ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

সাক্ষাৎকার

তবুও অভিমান নেই তাইজুলের

তবুও অভিমান নেই তাইজুলের
×

তাইজুল ইসলাম

সেকান্দার আলী

প্রকাশ: ২৪ মে ২০২৬ | ১১:৪৪

ওয়ানডে অভিষেকেই হ্যাটট্রিক করেছিলেন তাইজুল ইসলাম। এর পরও এক দিনের ক্রিকেট ক্যারিয়ারটা বড় হয়নি তাঁর। স্পিন কন্ডিশনে খেলা হলেও সুযোগ মেলেনি বেশির ভাগ সময়। তবুও কারও ওপর অভিমান নেই তাইজুলের। এই যে টেস্ট ক্রিকেটে দিনের পর দিন বাজিমাত করতে পারছেন, তাতেই খুশি তিনি। টেস্ট ক্রিকেট নিয়ে তাইজুল ইসলামের একান্ত সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সেকান্দার আলী

সমকাল: ঢাকা লিগে নেমেই ৫ উইকেট শিকার। একেবারে বাজিমাত করলেন। 
তাইজুল:
আমাদের উত্থানের জায়গা ঢাকা প্রিমিয়ার লিগ। বয়সভিত্তিক খেলা শেষে জাতীয় দলে যাওয়ার জন্য এটি দারুণ একটি প্ল্যাটফর্ম। এই জায়গাগুলোতে পারফর্ম করা ভালো লাগার বিষয়। উদীয়মান ক্রিকেটারদের জন্য শেখার মঞ্চ। ৫ উইকেট পেয়ে খুশি। আমরা ভালো করলে তরুণরা শিখতে পারে।

সমকাল: এক দিনের ক্রিকেটে আপনার ক্যারিয়ারটা নানা কারণেই বড় হয়নি। কখনও কি মনে হয়েছে বৈষম্যের শিকার হয়েছেন?
তাইজুল:
আমি মনে করি না বৈষম্যের শিকার হয়েছি। আসলে সবার চাওয়া-পাওয়া এক হবে না। আমার কাছে তাদের যে চাওয়া ছিল, হয়তো আমি তা দিতে পারিনি। জাতীয় দলে যে কোচই আসেন, তারা ভালো কাউকে খোঁজেন। আমাকে হয়তো ভালো লাগেনি বা আমি হয়তো ওয়ানডে দলের জন্য উপযুক্ত ছিলাম না। এ নিয়ে আমার কোনো আক্ষেপ নেই। আমার একটাই লক্ষ্য থাকে যখন যেখানে খেলি, পারফর্ম করার চেষ্টা করি।  

সমকাল: আপনি যে কয়টি ওয়ানডে খেলেছেন, সেগুলোতে তো ভালো করেছিলেন। স্পিন কন্ডিশনে কি আপনাকে খেলাতে পারত?
তাইজুল:
যে জায়গা কঠিন, সেখানে স্পিনার বেশি খেলাবে না। যেখানে স্পিন কন্ডিশন থাকে, সেখানে আমাকে খেলাতে পারত। জানি না কী কারণে পরে নেয়নি। তাদের প্রত্যাশা হয়তো পূরণ করতে পারিনি। এ রকম একটা কিছু হবে। 

সমকাল: একটু অভাগা মনে হয় নিজেকে?
তাইজুল:
না (হাসি)। নিজেকে অভাগা মনে করি না। আসলে সবার ক্যারিয়ার একরকম হবে না। প্রত্যক মানুষের আলাদা আলাদা ক্যারিয়ার ও প্ল্যাটফর্ম। এটা মেনে নিতে হবে। 

সমকাল: টেস্ট অভিষেকে ৫ উইকেট পেয়েছিলেন ওয়েস্ট ইন্ডিজে, ১২ বছর আগে। তখন কি মনে হয়েছিল এক দিন দেশসেরা স্পিনার হবেন?
তাইজুল:
আমি কখনও খুব বেশি প্রত্যাশা রাখি না। কাজ করে যেতে পছন্দ করি। ওয়েস্ট ইন্ডিজে কঠিন কন্ডিশনে অভিষেকে ৫ উইকেট পাওয়ার পর ভালো লাগা কাজ করেছিল। একটা আত্মবিশ্বাস এসেছিল ওয়েস্ট ইন্ডিজের কন্ডিশনে পারলে বিশ্বের সব কন্ডিশনে পারব। ওখান থেকেই মূলত মনোবল আসে। ধীরে ধীরে আমি টেস্ট ক্রিকেটে দলের জন্য অবদান রাখতে থাকি। ক্যারিয়ারটাও বড় হতে থাকে।  

