কেমন আছেন তারা
`ভালো থাক বাংলাদেশ`
তাপস বৈশ্য
আলী সেকান্দার
প্রকাশ: ১৮ এপ্রিল ২০২০ | ০০:৫১ | আপডেট: ১৮ এপ্রিল ২০২০ | ০০:৫৬
থেমে গেছে ক্রীড়াঙ্গনের কোলাহল। স্তব্ধ খেলার মাঠ। ঘরে সময় কাটছে তারকাদের। সোশ্যাল মিডিয়ায় তাদের ড্রয়িংরুমের খবর আসছে প্রতিনিয়তই। কিন্তু চারপাশের এই বৈরী সময়ে কেমন আছেন সাবেক তারকারা। কীভাবে কাটছে জীবন। সমকাল ক্রীড়া বিভাগের নতুন এই ধারাবাহিক আয়োজনে সাবেক পেসার তাপস বৈশ্যর সঙ্গে বর্তমান সময় নিয়ে কথা বললেন আলী সেকান্দার
তাপস বৈশ্যের আবাস এখন যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কের কুইন্সে। যে নিউইয়র্ক এখন মৃত্যুপুরী। যেখানে প্রতিদিন করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর শঙ্কা নিয়ে হাজারো মানুষ ছোটেন হাসপাতালে। প্রতিদিন ভোরে তারবার্তা পৌঁছে দেয় কোনো প্রবাসী স্বদেশির মৃত্যুর খবর। এক একটি প্রাণসংহার বাড়িয়ে দেয় উৎকণ্ঠা। দুশ্চিন্তার অতলান্তে তলিয়ে যেতে যেতে ভাবনায় উঁকি দেয় আরও কতশত মানুষের মুখ। চোখের পর্দায় ভেসে ওঠে একটি দেশ। জননী জন্মভূমির মুখ মনে পড়ে যায় তার। চিন্তাক্লিষ্ট মুখে অস্ম্ফুট উচ্চারণ- কী হবে বাংলাদেশের! পারবে তো এই বিপদ সামাল দিতে? আবার নতুন করে লিখতে হবে না তো অন্নহীন মৃত্যুর গল্প? ফোনালাপের ভেতরেই তাপস চিত্রায়িত করার চেষ্টা করেন দেশ ও দেশের মানুষকে নিয়ে নিজের অন্তহীন দরদি কাহিনি, দুশ্চিন্তার ছিন্নপত্র। দীর্ঘ কথোপকথনের শেষান্তে এসে ধরে আসা কণ্ঠে বলেন, 'ভালো থাক বাংলাদেশ, ভালো থাক দেশের মানুষ।'
নিউইয়র্কে বাস করেও তাপস বেশ খোঁজ রাখেন বাংলাদেশের। যুক্তরাষ্ট্রের অভিজাত নগরে উন্নত আর নিরাপদ জীবন পেলেও মাতৃভূমির প্রতি বিন্দুমাত্র টান কমেনি তার। সিলেটে কার কী হলো, কতজন করোনাভাইরাসে আক্রান্ত, ঢাকায় ভাইরাসের প্রকোপ, দেশে কতজন আক্রান্ত আর কতজনইবা মারা গেল- সব খবরই যে রাখেন তিনি। জননী জন্মভূমির হাঁড়ির খবরও নখদর্পণে তাপসের। টাইগারদের সাবেক এ পেসার জানান, করোনাভাইরাসের মাহামারির আতঙ্ক নিয়ে প্রতিদিন ঘুম থেকে জেগে সংবাদমাধ্যমগুলোতে দেখেন দেশের কী হলো। দেশ হলো 'বাংলাদেশ'। আবেগজড়ানো কণ্ঠে তাপস বলে গেলেন নিজের অপ্রকাশিত কথাগুলো, 'একটু উন্নত জীবনের আশায়, অর্থনৈতিক মুক্তি, সামাজিক নিরাপত্তার জন্য আমরা যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমালেও প্রত্যেক প্রবাসীর মনজুড়ে থাকে বাংলাদেশ।'
