ঢাকা শনিবার, ২০ জুন ২০২৬

বধ্যভূমি গোলাহাট

বধ্যভূমি গোলাহাট
×

কাওসার চৌধুরী

প্রকাশ: ১৫ ডিসেম্বর ২০১৯ | ১২:০০

গোলাহাট জায়গাটি সৈয়দপুর শহর থেকে তিন কিলোমিটার দূরে। গাড়িতে যেতে একটু ঘুরে যেতে হয় বলে সময় একটু বেশি লাগে। একটি মাইক্রোবাসে চড়ে শহর ছেড়ে গোলাহাটে পৌঁছে গেলাম ১৫-২০ মিনিটের মধ্যেই। আমরা ওখানে গিয়েছিলাম ২০১৭-এর মে মাসের মাঝামাঝি, একটি প্রামাণ্যচিত্রের (বধ্যভূমিতে একদিন) চিত্রগ্রহণ করতে।
গোলাহাট জায়গাটিকে স্থানীয়রা চৌধুরীবাড়ি ওয়াপদা মোড় বলে পরিচয় দেয়। এখানেই রয়েছে একটি ছোট্ট বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র। পাশেই ঘোড়াঘাট। এই পুরো এলাকাটি দু'ভাগ করে বয়ে গেছে শীর্ণ একটি খাল- নয়নজলি। আমরা যখন গিয়েছি তখন নয়নজলিতে কোনো জল নেই, শুকনো, খাঁ খাঁ করছে। এই নয়নজলি খালের কোলঘেঁষেই সমান্তরালে বয়ে গেছে একটি রেললাইন। সৈয়দপুর শহর থেকে রেললাইনটি গোলাহাট হয়ে ভারতের সীমান্তে গিয়ে থেমেছে, চিলাহাটিতে। এপারে চিলাহাটি, ওপারে কোচবিহার জেলার হলদিবাড়ি। সৈয়দপুর শহর থেকে চিলাহাটি বর্ডার প্রায় ৫৪ কিলোমিটার। চৌধুরীবাড়ি ওয়াপদা মোড়ের গোলাহাট এলাকায় নয়নজলি খাল এবং রেললাইনের মাঝামাঝি জায়গায় হলো সেই ঐতিহাসিক স্থানটি- 'গোলাহাট বধ্যভূমি'। যেটা আমাদের প্রধান লক্ষ্য।
গোলাহাট হত্যাকাণ্ড বর্ণনা করার আগে, সেই সময়ে (মার্চ, একাত্তর) সৈয়দপুরের কিছু ঘটনার উল্লেখ করতে চাই- যার সঙ্গে গোলাহাট হত্যাকাণ্ডের যোগাযোগ অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ।
একাত্তরে পঁচিশে মার্চের আগেই সৈয়দপুরে বিহারিরা বাঙালি-নিধন শুরু করে দিয়েছিল। বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণের পরপরই বিহারিরা বেপরোয়া হয়ে ওঠে। বাঙালিদের দৃশ্যমান সব রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে তারা সরাসরি বাধা দিতে থাকে। এখানে বলে রাখা প্রয়োজন, একাত্তরে সৈয়দপুরে জনসংখ্যার ৮০ শতাংশ ছিল বিহারি এবং পাকিস্তানি। আর বাঙালিদের অবস্থান ছিল মাত্র ২০%। শুনেছি আজও নাকি সেই জনসংখ্যার অনুপাত ৬০/৪০ (৬০% বিহারি+পাকিস্তানি, ৪০% বাঙালি)। সেই পাকিস্তান আমলেও সারা সৈয়দপুরে উর্দুতেই কথাবার্তা চলত ব্যবসা-বাণিজ্য কিংবা রাস্তাঘাটে, আজও এর বেশি পরিবর্তন ঘটেনি। সৈয়দপুরে আজও উর্দু ভাষারই জয়জয়কার যোগাযোগের ক্ষেত্রে!
