ঢাকা মঙ্গলবার, ১৬ জুন ২০২৬

উচ্চারণের বিপরীতে

আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও জবাবদিহিতা সংকট

আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও জবাবদিহিতা সংকট
×

মাহবুব আজীজ

মাহবুব আজীজ

প্রকাশ: ১৬ জুন ২০২৬ | ০৭:৩২ | আপডেট: ১৬ জুন ২০২৬ | ১৩:১০

| প্রিন্ট সংস্করণ

ঘরে, পথে, বাজারে, আলপথে, শস্যক্ষেতে কোথাও যেন নিরাপদ নয় মানুষের জীবন। পল্লবীর শিশুটি আপন গৃহেই নিরাপদ ছিল না। নিজের ঘরের তিন হাত দূরত্বে পাশের ফ্ল্যাটে তাকে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়েছে। পরিণত বয়স্ক নারী সোহেলী ইসলাম সোমা রোববার ভোরে কন্যাকে নিয়ে সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালের সামনে দিয়ে রিকশায় যাচ্ছিলেন। মোটরসাইকেল আরোহী ছিনতাইকারীরা তাঁর হাতের ব্যাগ ধরে হ্যাঁচকা টানা দেয়। রিকশা থেকে পড়ে গুরুতর আহত সোমা বৃহস্পতিবার মারা যান। শনিবার দিনদুপুরে চট্টগ্রামের রাউজানে আটোরিকশায় আসা দুর্বৃত্তের গুলিতে প্রাণ হারান যুবদল নেতা মাসুদ। সমকালের খবর– শনাক্ত পাঁচ অস্ত্রধারীর সবাই বিএনপি-সম্পৃক্ত।

গত ৭ জুন মতিঝিলে দিনদুপুরে এক ব্যক্তিকে গুলি করে ১৭ হাজার মার্কিন ডলার ছিনিয়ে নেয় দুর্বৃত্তরা। ৮ জুন মৌচাকের আনারকলি মার্কেটের সামনে ছুরিকাঘাতে নিহত হন স্বেচ্ছাসেবক দলের এক নেতা।
টিআইবির প্রতিবেদন অনুযায়ী, নতুন সরকারের প্রথম ১০০ দিনে খুন হয়েছেন ৬০৫ জন, ছিনতাইয়ের ঘটনা ২৮৪টি, অপহরণ ১৯৬টি এবং নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা প্রায় সাড়ে তিন হাজার। 
একেকটি অঘটন ঘটে; দু-চার দিন সংবাদমাধ্যম ও সামাজিক মাধ্যমে তোলপাড় হয়। তারপর মানুষ নতুন ঘটনার আবির্ভাবে পুরোনোটি ভুলে যায়। এভাবে নিরবচ্ছিন্ন বিস্মৃতির মধ্যে পড়ে যাচ্ছে সুশাসন ও জবাবদিহিতার জরুরি প্রসঙ্গটিও। অনির্বাচিত অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে আইনের শাসন ছিল অনুপস্থিত। বিশেষত মব সন্ত্রাসের মাধ্যমে সমাজে গভীর ক্ষত সৃষ্টি হয়। নির্বাচিত সরকারের যাত্রা শুরুর সঙ্গে সঙ্গে সব অপরাধ রাতারাতি উধাও হবে– এটি কেউ প্রত্যাশা করে না; তবে অপরাধ নিয়ন্ত্রণে সরকারের সক্রিয়তা ছিল ন্যূনতম প্রত্যাশা। সাম্প্রতিক একের পর এক অঘটনের প্রেক্ষিতে অপরাধের শিকড় সন্ধান ও কার্যকর প্রতিরোধের উপায় নিয়ে অবশ্যই সরকারকে মনোযোগ দিতে হবে।

