ঢাকা মঙ্গলবার, ১৬ জুন ২০২৬

আর্জেন্টিনার ‘ভালদানো’ যেভাবে হলেন ব্রাজিলের ‘জোসিমার’!

আর্জেন্টিনার ‘ভালদানো’ যেভাবে হলেন ব্রাজিলের ‘জোসিমার’!
×

স্পোর্টস ডেস্ক

প্রকাশ: ১৬ জুন ২০২৬ | ১৬:০৯

ফুটবল দুনিয়ায় তিনি এখন কোটি কোটি ভক্তের চোখের মণি। এক রাতের ‘ইনস্টাগ্রাম সেনসেশন’। স্পেনকে গোলশূন্য ড্রয়ে রুখে দিয়ে কেপ ভার্দেকে রূপকথা উপহার দেওয়া সেই ৪০ বছরের বুড়ো দেয়ালকে সবাই চেনেন ‘ভোজিনহা’ নামে। কিন্তু কজন জানেন, এই অতিমানবীয় গোলকিপারের জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে আছে দুই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী দেশ আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিলের এক অবিশ্বাস্য গল্প? কেপ ভার্দের রেজিস্ট্রি অফিসের কারণে তিনি আজ আর্জেন্টিনার ‘ভালদানো’ না হয়ে ব্রাজিলের ‘জোসিমার’ নামে বড় হয়েছেন! তার প্রকৃত নাম জোসিমার জোসে এভোরা দিয়াস।

ফিফাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ভোজিনহা জানিয়েছেন, তার নামের পেছনের সেই লাতিন আমেরিকান টানাপোড়েনের গল্প। তিনি বলেন, ‘ফুটবল বিশ্বে সবাই আমাকে ভোজিনহা নামে চেনে। কিন্তু আজ আমি হোর্হে ভালদানো এবং জোসিমারকে ধন্যবাদ জানাতে চাই, যারা আমার অস্তিত্বের পেছনে জড়িয়ে আছেন।’

গল্পের শুরু ১৯৮৬ মেক্সিকো বিশ্বকাপে। সেবার আর্জেন্টিনার জার্সিতে দুর্দান্ত খেলেছিলেন হোর্হে ভালদানো। ডিয়েগো ম্যারাডোনার সঙ্গে বিশ্বকাপজয়ী সেই দলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সদস্য ছিলেন তিনি। তার খেলায় মুগ্ধ হয়ে কেপ ভার্দের জে পেদ্রো নিজের নবজাতক সন্তানের নাম রাখতে চেয়েছিলেন ভালদানো।

বিশ্বকাপ শুরুর ঠিক আগে ফিফার পক্ষ থেকে খোদ ভালদানোর সঙ্গে যোগাযোগ করে এই গল্প শোনানো হয়। ৪০ বছর আগের এক ঘটনা শুনে স্রেফ তাজ্জব বনে যান এই আর্জেন্টাইন কিংবদন্তি। আবেগপ্রবণ হয়ে তিনি বলেন, ‘১৯৮৬ সালের বিশ্বকাপের ৪০ বছর পর, ২০২৬ বিশ্বকাপে আমি যেন ভোজিনহার মাধ্যমে মাঠে খেলছি! খবরটা শুনে প্রথমে একটু আকাশ থেকে পড়েছিলাম। ভাবছিলাম, ওর বাবা ম্যারাডোনাকে বাদ দিয়ে আমার নাম কেন বেছে নিলেন? তবে সত্যি বলতে, আমি ভীষণ গর্বিত। ভোজিনহা, তার বাবা এবং জোসিমারকে আমার পক্ষ থেকে উষ্ণ ভালোবাসা।’

ভালদানোর নাম তো ঠিক হয়েছিল, তবে গোলমালটা পাকাল কেপ ভার্দের রেজিস্ট্রি অফিসে। তৎকালীন সরকারি নিয়মানুযায়ী শিশুদের কোনো বিদেশি নাম রাখা নিষিদ্ধ ছিল। ফলে ‘ভালদানো’ নামটি বাতিল করে দেন রেজিস্ট্রি কর্মকর্তা। কিন্তু বাবা জে পেদ্রো তো দমবার পাত্র নন! আর্জেন্টিনা না হলে এবার তিনি নজর দিলেন চিরবৈরী ব্রাজিলে।

সেই বিশ্বকাপেই পোল্যান্ড ও নর্দান আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষে অবিশ্বাস্য দুই গোল করে ব্রাজিলের ‘জোসিমার’ তখন বিশ্ব মাতাচ্ছেন। কেপ ভার্দে যেহেতু পর্তুগিজ ভাষাভাষী দেশ, তাই ব্রাজিলের প্রতি তাদের টান একটু বেশিই। বাধ্য হয়ে পেদ্রো তার ছেলের অফিশিয়াল নাম রাখেন ‘জোসিমার দিয়াস’।

ভোজিনহার নামের গল্প এখানেই শেষ নয়।  শৈশবে মা কাজ করতেন, বাবা ছিলেন সামরিক বাহিনীতে। ফলে দাদা-দাদির কাছেই বড় হয়েছেন তিনি। টুইস্ট হলো, ভোজিনহার প্রয়াত দাদি সারাজীবন তার এই নাতিকে ‘দানি’ বলে ডেকে গেছেন। কারণ, বুড়ো বয়সে তার ‘ভালদানো’ উচ্চারণ করতে কষ্ট হতো!

দাদির সঙ্গে ভোজিনহা সম্পর্ক ছিল খুব আবেগের। পাড়ার বড় ছেলেদের সঙ্গে ফুটবল খেলতে গিয়ে প্রায়ই ধাক্কা খেতেন, মারও খেতেন। হার মানতে পারতেন না। রাগ করে বাড়ি ফিরে দাদির কাছে অভিযোগ করতেন। এটা দেখে পাড়ার দুষ্টু বন্ধুরা তাকে খ্যাপানোর জন্য পেছনে লেগে ডাকত, ‘ওই দ্যাখ, আবার ‘ভোজিনহা’র (দাদির) কাছে দৌড়াচ্ছে!’ বন্ধুদের দেওয়া সেই খ্যাপানো নামটাই একসময় তার পাকাপোক্ত ডাকনাম হয়ে যায়। 

স্পেনকে রুখে দেওয়ার পর এই ঐতিহাসিক রাতটি নিজের প্রয়াত দাদা-দাদিকে উৎসর্গ করেছেন ভোজিনহা। দুই বছর আগে দাদিকে হারিয়েছেন তিনি। কান্নাভেজা চোখে ভোজিনহা বলেন, ‘আমি আমার বাবা-মা ও দাদা-দাদির কাছে কৃতজ্ঞ, যারা আজ স্বর্গ থেকে আমার দিকে চেয়ে হাসছেন। তারা আজ বেঁচে থাকলে তাদের এই নাতিকে নিয়ে কতটা গর্ব করতেন, তা আমি জানি। এই স্বপ্ন কেপ ভার্দের মানুষ সারাজীবন দেখেছে।’

বিশ্বকাপের শুরুতে মাত্র ৫০ হাজার ফলোয়ার নিয়ে যাত্রা করা ভোজিনহা এখন লাখ লাখ মানুষের হৃদয়ে। বিশেষ করে ব্রাজিলের সমর্থকরাও এখন কেপ ভার্দের এই ‘জোসিমার’কে নিজেদের ঘরের ছেলে বানিয়ে নিয়েছেন।

আরও পড়ুন

×