ফিরে আসি একাত্তরে। বাঙালিদের ওপর বিহারিদের সরাসরি আক্রমণ পরিচালিত হয় একাত্তরের ১১ মার্চ অপরাহেপ্ত। সেদিন ছিল শুক্রবার। শহরের লিবার্টি সিনেমা হলে সেদিন 'আপন পর' ছবিটি রিলিজ হয়। ম্যাটিনি শো'তেই (অপরাহপ্ত ৩টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা) বিহারিরা ওই সিনেমা হল ঘিরে ফেলে অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে। বিহারিদের দাবি- আজ থেকে (১১ মার্চ থেকে) এই শহরে কোনো বাংলা চলচ্চিত্র প্রদর্শন করা যাবে না! 'আপন পর' চলচ্চিত্রটির বদলে কোনো একটি উর্দু ফিল্ম প্রদর্শন করতে হবে ওই সিনেমা হলে।
বাঙালি দর্শকরা টিকিট কেটে হলের ভেতরে ঢুকে গেছে দুপুর ৩টার মধ্যেই। তারা সঙ্গত কারণেই 'আপন পর' ছবিটি দেখতে চায়। অন্যদিকে বিহারিরা সেটা হতে দেবে না। তারা লাঠিসোটা নিয়ে লিবার্টি সিনেমা হলে ঢুকে পড়ল বাংলা ফিল্ম প্রদর্শনে বাধা দিতে। মারমুখী বিহারিদের দেখে ফুঁসে উঠল বাঙালি দর্শক। সিনেমা হলের ভেতরেই শুরু হয়ে গেল ধাক্কাধাক্কি, হাতাহাতি। শেষ পর্যন্ত বাধ্য হয়ে হল কর্তৃপক্ষ সিনেমা হলই দিল বন্ধ করে। সংখ্যায় অধিক এবং সশস্ত্র বিহারিদের সঙ্গে পেরে না ওঠায় বাঙালি দর্শকরা প্রাণে বেঁচে বেরিয়ে এলো সিনেমা হল থেকে।
প্রাথমিক বিজয় নিয়ে বিহারিদের সাহস গেল বেড়ে। তারা সৈয়দপুর শহরময় সশস্ত্র মিছিল শুরু করে দেয়। হাতে লাঠিসোটা, হকিস্টিক, রামদা, কিরিচ এবং দেশি বন্দুক নিয়ে উন্মুক্ত রাস্তায় বিহারিরা সশস্ত্র মহড়া করে। প্রতি-উত্তরে ছাত্রলীগ এবং আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকেও বের হয় পাল্টা মিছিল। শুরু হয় ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া, মাঝে মাঝে ছোটোখাটো সংঘর্ষ। এর মাঝে বিহারি এবং পাকিস্তানিরা আরও সঙ্ঘবদ্ধ হয়ে সৈয়দপুর শহরের বাঙালিদের অবরুদ্ধ করে ফেলে চারদিক থেকে।
২৫ মার্চ (১৯৭১) পাকিস্তানি সৈন্যরা ঢাকায় গণহত্যা শুরু করলে সৈয়দপুরে বিহারি এবং পাকিস্তানিরা আগের চাইতে দশ গুণ মারমুখী হয়ে যায়। শুরু হয় তাদের নির্মম হত্যাকাণ্ড। দিনের বেলায় রাস্তাঘাটে বিহারিদের সশস্ত্র মহড়া আর রাতে চলত হত্যাযজ্ঞ। এর মাঝে স্ব্বাধীনতার পক্ষের মানুষদের একটি তালিকা করে প্রতি রাতেই হত্যা করা হতো বাঙালিদের।
আসে ১৩ জুন (১৯৭১), সেই গোলাহাট হত্যাকাণ্ডের দিন। এর পূর্বের দুই দিন- অর্থাৎ ১১ এবং ১২ জুন পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর সদস্যরা একটি চরম প্রতারণার আশ্রয় নেয়। সারা সৈয়দপুর শহরে তারা মাইকিং করে বলে, সৈয়দপুর শহরে রাজাকার এবং বিহারিরা যেহেতু বাঙালি আর হিন্দুদের ওপরে অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে