নিরস্ত্র মানুষকে পাখির মতো গুলি করে হত্যা করে
×
অ্যাডভোকেট ইলিয়াস আহমেদ
প্রকাশ: ১৫ ডিসেম্বর ২০১৯ | ১২:০০
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ছয় দফা দাবি ঘোষণার পর রংপুরে আন্দোলন শুরু হয়। ষড়যন্ত্রমূলক বঙ্গবন্ধুর নামে আগরতলা মামলা করেন আইয়ুব খান। ছয় দফা ও ১১ দফা দাবিতে সারা বাংলাদেশের ছাত্রসমাজ ও মুক্তিকামী মানুষকে নিয়ে আন্দোলন শুরু হয়। আইয়ুব খান বাধ্য হয়ে পদত্যাগ করেন। বঙ্গবন্ধু সাধারণ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলেন। তারা বাঙালিদের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করল না। এর পর ৪ জানুয়ারি ঢাকা ও রংপুরে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হয়। এ কমিটিতে মুক্তিযোদ্ধা (প্রয়াত) রফিকুল ইসলাম গোলাপকে আহ্বায়ক করা হয়। অন্য ১৩ সদস্যের মধ্যে বর্তমানে প্রয়াত হারেছ সরকার, রুবেল হাসান, শহীদ মোক্তার এলাহী। এখন শুধু আমি ও আব্দুর রহমান বেঁচে আছি। রংপুরে স্বাধীন বাংলা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের পক্ষ থেকে আমরা একটি প্রতিরোধ গড়ে তোলার চেষ্টা করি। ৩ মার্চ আমরা রংপুরে প্রথম গণমিছিল বের করার চেষ্টা করি। একক কোনো নেতৃত্ব নয়। জনতার একাত্মতা ছিল বলে আমাদের ৪০ থেকে ৫০ জনের মিছিলে প্রায় ৫০ হাজার মানুষ ছাড়িয়ে যায়। সেই মিছিল স্টেশন রোডে আসতেই একটি বাড়ি থেকে গুলি ছোড়া হলে মিছিলের সামনে থাকা আট বছরের শিশু শঙ্কু সমজদার শহীদ হয়। দেশের মাটিতে প্রথম শহীদ সে। শঙ্কু যখন মাটিতে লুটিয়ে পড়ে, তখন মোসলেম কমিশনার তার লাশটি কোলে নিয়ে মিছিল করে। এর পর প্রশাসনের লোকজন ঘন ঘন আমাদের ছাত্রনেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করে। বঙ্গবন্ধু ৭ মার্চের ভাষণে রংপুরের শহীদের কথা বলেছিলেন। তার ভাষণে ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোলার নির্দেশ দিলে গোটা রংপুরের মানুষ মুক্তিযুদ্ধে উজ্জীবিত হয়। এর পর থেকে ধরপাকড় শুরু হয় বিভিন্ন জায়গায়। আমার ভাই নির্বাচনের জন্য একটি মোটরসাইকেল কিনেছিল। আমি সেটি নিয়ে মিঠাপুকুর, বদরগঞ্জসহ বিভিন্ন স্থানে যাই মানুষকে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেওয়ার জন্য উদ্বুদ্ধ করতে। ২৮ মার্চ মিঠাপুকুর, বদরগঞ্জ, নিসবেতগঞ্জ এলাকায় সাতশ' থেকে আটশ' মানুষ একত্র হয়েছিল। অনেকে থালা, তীর-ধনুক, লাঠিসহ যে যা পেয়েছিল, তাই নিয়ে ক্যান্টনমেন্ট ঘেরাও করতে এসেছিল। তারা ক্যান্টনমেন্ট ঘেরাও করলে সেনাবাহিনী পাখির মতো গুলি করে নিরস্ত্র মানুষকে হত্যা করে। সেখানেই পাঁচশ' থেকে ছয়শ' নিরস্ত্র মানুষ শহীদ হন। আমরা সব লাশ শনাক্ত করতে পারিনি। এ ঘটনাকে স্মরণীয় করে রাখতে নিসবেতগঞ্জের বধ্যভূমিতে 'রক্ত গৌরব' নামে মুক্তিযুদ্ধের এক স্মারক নির্মাণ করা হয়েছে। পাখির মতো গুলি করে নিরস্ত্র মানুষকে হত্যা করা ঘটনার সাক্ষী এই 'রক্ত গৌরব'।
