ঢাকা শুক্রবার, ০৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬

অন্তরার আত্মরক্ষার হাতিয়ারও কারাতে 

অন্তরার আত্মরক্ষার হাতিয়ারও কারাতে 
×

বাংলাদেশের স্বর্ণজয়ী কারাতেকা হুমায়রা আক্তার অন্তরা।

সাখাওয়াত হোসেন জয়

প্রকাশ: ০৮ মার্চ ২০২৪ | ১০:২৫ | আপডেট: ০৮ মার্চ ২০২৪ | ২৩:০২

যেমনটা হয় আরকি; স্কুলের ‘এইম ইন লাইফ’ রচনায় অন্য অনেকের মতো তিনিও ডাক্তার হওয়ার কথা লিখতেন। একটু একটু করে স্বপ্নও দেখতেন– একদিন বড় ডাক্তার হয়ে বাবা-মার চিকিৎসা করব, মানুষের সেবায় নিয়োজিত থাকব। কিন্তু জীবনটাতো আর মুখস্থ রচনার মতো নয়, তাই হুমায়রা আক্তার অন্তরার পরিচয় এখন সাফে স্বর্ণজয়ী নারী কারাতেকা।

ক্রিকেটের গ্ল্যামার ছিল, ফুটবলের উত্তেজনা ছিল– তার পরও এসবের কোনো কিছু নয়; অন্তরার অন্তর বাঁধা পড়েছে মার্শাল আর্টের কারাতের সঙ্গেই। যে খেলাটি শুধু তাঁর সম্মানই বাড়ায়নি, আত্মরক্ষার একটা হাতিয়ারও তুলে দিয়েছে। গল্পটাতে না হয় একটু পরেই আসা যাক, আগে বলে নেওয়া ভালো অন্তরা কীভাবে তাঁর ডাক্তার হওয়ার স্বপ্ন বিসর্জন দিয়েছিলেন। ২০১৯ সালের ডিসেম্বরে নেপালে অনুষ্ঠিত সাউথ এশিয়ান গেমসে অংশ নিতে গিয়ে মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষার যুদ্ধে নামতে পারেননি। এমনকি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েও পরীক্ষা দিতে পারেননি। তবে তা নিয়ে অন্তরার অবশ্য আক্ষেপ নেয়। তিনি বিশ্বাস করেন, এই কারাতেই তাঁকে একজন আদর্শবান নারী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করবে।

সমাজে একজন নারী বাড়ির বাইরে বের হলে পথেঘাটে নানা সমস্যায় পড়তে হয়। কিছু লোকের নানা কুরুচিপূর্ণ ইঙ্গিত, যৌন হয়রানির মতো সামাজিক ব্যাধি তো নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা একজন নারীর ক্ষেত্রে হয়ে আসছে। স্কুল-কলেজে যাওয়ার সময় রাস্তায় অন্তরার সঙ্গেও এমন হয়েছিল। ছোটবেলায় ঘটে যাওয়া নানা অপ্রীতিকর ঘটনার বিরুদ্ধে লড়াই করার মতো অস্ত্র ছিল না তাঁর। তবে উত্ত্যক্তকারীদের প্রতিহত করার জন্য কারাতের মতো অস্ত্র ঠিকই খুঁজে পান তিনি। বাসা কাছে হওয়ায় জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের জিমনেশিয়ামে রোজ অনুশীলন দেখতে যেতেন। 

১৩ বছর বয়সে ভালোলাগা থেকে কারাতের প্রেমে পড়ে যান। শুধু মার্শাল আর্টকে পেশা হিসেবেই নেননি, মনে মনে প্রতিজ্ঞা করেছিলেন এই কারাতের মাধ্যমেই সমাজে ঘটে যাওয়া নানা অন্যায়ের প্রতিবাদ করবেন। আত্মরক্ষার জন্য কারাতে শেখাটাও গুরুত্বপূর্ণ বলে নিজে নিজে অনুধাবন করতে থাকেন অন্তরা, ‘অন্য অনেক খেলা থাকলেও কারাতে বেছে নিয়েছি আত্মরক্ষার জন্য। আমি কিন্তু জিমনেস্টিকসও খেলেছিলাম। আমার কাছে মনে হয়েছে, এই খেলাটার মাধ্যমে আমি নিজেকে আত্মরক্ষা করতে পারব। কারণ যখন আমরা মেয়েরা রাস্তায় বের হই, তখন অনেক লোকই বাজে ইঙ্গিত করে, বাজে কথা বলে। এসব দেখে আমার কাছে খুব খারাপ লাগে। আমি তো অনেক সময় নিজেই প্রতিবাদ করেছি। একটা মেয়েকে সমাজে চলতে হলে অনেক বাধার সম্মুখীন হতে হয়।’