নির্যাতন চালাচ্ছে, সেহেতু, যারা সৈয়দপুর ছেড়ে ভারতে চলে যেতে চায় তারা যেন ১৩ জুন সকাল ৮টার মধ্যে সৈয়দপুর রেলওয়ে স্টেশনে চলে আসে। পাকিস্তানি সৈনিকরা একটি ট্রেনে করে ভারত-গমনেচ্ছুদের নিরাপদে চিলাহাটি বর্ডারে পৌঁছে দেবে (ঘোষণাটি উর্দুতেই ছিল)। এই কথা অনেকে বিশ্বাস করে পাকিস্তানি ও বিহারিদের পাতা এই ফাঁদে পা দেয়। প্রধানত হিন্দু মাড়োয়ারি এবং সাধারণ বাঙালি হিন্দুরা ১৩ জুন সকাল ৮টার মধ্যে পরিবার-পরিজন নিয়ে অগত্যা সৈয়দপুর রেলওয়ে স্টেশনে চলে আসে। ভারত-গমনেচ্ছুদের তখন উভয় সংকট। তাদের জলে কুমির, ডাঙায় বাঘের মতো অবস্থা। অন্য কোনো উপায় না পেয়ে প্রায় আট-নয়শ' হিন্দু সেদিন পাকিস্তানিদের ট্রেনে ওঠে বসে।
আট-দশটি বগি নিয়ে ট্রেনটি চলতে শুরু করে নির্ধারিত সময়েরও ঘণ্টাখানেক পরে। এর পরের ঘটনাগুলো শুনুন সেদিনের ভারত গমনেচ্ছু তপন কুমার দাস কাল্টুর মুখে। তপন কুমার দাসকে সৈয়দপুরের মানুষরা কাল্টুদা বলেই ডাকেন। এই কাল্টুদা আমাদের ক্যামেরার সামনে কথা বলেন গোলাহাট বধ্যভূমিতে, ২০১৭-এর মে মাসের মাঝামাঝি সময়ে। কাল্টুদা বলেন- 'সেই সময়ে আমার বয়স ২২-২৩ হবে। আমি, আমার দাদা, বউদি এবং ভাইয়ের ছেলেমেয়েসহ আমরা ৮-১০ জন পাকিস্তানিদের ট্রেনে চেপে বসি ১৩ জুন ১৯৭১-এ।' এরপরে কাল্টুদা যা বলেন তার মর্মার্থ এ রকম। ট্রেনে তাদের বগিসহ কোনো বগিতেই আর কোনো জায়গা নেই। সব বগি মাড়োয়ারি হিন্দু আর সৈয়দপুরের স্থানীয় হিন্দু সম্প্রদায়ের লোক দিয়ে ঠাসা। ট্রেনটি চলছিল খুব ধীরগতিতে। হঠাৎ ট্রেনের কামরার দরজা ঠেলে কয়েকজন পাকিস্তানি সৈন্য তাদের কামরায় উঠে পড়ে। বগিতে উঠেই তারা ট্রেনের দরজা-জানালাগুলো হাতুড়ি দিয়ে পেরেক ঠুকে বন্ধ করতে থাকে (একাত্তরে ট্রেনের জানালাগুলো কাঠের তৈরি ছিল)। এতে কাল্টুদার সন্দেহ হয়- তাদের বুঝি আটকে দিল এই ট্রেনে! এই বুঝি কোনো দুর্ঘটনা ঘটতে চলেছে! ট্রেনের দরজা-জানালা বন্ধ করার কারণ জানতে চাইলে পাকিস্তানি সৈন্যরা বলে- 'চারদিকে বিহারিরা তোমাদের (হিন্দুদের) মারার জন্য ওত পেতে আছে। ট্রেনের যাত্রাপথে তারা দরজা-জানালা দিয়ে এখানে উঠে তোমাদের হত্যা করার চেষ্টা করতে পারে। তাই বিহারিদের হাত থেকে তোমাদের বাঁচানোর জন্য এই দরজা-জানালা বন্ধ করে দিচ্ছি (বলাই বাহুল্য, কথাগুলো উর্দুতেই ছিল)।' কাল্টুদা বলেন- তারা পাকিস্তানি সৈন্যদের কথা ৮০% বিশ্বাস করতে পারেননি। তখনই তাদের মনে হচ্ছিল, মৃত্যু খুব কাছে বুঝি।
