পাসপোর্টে ব্রিটিশ, কানাডিয়ান হলেও হৃদয়ে পুরো বাংলাদেশি
হামজা চৌধুরী ও শমিত সোমের গোল উদযাপন। ছবি: বাফুফে
রাশেদুল ইসলাম
প্রকাশ: ১১ অক্টোবর ২০২৫ | ১২:২৭
শেষ বাঁশি বাজার পর কিছুক্ষণ মাটিতে বসে থাকলেন নিজের জায়গায়। গাঢ় অন্ধকারে ছেয়ে আছে মুখ। কোঁকড়া চুলের ফাঁক গলে ঘাম গড়িয়ে পড়ছে গাল বেয়ে। সতীর্থরা এসে কাঁধে হাত রাখছেন, সান্ত্বনা দিচ্ছেন। কিন্তু তাতে তাঁর ভেতরের ঝড় একটুও থামছে না। বাংলাদেশ দলের প্রতীক হয়ে উঠেছেন তিনি। একটু আগে হতাশার সাগরে পতিত হওয়া সেই দলের প্রতীকও তাঁর সেই মায়া ছড়ানো হতাশাগ্রস্ত মুখ হামজা দেওয়ান চৌধুরী।
একটু দূরেই জার্সিতে মুখ ঢেকে মাটিতে শুয়ে আছেন ফাহমিদুল ইসলাম। রেফারির কাছে গিয়ে কিসের জন্য যেন হাত নেড়ে নেড়ে কৈফিয়ত চাচ্ছেন শমিত সোম। স্বাভাবিকভাবে কোনো জবাবই তখন তাঁর জন্য যথেষ্ট নয়। এরপর কিছুক্ষণ বিমর্ষ হয়ে থমকে দাঁড়িয়ে থাকলেন মাঠে।
বছরের নির্দিষ্ট কিছু সময়ে ‘ফিফা উইন্ডো’ নামে এক ভালোবাসার দরজা খুলে যায় বাংলাদেশের জন্য। দ্বৈত নাগরিকত্বের সুবাদে বাংলাদেশ ছাড়াও পাসপোর্টে তারা ব্রিটিশ, কানাডিয়ান বা ইতালিয়ান। কিন্তু মনেপ্রাণে বাংলাদেশি। হৃদয়ের গভীরে তারা শুধু একটাই পরিচয় বহন করেন– বাংলাদেশি।
ডেনমার্ক প্রবাসী জামাল ভূঁইয়া ও ফিনল্যান্ড প্রবাসী তারিক কাজী পুরোদস্তুর বাংলাদেশি হয়েছেন আগেই। নতুন আসা হামজা চৌধুরীর জন্ম ও বেড়ে ওঠা ইংল্যান্ডে, শমিত সোম কানাডায়। ইতালিতে বাস করেন ফাহমিদুল, আর আমেরিকা থেকে বাংলাদেশের বিমানে ওঠেন জায়ান আহমেদ।
সবাই উন্নত জীবনের অংশ। সেখানকার আধুনিক সুবিধা, পেশাদার পরিবেশে অভ্যস্ত। তবু বাংলাদেশের জার্সির ঘ্রাণে ফিরে আসেন তারা। অপেক্ষাকৃত খারাপ মাঠে খেলে চোট পাওয়ার শঙ্কা– কোনো কিছুই পরোয়া করছেন না জামাল, শমিতরা। হ্যাঁ হামজা ও শমিত ছাড়া বাকিদের জন্য মূল জাতীয় দলের হয়ে খেলাটা বড় স্বপ্ন পূরণের মতো।
বছরজুড়ে ক্লাব ফুটবলের চাপে পিষ্ট। কয়েকটি দিন ফুরসত পেলেই তারা পাড়ি জমান লাল-সবুজের ডাকে সাড়া দিতে। কোনো প্রত্যাশা নেই, দাবি নেই, নামমাত্র সম্মানী নিয়েও কোনো অভিযোগ নেই। লাল-সবুজের জার্সি পরা মানেই তাদের কাছে গর্ব, আবেগ ও অস্তিত্ব।
হংকংয়ের বিপক্ষে ম্যাচে ফ্রিকিকে গোল করে বাংলাদেশকে এগিয়ে নেন হামজা। ক্ষণে ক্ষণে রং বদলানো নাটকীয় ম্যাচে পিছিয়ে থেকে ৩-৩ গোলে সমতায় ফেরান ২৬ ঘণ্টার দীর্ঘ ভ্রমণ শেষে বাংলাদেশ দলের সঙ্গে যোগ দেওয়া শমিত। সেই গোলের আনন্দে চোট আক্রান্ত পা নিয়ে লাফিয়ে পড়েন লাল অ্যাথলেটিকস টার্ফে। তবে ম্যাচ শেষে ফল ৩-৪। নাটকীয় হার, কিন্তু তাতে যে ভালোবাসা, নিবেদন, ত্যাগ– তা হার মানে না কোনো স্কোরলাইনে।
এশিয়ান কাপ বাছাইপর্বে হংকংয়ের বিপক্ষে হেরে হৃদয় ভেঙে গেছে বাংলাদেশের। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বাংলাদেশের গোল হজমের দৃশ্যগুলো দৃষ্টিকটু পর্যায়ের। হামজা ও শমিতের জন্য উঁচু পর্যায় থেকে খেলতে এসে এমনভাবে গোল হজম করা দলের সদস্য হওয়াটা অস্বস্তিকর বটে। তবে তারা দায়িত্ব নিয়ে কাঁধে তুলে নেন গরিব সংসারের জোয়াল। সতীর্থ সাদ উদ্দিন, সোহেল রানাদের ক্ষমার অযোগ্য ভুলগুলোর দায় নিজেদের মধ্যে নেন ভাগাভাগি করে।
তারা বুঝেছেন, বাংলাদেশ শুধু একটি দেশ নয়; এটা এক অনুভব। তাদের চোখেমুখে ভ্রমণ ক্লান্তি। কিন্তু শরীরের তেজের ভাষায় অদম্য গর্ব। দ্বৈত নাগরিকত্বের সুবাদে অন্য একটা পাসপোর্টে যা-ই লেখা থাকুক না কেন, হৃদয়জুড়ে তারা বাংলাদেশি।
লেখক: রাশেদুল ইসলাম, সাবেক ফুটবলার, জাতীয় দল।
- বিষয় :
- বাংলাদেশ ফুটবল
- হামজা চৌধুরী
- শমিত সোম