হুমায়রা আক্তার অন্তরার জীবনেও এমন অনেক প্রতিবন্ধকতা এসেছিল। কারাতে খেলতে গিয়ে পরিবারের বাধার সম্মুখীন হতে হয়েছে। এসএ গেমসে স্বর্ণ জেতার পর পরিবার বুঝতে পেরেছে অন্তরা ঠিক পথেই আছেন। কিন্তু ২০১৯ সালে সাউথ এশিয়ান গেমসের ক্যাম্প চলাকালে যৌন হয়রানির শিকার হয়েছিলেন এ কারাতেকা। 
কিন্তু মার্শাল আর্ট জানেন বলে সেই উত্ত্যক্তকারীকে বেধড়ক মেরেছিলেন তিনি, ‘রাস্তায় বের হলে তো এসব (যৌন হয়রানি) নিত্যদিনের সঙ্গী। আমার সঙ্গে এ রকম বড় দুটি ঘটনা ঘটেছিল। ২০১৯ সালে তখন সাউথ এশিয়ান গেমসের ক্যাম্পে ছিলাম আমি। সে সময় অসুস্থ হয়েছিলাম। হাসপাতাল থেকে বাসায় ফেরার পথে আমি গাড়ির জন্য রাস্তায় দাঁড়িয়েছিলাম। তখন দেখলাম, একটা লোক পেছন থেকে এসে আমার শরীরে টাচ করেছে। আমি যখন বুঝতে পারলাম, সে ইচ্ছাকৃতভাবে করেছে, তখনই তাকে মারতে থাকি। আশপাশ থেকে লোক এসেছে। কিন্তু আমি দেখলাম সবাই বলতেছে, রাস্তা পার হওয়ার সময় নাকি আমার গায়ে টাচ লেগেছে। আসলে সব কিছুতেই তো আমাদের দেশে মানুষ মেয়েদের দোষ দেয়। এর পর ২০২১ সালে জাতীয় ক্রীড়া পরিষদে আরেকটা ঘটনা ঘটেছে। আমি দেখলাম, পেছন থেকে একটা লোক এসে আমাকে ধাক্কা দিয়েছে। আমি প্রথমে ভেবেছি, হয়তো হাঁটার সময় লেগেছে। তখন আমি লক্ষ্য করলাম আমার সামনের মেয়েটাকে সে টাচ করে কিনা। আমি যখন দেখলাম, সে টাচ করেছে, তখনই বুঝতে পেরেছি এটা ইচ্ছাকৃতভাবে করেছে। তখনই আমি তাকে মারতে থাকি। আশপাশ থেকে অনেকে এসে বিষয়টি সামাল দেয়।’

জাতীয় চ্যাম্পিয়নশিপে সাতটি স্বর্ণ জেতা অন্তরা এখন কারাতে ট্রেনারও। ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের বেইলি রোড ও আজিমপুর শাখায় কারাতে ট্রেনিং করান তিনি। সমাজকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে এখন স্বামী হোসেন খান মুনের মতো তিনিও আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী হয়েছেন। 

তিনি বলেন, ‘আমি চাই, একটা মেয়ে হিসেবে নিজেকে অনন্য উচ্চতায়  নিয়ে যেতে। বর্তমানে জিনিসপত্রের যে দাম, তাতে করে একজন পুরুষের পক্ষে একা সংসার চালানো কঠিন। সে হিসেবে একজন মেয়ে যদি চাকরি করে পুরুষকে সহযোগিতা করতে পারে, তাহলে সংসারটা দারুণ চলবে। আমি মনে করি, মেয়েরা চাকরি করলে আর্থিকভাবে পুরুষদের সাপোর্ট দেওয়া যায়। যেটা বর্তমানে অনেক মেয়েই করছে। আমিও করছি। এখন কিন্তু মেয়েদের নিয়ে দৃষ্টিভঙ্গি বদলে গেছে। আগে যেমন মেয়েদের ঘরের মধ্যে আবদ্ধ করত, এখন মেয়েরা বাইরে গিয়ে চাকরি করে।’

আরও পড়ুন

×