এর মাঝেই ট্রেনটি ধীরগতিতে গোলাহাট এলাকায় এসে সম্পূর্ণভাবে থেমে যায় একটি কালভার্টের ওপর। ট্রেনের জানালার এক চিলতে ফাঁক দিয়ে তারা বাইরে তাকিয়ে দেখেন ট্রেনের দু'পাশে অস্ত্র হাতে দাঁড়িয়ে আছে দুই-আড়াইশ' পাকিস্তানি আর্মি এবং বিহারি। বিহারিদের প্রত্যেকের হাতে লম্বা কিরিচ, চাপাতি আর রামদা। পাকিস্তানি আর্মিদের হাতে স্বয়ংক্রিয় মাঝারি থেকে ভারী অস্ত্র। কাল্টুসহ ভারতগামী শরণার্থীদের বুকের রক্ত শীতল হয়ে যায় হত্যার আয়োজন দেখে। ট্রেনে থাকা মানুষদের মাঝে কান্নাকাটি শুরু করে দেয় কেউ কেউ। বাকিরা সৃষ্টিকর্তার নাম জপ করছে তখন।
এর মাঝেই খুলে যায় ট্রেনের দরজা। বিহারিরা টেনে নামাতে শুরু করে শরণার্থীদের। ট্রেনের কামরায় মরাকান্নার রোল ওঠে। কাল্টুদা বলেন- সর্বপ্রথমেই নামানো হয় এক বয়োবৃদ্ধকে। বৃদ্ধ মানুষটি বিহারি আর পাকিস্তানিদের কাছে প্রাণভিক্ষা চেয়ে কাকুতি-মিনতি করছিল। কিন্তু কে শোনে কার কথা! পাকিস্তানি সৈন্যরা অস্ত্র তাক করে আছে কামরার শরণার্থীদের দিকে। এ সময় দুজন বিহারি এসে ওই বয়স্ক মানুষটির গায়ের জামাটি দিয়ে তার মুখ ঢেকে ফেলে। এরপরে একজন বিহারি বৃদ্ধ মানুষটির দু'হাত টেনে পিছমোড়া করে ধরে থাকে। অন্যজন তাকে ধাক্কা দিয়ে ট্রেনের দরজা দিয়ে বাইরে নিয়ে যায়। ওখানে, কালভার্টের গোড়ায় দাঁড়ানো একজন (বিহারি কিংবা পাকিস্তানি) উন্মত্ত যুবক হাতের ধারালো কিরিচ দিয়ে বৃদ্ধ মানুষটির মাথা এক কোপে বিচ্ছিন্ন করে দেয়। দেহ থেকে ছিন্ন মাথাটি গড়িয়ে পড়ে কালভার্টের নিচে। এবারে মস্তকহীন মানুষটির কোমরে একটি লাথি দিয়ে কালভার্টের নিচে ফেলে দেয় অন্য একজন বিহারি।
তারপর এক এক করে শরণার্থীদের ট্রেন থেকে নামিয়ে গুলি কিংবা ধারালো অস্ত্র দিয়ে হত্যা করতে থাকে স্থানীয় বিহারি এবং পাকিস্তানিরা। পাকিস্তানি সেনারা ওই সময় বিহারিদের সশস্ত্র ব্যাকআপ দিতে থাকে। মৃত্যু নিশ্চিত জেনে তপন কুমার কাল্টু তার ভাইকে প্রস্তাব দেয়- 'চলো, জানালা ভেঙে লাফ দিয়ে আমরা পালিয়ে যাই।' কিন্তু তার ভাই বলেন, 'তোর বউদি আর বাচ্চাদের ছেড়ে আমি যাব না। তুই বরং কোনোভাবে পালানোর চেষ্টা কর। পরিবারে একজন মানুষ অন্তত বেঁচে থাকুক।' উপায়ান্তর না দেখে কাল্টুদা কয়েকজন শরণার্থীকে সম্ব্বল করে ঘুণে ধরা একটি জানালার কিছু অংশ ভেঙে ওটার ফোকর গলে ট্রেন থেকে লাফ দিয়ে দৌড় দেন পাশের বাড়িগুলোর দিকে। পেছন থেকে অনেক গুলি তার পাশ কেটে চলে যায়। কিন্তু কপালগুণে বেঁচে যান কাল্টুদা। সেদিন (১৩ জুন ১৯৭১) ওই গোলাহাট এলাকায় স্থানীয় রাজাকার, বিহারি এবং পাকিস্তানিদের সম্মিলিত বাহিনী ৪৪৮ জন শরণার্থীকে হত্যা করে সেই কালভার্টের নিচে এবং নয়নজলি খালে ফেলে দেয়। শরণার্থীদের রক্তে নয়নজলির জল হয়ে যায় রক্তিম। রেললাইনের দু'পাশে দীর্ঘদিন পড়ে থাকে শরণার্থীদের লাশ। কাক-শকুন আর কুকুরের খাবারে পরিণত হয় মুক্তিকামী ৪৪৮ জন মানুষ!