তাপস জানান, যুক্তরাষ্ট্রে করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাব দেখা দেওয়ার পর সচেতন থাকার চেষ্টা করে গেছেন। কিন্তু কাজের প্রয়োজনে বাইরে যেতে হওয়ায় করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন অনেকে। যারা সুস্থ আছেন, তাদের চিন্তাও কিছু কম নয়। খাবার কিনতে হলেও সপ্তাহে এক-দু'বার যেতে হয় বিপণিবিতানে। ধারেকাছে মানুষের আনাগোনা দেখলেই আঁতকে ওঠেন তাপস। পাছে মনে পড়ে যায় ছেলেমেয়ে দু'জনের কচি মুখদুটো। সন্তানসম্ভবা স্ত্রীর কথা ভেবে বাঁচার আশাটা প্রবলভাবে চেপে বসে মনের গভীরে। 'প্রায় সময় মনে হয় কী হবে? আমরা বাঁচব তো? সবকিছু আগের মতো থাকবে, না বদলে যাবে জীবন? জানেন ভয় হয়, মানুষের মৃত্যুর খবর পেলে, দেশের খারাপ খবরগুলো পড়ে।'- দেশের একজনের কাছে এভাবে বলতে পেরে কিছুটা হালকা হন সাবেক এ ক্রিকেটার।
কত কথা, দুঃসময়ের দুশ্চিন্তা মনোজগতের অনেকটা গ্রাস করে নিলেও নিজের দেশের চিন্তা, খোঁজখবর নেওয়ার ভেতর দিয়ে স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা করেন। তাই তো তিনি বলছিলেন, 'আমাদের আবেগ, চালচলন, উৎসব, পার্বণ সবটাতেই থাকে বাঙালিয়ানা। আমি একা নই, প্রতিটি প্রবাসী বাঙালির মনের চাওয়া বাংলাদেশের উন্নতি হোক, মানুষজন ভালো থাক। বাংলাদেশের ভালো খবরে গর্বিত হয় সবাই। মন্দ খবরে কষ্ট পায়। আমরা নিউইয়র্ক নিয়ে ভাবি না, করোনাভাইরাসে এখানে কতজন মারা গেল সে খবর পাই দু'দিন পর, কিন্তু বাংলাদেশের প্রতিমুহূর্তের খবর আমরা জেনে যাই। বাংলাদেশ নিয়েই আমরা থাকি। দেশের জন্য কিছুই করতে পারিনি। এ দুর্দিনেও পাশে থাকতে পারছি না। স্বল্প সামর্থ্যের ভেতর সিলেটের অল্প কিছু মানুষের পাশে থাকার চেষ্টা করছি।'
২১টি টেস্ট ও ৫৬টি ওয়ানডে ম্যাচ খেলা তাপস যুক্তরাষ্ট্রেও ক্রিকেট নিয়েই আছেন। চুক্তিভিত্তিক কোচের চাকরি করেন এডিসন নিউজার্সির ফ্যালকনস ক্রিকেট ইন্ডিয়ান ক্লাবে। যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী ভারতীয়রা চালান ক্লাবটি। যেখানে অনূর্ধ্ব-১২ ও ১৪ বছরের ছেলেদের ক্রিকেটের পাঠ দেন তিনি, 'ক্রিকেটের প্রতি ভারতীয়দের আবেগ অনেক। তারা চান ছেলেমেয়েরা ক্রিকেটের এক-আধটু চর্চা করুক। যদিও উঁচু ক্লাসে যাওয়ার পর কেউই আর ক্রিকেটে থাকে না। সেজন্য এখানে ক্রিকেটের কোনো ভবিষ্যৎ দেখি না। কেবল 'ন্যাটিভ' আমেরিকানরা সম্পৃক্ত হলে এবং স্কুল ক্রিকেট চালু হলে খেলাটির প্রসার ঘটতে পারে। আইসিসি চেষ্টা করছে যুক্তরাষ্ট্রে ক্রিকেটের প্রসার ঘটাতে, তাতে খুব একটা লাভ হবে বলে মনে হয় না।'
ঢেঁকি স্বর্গে গেলেও ধান ভানে, ক্রিকেটার চাঁদে পাড়ি জমালেও ব্যাট-বল নিয়ে মেতে থাকে। নেশাজাতীয় দ্রব্যের মতো তাদের রক্তেও যে মিশে আছে ক্রিকেট। তাই তো তাপস জানালেন, দেশের ঘরোয়া ক্রিকেট থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক সব ম্যাচের এবং পারফরমারের খোঁজ রাখেন। আর যোগাযোগ রাখেন নিজের ক্রিকেট সতীর্থদের সঙ্গে। তাই তো করোনাভাইরাসের মহাবিপদকালেও হাবিবুল বাশার, আশরাফুল বা অলক কাপালীদের খোঁজখবর নেওয়া বন্ধ রাখেননি তিনি।