২.
ক্রিকেটার নাঈম হাসানকে অহেতুক হেনস্তা ও মারধর করেছে কতিপয় পুলিশ সদস্য। জাতীয় দলের ক্রিকেটারের ক্ষেত্রেই যখন এই ঘটনা; সাধারণ মানুষের বেলায় কী ঘটতে পারে? নাঈমের ঘটনায় তোলপাড় শুরু হওয়ায় সঙ্গে সঙ্গে কয়েকজন পুলিশ সদস্য প্রত্যাহার হয়েছে; কিন্তু তারপর? এর ফলোআপ আদৌ হবে বলে পুরোনো ঘটনাবলি সাক্ষ্য দেয় না। অপরাধী শনাক্ত ও আইনের আওতায় এনে শাস্তি নিশ্চিত করবার ক্ষেত্রে একই ধরনের নির্বিকারত্ব দেখা যায়।

রাষ্ট্র বা সরকার যেন নাগরিকের জীবনের ন্যূনতম মূল্য দিতে ব্যর্থ হচ্ছে। সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালের সামনের রাস্তায় ছিনতাইকারীর হ্যাঁচকা টানে মুখ থুবড়ে পড়ার মতোই অপরাধীর হ্যাঁচকা টানে যেন রাজপথে মুখ থুবড়ে পড়ছে আইনশৃঙ্খলা।

যুক্তি দেওয়া হতে পারে, প্রত্যেক নাগরিকের নিরাপত্তা রাষ্ট্র কীভাবে দেবে? কে কখন কার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়বে, এটা নিয়ন্ত্রণ কীভাবে করা সম্ভব? কারও ওপর অন্যায়ভাবে ঝাঁপিয়ে পড়বার ঘটনা নিয়ন্ত্রণ করবার জন্যই তো আইনশৃঙ্খলা বাহিনী! এককালে রাস্তায় টহল পুলিশ দেখা যেত; আজকাল চোখে পড়ে না। 

যুক্তি দেওয়া হয়, অপরাধীদের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে পুলিশের লোকবল, নিরাপত্তা সামগ্রী, প্রযুক্তি সামর্থ্য ইত্যাদি কম বলে চারদিকে এ রকম রুগ্‌ণ নিরাপত্তা বলয়! রাষ্ট্রীয় বরাদ্দ অবশ্য অন্য কথা বলে। ২০২৬-২৭ অর্থবছরে পুলিশ, র‌্যাবসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জন্য বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে ৩৩ হাজার ৮২৪ কোটি টাকা, যা বর্তমান অর্থবছরের তুলনায় ২২১ কোটি টাকা বেশি। এই বরাদ্দ দিয়ে পুলিশ বাহিনী নাগরিকদের জন্য বাড়তি কোন ব্যবস্থা করতে যাচ্ছে, জাতি অবশ্য তা কখনোই জানতে পারবে না। মূল বিষয় আসলে জবাবদিহিতার অভাব। 

জাতীয় সংসদই হতে পারে উপযুক্ত জায়গা, যেখানে পুলিশ বাহিনীর পক্ষে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী নিয়মিত কার্যক্রম ও জবাবদিহিতার প্রসঙ্গটি জনগণকে জানাতে পারেন। গাড়ি, বাড়ি, শানশওকত নয়; সাধারণ মানুষের ন্যূনতম চাওয়া জীবনের নিরাপত্তা, রাতের নিশ্চিন্ত নিদ্রা। এটি কার্যকর করবার জন্য নিয়োজিত বাহিনীর সুশাসন, জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে সরকারকে।