সমকাল: ক্যারিয়ার নিয়ে আপনি কি সুখী?
তাইজুল:
ভালোর কোনো শেষ নেই। এক ইনিংসে ৫ উইকেট পেলে মনে হয় ছয়টা পেলে ভালো হতো। ছয়টা পেলে মনে হয় সাতটা পেলে ভালো হতো। আপনি ১০টি ম্যাচ খেলে একাই ৮টি ম্যাচ জেতাতে পারবেন না। আমি যেটুকু খেলেছি এবং যে কয়টি ম্যাচ জয়ে ভূমিকা রেখেছি, তাতে খুশি। আরও কিছুটা বেশি ভূমিকা রাখতে পারলে তৃপ্তি বেশি হতো। যতটুকু পেরেছি আলহামদুলিল্লাহ। 

সমকাল: সাকিবকে দেখেছি আপনার কাছে স্পিনের কিছু বিষয় জিজ্ঞেস করতে। আপনাদের বোঝাপড়া কেমন ছিল?
তাইজুল:
সাকিব ভাইয়ের যেটা আছে, আমার সেটা নেই। যার যেটা ভালো, সেটা শেয়ার হতো। এটাই নিয়ম। আমি যেটা ভালো পারি, সেটা অন্যে নাও পারতে পারে। আমি তাঁর কাছে জানতে চেয়েছি এই জিনিসগুলো কীভাবে করলে ভালো। একইভাবে সাকিব ভাইও কখনও কখনও আমার কাছে কিছু বিষয় জানতে চাইতেন। এই আলোচনাগুলো ইতিবাচক, অনেক কিছু জানা যায় এবং শেখা যায়। ক্যারিয়ার বড় করার জন্য প্রক্রিয়াগুলো শেয়ার করলে ভালো। আমি মনে করি প্রত্যেক খেলোয়াড়ের উচিত নিজেদের ভালো দিকগুলো আদান-প্রদান করা। তাহলে ভালো করার সম্ভাবনা বেড়ে যাবে। 

সমকাল: সাকিব কীভাবে আপনাদের সহযোগিতা করতেন?
তাইজুল:
সাকিব ভাইয়ের মানসিক দৃঢ়তা সবাইকে উজ্জীবিত করত। তাঁকে কিছু বলতে হতো না, তাঁকে দেখেই শেখা যেত। এটি দলকে কীভাবে চাঙা করা যায়, সেগুলো তিনি ভালো পারতেন। তাঁর কাছ থেকে আমরা শিখেছি কঠিন সময়ে কীভাবে মনোবল শক্ত রাখতে হয়। 

সমকাল: জাতীয় দলে যেসব কিংবদন্তি ক্রিকেটার স্পিন কোচ হয়েছেন, তাদের কাছ থেকে কতটা উপকার পেয়েছেন?
তাইজুল:
আমি যত কোচের সঙ্গে কাজ করেছি, সবার সঙ্গে সুসম্পর্ক ছিল। সবার কাছ থেকে ভালোটা নেওয়ার চেষ্টা করেছি। সুনীল জোশি থেকে শুরু করে ভেট্টরি, রঙ্গনা হেরাথ, মুস্তাক ভাই যারাই ছিলেন, সবার মধ্যে বিশেষত্ব ছিল। তারা অনেক পথ পাড়ি দিয়ে এসেছেন। তাদের সেই অভিজ্ঞতাগুলো নেওয়ার চেষ্টা করেছি। যেটা আমাকে সাহসী করেছে। 

সমকাল: খেলোয়াড়ি জীবনে তামিম ইকবাল কতটা সহযোগীপরায়ণ ছিলেন?
তাইজুল:
অবশ্যই একজন ভালো অধিনায়ক ছিলেন তিনি। প্রিমিয়ার লিগ, বিপিএল এবং জাতীয় দলে তাঁর সঙ্গে খেলেছি। তিনি মাঠের ভেতরে সবাইকে উজ্জীবিত করতেন। একজন ব্যাটার কীভাবে নিজেকে প্রটেক্ট করে, সেগুলো শেয়ার করতেন। এভাবে করলে ওই ব্যাটারকে আউট করা যেতে পারে। তামিম ভাইয়ের সঙ্গে আমার ব্যক্তিগত সম্পর্ক খুব ভালো। এই সম্পর্ক খেলার বাইরে। যদিও মানুষ ব্যক্তিগত সম্পর্কের সঙ্গে খেলাকে মিলিয়ে ফেলে। তিনি আমাকে বাইরে যেভাবে ভালোবাসতেন, খেলার মাঠে সহযোগিতা করতেন বিভিন্নভাবে। 

