আন্তর্জাতিক
ইরান-মার্কিন চুক্তি: বিজয়ের আড়ালে লুকিয়ে আছে আসল সত্য
মঞ্জুরে খোদা
প্রকাশ: ১৬ জুন ২০২৬ | ১৭:০০
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান– দুই পক্ষই দাবি করছে বিজয়ের। কিন্তু একই চুক্তিতে দুজন একসঙ্গে জিতে যাওয়া সম্ভব নয়। প্রকৃত সত্য লুকিয়ে আছে ৬০ দিনের মধ্যে এবং হয়তো একটি পরাশক্তির পতনের গল্পেও।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান একটি চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছে। কিন্তু এই চুক্তির প্রকৃত বিজয়ী কে, তা জানা যাবে ৬০ দিন পরে। আলোচনার টেবিল থেকে উঠে যাওয়ার পর দুই পক্ষই নিজেদের জনগণকে একই কথা বলেছে, ‘আমরাই জিতেছি।’ কিন্তু একই চুক্তিকে দুই পক্ষ একই সঙ্গে নিজেদের বিজয় হিসেবে উপস্থাপন করতে পারে না। এতেই স্পষ্ট হয়, সত্য লুকিয়ে আছে বক্তৃতায় নয় বরং চুক্তির সূক্ষ্ম শর্তগুলোর মধ্যে।
যুক্তরাষ্ট্র কী বলছে
ট্রাম্প ঘোষণা করেছেন যে তারা হরমুজ প্রণালি ফের উন্মুক্ত করতে বাধ্য করেছে এবং কোনো মূল্য ছাড়াই। নৌ অবরোধ তুলে নেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ যুক্তরাষ্ট্র তার জনগণকে এই বার্তা দিচ্ছে, ‘আমরা বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ খুলে দিতে বাধ্য করেছি। আমাদের দাবি মেনে নেওয়া হয়েছে। আমরা জয়ী হয়েছি।’
ইরান কী বলছে
ইরানের গণমাধ্যম সম্পূর্ণ ভিন্ন গল্প বলছে। তাদের দাবি, হরমুজ প্রণালি ৬০ দিনের জন্য উন্মুক্ত থাকবে, তারপর ইরান জাহাজ চলাচলের ওপর ফি আরোপ করবে। এর চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ: তারা বলছে যুক্তরাষ্ট্র কার্যত হরমুজ প্রণালির ওপর ইরানের সার্বভৌম কর্তৃত্ব স্বীকার করেছে। অর্থাৎ ইরানের বার্তা হলো, ‘আমরা বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথের নিয়ন্ত্রক হয়েছি। শিগগিরই এ পথে চলাচলকারী প্রতিটি তেলবাহী জাহাজ আমাদের অর্থ দেবে।’
‘এক পক্ষ বলছে বিনামূল্যে উন্মুক্ত। অন্য পক্ষ বলছে ৬০ দিন পর টোল। দুটো বক্তব্য একসঙ্গে সত্য হতে পারে না।’
৬০ দিনের ‘ফ্রি ট্রায়াল’
দুই পক্ষের এই বিপরীত দাবির মধ্যে একটাই সত্য: ৬১তম দিনে কী ঘটবে, সেটাই সব প্রশ্নের উত্তর দেবে।
পুরো বিষয়টাকে একটি ‘ফ্রি ট্রায়াল’-এর সঙ্গে তুলনা করা যায়। শুরুতে সবকিছু বিনামূল্যে থাকে। মানুষ স্বস্তি পায়, অভ্যস্ত হয়ে যায়, ভাবে– ‘দারুণ তো!’ তারপর একদিন প্রথম বিল আসে। এই মুহূর্তে হরমুজ প্রণালি ঠিক সেই পর্যায়ে রয়েছে। জাহাজ চলছে, তেল পরিবহন স্বাভাবিক, পৃথিবী স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলছে।
কিন্তু ৬১তম দিনে হরমুজে কি একটি ‘টোল বুথ’ দাঁড়িয়ে যাবে? যদি যায়, তাহলে যুক্তরাষ্ট্রের বিজয়ের গল্প কেবল ৬০ দিনের একটি শিরোনাম হয়ে থাকবে। আর যদি না যায়, তাহলে বলা যাবে তারা সত্যিই জিতেছে। তাই আজকের ঘোষণাগুলো চূড়ান্ত উত্তর দিতে পারছে না।
বিশ্ব অর্থনীতিতে প্রভাব
এটি কি শুধু দুটি দেশের মধ্যকার বিষয়? মোটেও নয়। বিশ্বের মোট তেল পরিবহনের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই প্রণালি দিয়ে অতিক্রম করে। যদি সেখানে পথচার্জ বা টোল চালু হয়, তাহলে ইতিহাসে প্রথমবারের মতো একটি দেশ বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের ওপর সরাসরি চলাচল ফি আদায় করবে।
আর সেই অর্থ শেষ পর্যন্ত কে বহন করবে? শুধু জাহাজ মালিকরা নয়, এই অতিরিক্ত ব্যয় ধাপে ধাপে পুরো অর্থনীতিতে ছড়িয়ে পড়বে। প্রথমে পরিবহন খরচ, তারপর তেলের দাম, তারপর পেট্রোল-ডিজেল, তারপর পণ্যবাহী যানবাহনের ভাড়া এবং শেষমেশ সুপারমার্কেটের তাকে রাখা এক টুকরো রুটির মূল্যেও। যে প্রণালির নাম হয়তো সাধারণ মানুষ কখনও শোনেইনি, তারই বোঝা বহন করবে রান্নাঘরের বাজেটে।
‘একটি পরাশক্তিকে টিকিয়ে রাখে শুধু সেনাবাহিনী বা অর্থ নয় বরং সেই বিশ্বাস যে, ওদের স্পর্শ করা যায় না।’
১৯৫৬ সালের ছায়া
এই যুদ্ধবিরতি চুক্তি একটি বড় প্রশ্ন সামনে এনে দিয়েছে: বিশ্ব কি আর আগের চোখে আমেরিকাকে দেখবে?