৩.
ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দল অধিকাংশ ক্ষেত্রে নিজেদের আইনের ঊর্ধ্বে রাখতে চায়। বিগত কয়েক সরকারের আমলে আমাদের এমনই অভিজ্ঞতা। বাসস্ট্যান্ড, টেম্পোস্ট্যান্ড থেকে ছোট-বড় ক্লাব-সোসাইটি, বাজার-বিপণিবিতান সবকিছু ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীর নিয়ন্ত্রণে যাওয়াই যেন রেওয়াজ। এ থেকে চাঁদাবাজি এবং চাঁদাবাজি থেকে নেতৃত্বের অগণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া ও আন্তঃদলীয় কোন্দল মাথাচাড়া দেয়। এলাকাভিত্তিক দখলদারিত্বের পরিণতিতে একের পর এক হত্যাকাণ্ড পর্যন্ত কীভাবে ঘটতে পারে, চট্টগ্রামের রাউজান তার সর্বসাম্প্রতিক উদাহরণ। 
রাজনীতিতে দখলদারিত্বের প্রধান কারণ দলে আদর্শবাদী রাজনীতির অনুপস্থিতি। এক দল থেকে আরেক দলের কেবল নাম বা নেতা নয়; দলগত আদর্শ ও চেতনায়ও পার্থক্য থাকার কথা। কিন্তু বর্তমান প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে আদর্শের পার্থক্য কিংবা আধিপত্যবাদের মিল কতখানি, নিশ্চয়ই ভেবে দেখবার বিষয়। এই আদর্শহীন রাজনীতির কারণেই একের পর এক রাজনৈতিক সহিংসতা দৃশ্যমান। এই রাজনৈতিক অপরাধের রাশ সরকারকেই টেনে ধরতে হবে। এমন বার্তা দিতে হবে, চাঁদাবাজি বা দখলদারি– সে যে-ই করুক না কেন, আইনের চোখে প্রত্যেকেই সমান। সরকারের পক্ষ থেকে সুশাসনের এই প্রাথমিক পর্যায়ের অনুশীলন শুরু করতে পারলে রাজনৈতিক সহিংসতা অনেক কমে যাবে।

সাদাকে সাদা আর কালোকে কালো বলতে পারার সক্ষমতাই সমাজে নৈতিকতার বিজয় অবশ্যম্ভাবী করে তোলে। বিজয়ী দলের জন্য রাষ্ট্র ও সমাজের সবকিছু অপরিহার্য ও অবধারিত– এই গড্ডলিকা প্রবাহ থেকে বর্তমান সরকার বের হয়ে আসতে পারলে সমাজে অপরাধ কমে আসবে। প্রতিটি স্তরে গণতন্ত্র, আইনের শাসন ও জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠা করতে হবে। রাজনৈতিক দলের ভেতর নিয়মিত গণতন্ত্রের চর্চা সমাজে বহুমতের শৃঙ্খলা তৈরি করে সংঘর্ষ ও হানাহানি কমিয়ে আনবে। দলের নেতৃত্বের ক্ষেত্রে ধারাবাহিক ক্রম ও গণতান্ত্রিক শৃঙ্খলা আনতে হবে। নেতৃত্বের পারস্পরিক উপবলয় বহু বিশৃঙ্খলার মূলে। কাজেই ‘আমার’ ও ‘তার’ ধারণা থেকে বেরিয়ে দলীয় নেতৃত্ব ‘আমাদের’ ধারণায় কীভাবে পৌঁছুবেন, রাজনৈতিক দলের মূল নেতৃত্বকে সে চর্চা চালু করতে হবে। রাজনীতির ক্ষেত্রে এগুলো ন্যূনতম মৌলিক আচরণ। দেশের রাজনৈতিক শৃঙ্খলায় মৌলিক আচরণের অনুপস্থিতি কোন্দল ও সংঘর্ষের মূল কারণ।  

জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সরকারের প্রধান দায়িত্ব। সংকট কাটাতে হলে আত্মসমীক্ষা প্রয়োজন। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনয়ন ও এ থেকে উত্তরণের পথ তৈরিতে সরকারকে অতিদ্রুত আত্মসমীক্ষা ও সংশ্লিষ্ট সবাইকে জবাবদিহিতার আওতায় আনতেই হবে। এ ক্ষেত্রে যারা প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী, বিশেষত আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, তাদের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা গেলে দ্রুত সাফল্য মিলবে। মনে রাখতে হবে, কোনো অজুহাতই নাগরিকের অমূল্য জীবনের সমান হতে পারে না।

মাহবুব আজীজ: উপসম্পাদক, সমকাল ও সাহিত্যিক
[email protected]

আরও পড়ুন

×