গোলাহাট ছাড়াও সৈয়দপুর রেলওয়ে কারখানার ফাউন্ড্রি শপের বয়লারে ৩৫০ জন মুক্তিকামী মানুষকে জীবন্ত দগ্ধ করে হত্যা করে স্থানীয় বিহারি আর পাকিস্তানিরা। এ ছাড়া স্থানীয় সাংসদ ডাক্তার জিকরুল হক, রেলওয়ের হিসাবরক্ষক মোহাম্মদ আয়েজ উদ্দিন, আওয়ামী লীগ নেতা ডাক্তার বদিউজ্জামান, আওয়ামী লীগ নেতা ডাক্তার শামসুল হক, ন্যাপ নেতা ডাক্তার এম এম ইয়াকুব, ব্যবসায়ী নেতা তুলসী রাম আগারওয়ালা, রামেশ্বর লাল আগরওয়ালা, যমুনাপ্রসাদ কেডিয়া- তাদের ১ এপ্রিল (১৯৭১) ধরে নিয়ে যাওয়া হয় সৈয়দপুর ক্যান্টনমেন্টে। সেখানে ১০ দিন অমানুষিক অত্যাচারের পর ১২ এপ্রিল তাদের সৈয়দপুর থেকে ৩০ কিলোমিটার দূরে রংপুর ক্যান্টনমেন্টের পাশে নিসবেতগঞ্জের বালারখাল এলাকায় গুলি করে হত্যা করা হয়। তৎকালীন রেলওয়ের সিনিয়র অ্যাকাউন্টস অফিসার শহীদ মোহাম্মদ আয়েজ উদ্দিনের সন্তান সাংবাদিক এমআর আলম ঝন্টু, শহীদ সাংসদ ডাক্তার জিকরুল হকের সন্তান বখতিয়ার কবির, শহীদ ডাক্তার শামসুল হকের সন্তান অধ্যাপক সাখাওয়াত হোসেন খোকন, শহীদ আমিনুল হক গোলোর সন্তান মোহসীনুল হক, শহীদ এমএ আজিজের সন্তান এএ মঞ্জুর হোসেনসহ অনেকেই এসব হত্যাকাণ্ডের বর্ণনা এবং সাক্ষ্য দেন আমাদের কাছে। এর মধ্যে এএ মঞ্জুর হোসেনের বাবা এমএ আজিজকে সৈয়দপুর রেলওয়ে ওয়ার্কশপের সামনে বেলতলায় ছুরিকাঘাত করে হত্যা করা হয়। আর মোহসীনুল হকের বাবা আমিনুল হক গোলোকে সৈয়দপুর পৌরসভার উল্টোদিকে ভুলিয়া মাড়োয়ারির জুট প্রেসে টুকরো টুকরো করে হত্যা করা হয়।
শহীদ মোহাম্মদ আয়েজ উদ্দিনের সন্তান সাংবাদিক এম আর আলম ঝন্টু বলেন, মুক্তিযুদ্ধের নয় মাসে সৈয়দপুরে বিহারি, স্থানীয় পাকিস্তানি এবং হানাদার পাকিস্তানি বাহিনীর সৈনিকরা প্রায় চার হাজার ৫০০ নিরীহ বাঙালিকে হত্যা করে।
মহান মুক্তিযুদ্ধের ৪৮ বছর অতিক্রম করতে যাছে বাংলাদেশ। স্বাধীনতার পরে, আমাদের জাতীয় জীবনে নতুন প্রজন্ম এসেছে দুইটি। পঁচাত্তর-পরবর্তী সময়ে দীর্ঘ একুশ বছরে যখন মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের পাতায় জমেছিল শ্যাওলা, মুক্তিযুদ্ধ আর নতুন প্রজন্মের মাঝে দাঁড়িয়ে গিয়েছিল একটি নোংরা দেয়াল; সেই সময়ে আমাদের নতুন প্রজন্ম পড়ে গিয়েছিল ইতিহাসের আড়ালে। সেই নোংরা দেয়াল আজ ভেঙে পড়েছে। ইতিহাসের পাতা থেকে শ্যাওলা সরিয়ে এখন ক্রমেই স্বচ্ছ হচ্ছে প্রতিটি ঘটনা, প্রতিটি কাহিনি। ইতিহাসের সততার আলোয় উদ্ভাসিত হোক নতুন প্রজন্ম। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু প্রায়ই আবৃত্তি করতেন একটি কবিতার ক'টি লাইন- 'উদয়ের পথে শুনি কার বাণী, ভয় নাই ওরে ভয় নাই, নিঃশেষে প্রাণ যে করিবে দান ক্ষয় নাই তার ক্ষয় নাই'। মুক্তিযুদ্ধের তিরিশ লাখ শহীদ আর দু'লাখ সল্ফ্ভ্রমহারা নারীর প্রতি রইল অতল শ্রদ্ধা। হ
লেখক
সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব ও মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক গবেষক

আরও পড়ুন

×