এর পর আমি জলঢাকার হাতীবান্ধা দিয়ে শীতলকুচি হয়ে ভারতের মাথাভাঙা যাই ট্রেনিং নিতে। ওখানে মওকুবা কংগ্রেসের সভাপতি মদনমোহন শুক্লা এবং ধ্রুব কংগ্রেসের সাধারণ সম্পাদক ধুজরুটি নাগ ছিলেন, আমরা রেণু মাসিমা নামে ডাকতাম। তাদের বাড়িতে উঠি। ভারতে থাকার সময় শুনতে পাই রংপুরের শ্মশান মুন্সিপাড়ার জররেজ ভাই, বিজয় চন্দ্র মিত্র পাখি, দিনেশ চন্দ্র ভৌমিক মন্টু ডাক্তারকে পাকিস্তানি হানাদাররা হত্যা করেছে। ওখানে একটি বধ্যভূমি হয়েছে। এ ছাড়া রংপুরের নব্দীগঞ্জ, দমদমা ব্রিজসংলগ্ন এলাকা, ঝাড়ূয়ারবিল এলাকায় বধ্যভূমি রয়েছে। বাংলাদেশের প্রায় সব জায়গায় বধ্যভূমি রয়েছে। নগরীর টাউন হলটিও ছিল বধ্যভূমি। পাকিস্তান সেনাবাহিনী গণহত্যার একটি বড় ঘৃণ্য কর্মযজ্ঞের স্থান হিসেবে বেছে নিয়েছিল টাউন হলকে। পাকিস্তানের মুক্তিযুদ্ধে পরাজিত হওয়ার আরেকটি কারণ হলো ধর্ষণ তথা ব্যভিচারে লিপ্ত হওয়া। মুক্তিযুদ্ধে গ্রামের কৃষক, যাদের একটি ছেঁড়া কাঁথা ছিল গায়ে দেওয়ার, তারা আমাদের সেটি দিয়েছিল। তাদের হাঁড়িতে থাকা পান্তাভাত খেয়েছি। সেটির যে স্বাদ ছিল, বর্তমানে দামি হোটেলের খাবার খেয়েও যেন সেই তৃপ্তি পাই না। দেশের সর্বস্তরের মানুষ দেশকে ভালোবেসে, অন্যায়-অত্যাচারের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেওয়ার কারণেই আমরা স্বাধীনতা অর্জন করতে পেরেছি। হ
অনুলিখন :
মেরিনা লাভলী, স্টাফ রিপোর্টার, রংপুর
লেখক
মুক্তিযোদ্ধা
এর পর আমি জলঢাকার হাতীবান্ধা দিয়ে শীতলকুচি হয়ে ভারতের মাথাভাঙা যাই ট্রেনিং নিতে। ওখানে মওকুবা কংগ্রেসের সভাপতি মদনমোহন শুক্লা এবং ধ্রুব কংগ্রেসের সাধারণ সম্পাদক ধুজরুটি নাগ ছিলেন, আমরা রেণু মাসিমা নামে ডাকতাম। তাদের বাড়িতে উঠি। ভারতে থাকার সময় শুনতে পাই রংপুরের শ্মশান মুন্সিপাড়ার জররেজ ভাই, বিজয় চন্দ্র মিত্র পাখি, দিনেশ চন্দ্র ভৌমিক মন্টু ডাক্তারকে পাকিস্তানি হানাদাররা হত্যা করেছে। ওখানে একটি বধ্যভূমি হয়েছে। এ ছাড়া রংপুরের নব্দীগঞ্জ, দমদমা ব্রিজসংলগ্ন এলাকা, ঝাড়ূয়ারবিল এলাকায় বধ্যভূমি রয়েছে। বাংলাদেশের প্রায় সব জায়গায় বধ্যভূমি রয়েছে। নগরীর টাউন হলটিও ছিল বধ্যভূমি। পাকিস্তান সেনাবাহিনী গণহত্যার একটি বড় ঘৃণ্য কর্মযজ্ঞের স্থান হিসেবে বেছে নিয়েছিল টাউন হলকে। পাকিস্তানের মুক্তিযুদ্ধে পরাজিত হওয়ার আরেকটি কারণ হলো ধর্ষণ তথা ব্যভিচারে লিপ্ত হওয়া। মুক্তিযুদ্ধে গ্রামের কৃষক, যাদের একটি ছেঁড়া কাঁথা ছিল গায়ে দেওয়ার, তারা আমাদের সেটি দিয়েছিল। তাদের হাঁড়িতে থাকা পান্তাভাত খেয়েছি। সেটির যে স্বাদ ছিল, বর্তমানে দামি হোটেলের খাবার খেয়েও যেন সেই তৃপ্তি পাই না। দেশের সর্বস্তরের মানুষ দেশকে ভালোবেসে, অন্যায়-অত্যাচারের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেওয়ার কারণেই আমরা স্বাধীনতা অর্জন করতে পেরেছি। হ
অনুলিখন :
মেরিনা লাভলী, স্টাফ রিপোর্টার, রংপুর
লেখক
মুক্তিযোদ্ধা