সমকাল: নাজমুল হোসেন শান্ত টেস্ট অধিনায়ক হিসেবে কেমন?
তাইজুল:
শান্ত এখন অনেক পরিণত। ও অনেক কিছুই বোঝে। অধিনায়কত্ব করার জন্য যা যা থাকা দরকার, তার মধ্যে সেগুলো আছে। বেশি সমস্যা হলে ও নিজে থেকে এসে আমাদের সঙ্গে আলোচনা করে। আমরা কিছু দেখলে নিজেরাও বলে দেই। ও এমন অধিনায়ক না যে আমাদের কথা শোনে না। সিনিয়রদের সে সম্মান দেয়, বোঝাপড়াটাও অনেক ভালো। অধিনায়ক হিসেবে সে অসাধারণ। 

সমকাল: পাকিস্তানের বিপক্ষে স্পোর্টিং উইকেটে যেভাবে পারফর্ম করলেন, ম্যাচ জেতালেন, তাতে কি মনোবলটা আরও বেড়ে গেল?  
তাইজুল:
অবশ্যই আত্মবিশ্বাসের ব্যাপার থাকে। তারা একটা সময়ে জুটি গড়ে তুলেছিল। ৮০ ওভার একটা বল খেলা হয়। পুরোনো বলে একরকম, নতুন বলে অন্যরকম। বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন মোমেন্ট আসে। একটা সময়ে ওরা জুটি গড়ে তুলেছিল। আমরা তখন রক্ষণাত্মক হয়ে গিয়েছিলাম। ওই সময় তাড়াহুড়ো করলে রান বেশি হয়ে যেত। আবার নতুন বল পাওয়ার পর আক্রমণাত্মক হয়েছি। এই বিষয়গুলো অভিজ্ঞতা থেকে আসে। দুই বছর খেলেই এগুলো রপ্ত করতে পারবেন না। অভিজ্ঞতার মূল্যায়ন এই জায়গাতে। আসলে এভাবে জিনিসগুলো সেটেল হয়।  

সমকাল: পাকিস্তানকে হারাতে কেমল লাগল?
তাইজুল:
যে কোনো দলকে হারালে আনন্দ লাগে। সেখানে একটি বড় দলকে হারালে ভালো লাগে। আমরা তাদের ওখানে তাদের হারিয়েছি, আবার দেশেও হারালাম। আমরা খুব ভালো ফিল করেছি। 

সমকাল: এবার কি টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের সেরা পাঁচে থাকা সম্ভব?
তাইজুল:
ইনশাআল্লাহ। আমার মনে হয় এবার বেশ ভালো হবে। চার-পাঁচ এ থাকতে পারলে খুব ভালো হয়। 

সমকাল: আপনার পরে বাঁহাতি স্পিনার কে?
তাইজুল:
মন্তব্য করা কঠিন। খেলোয়াড়দের ক্যারিয়ার কখন কী হয় বলা যায় না। আমার কাছে মনে হয় হাসান মুরাদের সম্ভাবনা অনেক বেশি। একটি টেস্ট ম্যাচ খেলে ভালো করেছে সে। ঘরোয়া লিগেও খুব ভালো রেকর্ড তার। আমার কাছে তাকে ভালোই লাগে। তার অ্যাকশন থেকে শুরু করে মানসিকতা ভালো। আস্তে আস্তে ও একটা জায়গায় পৌঁছাবে ইনশাআল্লাহ। নাঈমও ভালো। ও যখন খেলে ভালো করে। 

সমকাল: সাত বছর খেলতে চান?
তাইজুল:
অবশ্যই খেলতে চাই। আল্লাহ যদি ভাগ্যে রাখে খেলতে পারব।  

সমকাল: আপনি ব্যাটিংটা কোথায় শিখলেন?
তাইজুল:
না না (হাসি), আমি যখন ক্যারিয়ার শুরু করি, তখন আরও ভালো ব্যাটিং করতে পারতাম। ব্যাটিং স্কিল অতটা ভালো না। মনের সাহস দিয়ে ব্যাটিং করি। টার্গেট করি ৩০ বা ৪০ রান করব, ৫০ থেকে ৬০ বল টিকে থাকব। আসলে মনের জোরে ব্যাটিং করি (হাসি)।

আরও পড়ুন

×