেকের লাশ কাপড় জড়িয়ে কুশিয়ারা নদীতে ভাসিয়ে দেওয়া হয়; কয়েকজনকে মাটি চাপা দেওয়া হয়। এ ছাড়া তিনদিকে নদীবেষ্টিত বালাগঞ্জের সাদিপুর ইউনিয়নের অন্তর্গত প্রত্যন্ত অঞ্চল সুরীকোনায় গণহত্যা চালায় পাকিস্তানি বাহিনী।
১৯ জুলাই রাত সাড়ে ৩টার দিকে দুটো লঞ্চযোগে শতাধিক পাকিস্তানি সেনা রাজাকারদের সহযোগিতায় সুরীকোনা গ্রাম ঘেরাও করে। ভোরের আজানের সঙ্গে সঙ্গে গ্রামের প্রায় ৩৫ জন ও অন্যান্য এলাকা থেকে ধরে আনা সবাইকে নদীর তীরে দাঁড় করানো হয়। এরপর নির্বিচারে গুলি ছুড়তে থাকে পাকিস্তানিরা। গুলিবিদ্ধ অবস্থাতেই প্রাণ বাঁচাতে অনেকে নাটকিলা ও কুশিয়ারা নদীতে ঝাঁপিয়ে পড়েন।
২১ জুলাই যুদ্ধের ময়দানে ৪ নম্বর সেক্টরের অধীনে ধলই বিওপি মুক্তিবাহিনী আক্রমণ করে সরাসরি চার্জে যায়। ১৭ জন মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হন, গুরুতর আহত হন ২৭ জন মুক্তিযোদ্ধা। আহত কোম্পানি কমান্ডার মহিউদ্দিনকে উদ্ধার করে কমলপুর হাসপাতালে নিয়ে এসেছিলাম। ১৪ আগস্ট ধলই ও পাত্রখলা আবারও আমরা আক্রমণ করেছিলাম। অক্টোবর মাস থেকে ইনডাকশনে সিলেট সদরে জালালপুরে ৪২ জন মুক্তিযোদ্ধা অবস্থান নেন; যাদের মধ্যে আমিও ছিলাম। তখন বালাগঞ্জের গণহত্যার ঘটনাগুলো অনেকখানি শুনতে পাই। হ
অনুলিখন : চয়ন চৌধুরী, ব্যুরো প্রধান, সিলেট
লেখক
মুক্তিযুদ্ধের সেকশন কমান্ডার,
সাবেক উপজেলা কমান্ডার, মুক্তিযোদ্ধা সংসদ, বালাগঞ্জ