ইতিহাসে একবার এমন ঘটনা ঘটেছিল, ১৯৫৬ সালে। তখন বিশ্বের এক নম্বর শক্তি ছিল যুক্তরাজ্য। তাদের ক্ষমতার কেন্দ্র ছিল সুয়েজ খাল। মিসর সেটি জাতীয়করণ করল। ব্রিটেন পুনর্দখলের চেষ্টা করল, ব্যর্থ হলো এবং সরে গেল। সেদিন কোনো খালের মালিকানা নয়, পরিবর্তিত হয়েছিল একটি বিশ্বাস: ‘ব্রিটেন আর আগের মতো শক্তিশালী নয়।’
একবার এই ধারণা প্রতিষ্ঠিত হলে, বাকিটা নিজে থেকেই ঘটে। পাউন্ডের প্রতি আস্থা কমে গেল, মিত্ররা দূরে সরে যেতে লাগল, পুঁজি দেশ ছাড়তে শুরু করল। দুই শতাব্দীর একটি পরাশক্তি মাত্র বিশ বছরে তার বৈশ্বিক নেতৃত্ব হারিয়ে ফেলল। একটি খালের কারণে নয়– একটি ধারণার কারণে।
ডালিওর সতর্কবার্তা ও আজকের আমেরিকা
বিশ্বখ্যাত বিনিয়োগকারী রে ডালিও পাঁচশ বছরের সাম্রাজ্যের ইতিহাস বিশ্লেষণ করে লিখেছেন, ‘পরাশক্তিগুলো যখন অতিরিক্ত ঋণে জর্জরিত হয় এবং সামরিক ও আর্থিক নিয়ন্ত্রণ হারাতে থাকে, তখন তারা মিত্র ও ঋণদাতাদের আস্থাও হারাতে শুরু করে।’
আজকের আমেরিকার দিকে তাকিয়ে এই বাক্যটি পড়ুন। তাদের ঋণের পরিমাণ ৩৮ ট্রিলিয়ন ডলার; প্রতি চার ডলার কর রাজস্বের মধ্যে এক ডলার শুধু সুদ পরিশোধে চলে যায়। ভিয়েতনাম, আফগানিস্তান ও ইরাক, এই তিনটি যুদ্ধে তারা নিজেদের ক্লান্ত করেছে। আর এখন তারা বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রণালিকে একটি আঞ্চলিক শক্তির নিয়ন্ত্রণে রেখে চুক্তি সই করছে।
ডালিওর ফর্মুলায় তিনটি উপাদান: ঋণ, সামরিক নিয়ন্ত্রণ হারানো ও আস্থার ক্ষয়। প্রথম দুটি ইতোমধ্যে আছে। এখন বিশ্ব পরিমাপ করছে তৃতীয়টি, এবং সেই পরিমাপ করছে বন্ধু ও শত্রু উভয়ই।
তাইওয়ান যা জিজ্ঞেস করছে
সবচেয়ে জোরে এই প্রশ্ন করছে তাইওয়ান। কারণ তাইওয়ানের নিরাপত্তা একটি মাত্র বাক্যের ওপর দাঁড়িয়ে: ‘চীন যদি আক্রমণ করে, আমেরিকা আমাকে রক্ষা করবে।’ কিন্তু হরমুজে যে আমেরিকাকে দেখা গেছে, সেটি এমন এক আমেরিকা যে আলোচনার টেবিলে ছাড় দেয়।
তাইওয়ান তাই নিজেকে জিজ্ঞেস করছে: ‘চীন যদি সত্যিই আমার দরজায় আসে, এই দেশ কি আমার জন্য লড়বে, নাকি আরেকটি সমঝোতা করে আমাকে ছেড়ে দেবে?’
চুক্তি স্বাক্ষরে যুদ্ধ শেষ হবে। কিন্তু সেই একই স্বাক্ষর বিশ্বকে আরেকটি বার্তাও দেবে: আমেরিকা আর সব দরজা খোলা রাখতে সক্ষম নয়। একটি পরাশক্তির পতন কখনও পরাজিত যুদ্ধ দিয়ে শুরু হয় না। বরং তখনই শুরু হয়, যখন মানুষের মনে এই আস্থার সংকট ধারণাটি জন্ম নেয়।
ড. মঞ্জুরে খোদা: লেখক-গবেষক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক
- বিষয় :
- ইরান
