৭০ শতাংশই গণিতে ব্যর্থ
শিক্ষার মানদণ্ড সমস্যা
সম্পাদকীয়
প্রকাশ: ১৬ জুন ২০২৬ | ০৭:২৭
| প্রিন্ট সংস্করণ
দেশের প্রাথমিক শিক্ষার গুণগত মান লইয়া যেই প্রশ্ন উঠিয়াছে, তাহা যথেষ্ট উদ্বেগজনক। রবিবার বাংলাদেশ সরকার, ইউনিসেফ এবং গ্লোবাল পার্টনারশিপ ফর এডুকেশন আয়োজিত এক কর্মশালায় বলা হইয়াছে, পঞ্চম শ্রেণি উত্তীর্ণ শিক্ষার্থীর বৃহৎ অংশই বাংলা ও গণিতের ন্যায় মৌলিক বিষয়ে নির্ধারিত দক্ষতা অর্জন করিতে পারিতেছে না। পঞ্চম শ্রেণির প্রায় ৫০ শতাংশ ও ৭০ শতাংশ শিক্ষার্থী যথাক্রমে বাংলা ও গণিতে শ্রেণি-উপযোগী ন্যূনতম যোগ্যতা অর্জন করিতে ব্যর্থ হইতেছে। উপরন্তু প্রাথমিক শিক্ষায় প্রায় সর্বজনীন ভর্তির দাবি করা হইলেও এখনও প্রায় ১০ লক্ষ শিশু এই স্তরে বিদ্যালয়ের বাহিরে রহিয়াছে এবং মাধ্যমিক স্তরে এই সংখ্যা ৩০ হইতে ৪০ লক্ষ। প্রতিবন্ধী শিশু, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর শিশু এবং দুর্গম ও প্রান্তিক শিশুরাই এহেন শিক্ষাবঞ্চনার সর্বাধিক ঝুঁকিতে রহিয়াছে।
উল্লিখিত তথ্যগুলি হইতে স্পষ্ট, দেশে বিশেষত প্রাথমিক স্তরে মানসম্মত শিক্ষা যদ্রূপ সোনার হরিণে রূপান্তরিত, তদ্রূপ ধনী-দরিদ্রের পাশাপাশি আঞ্চলিক বৈষম্যও এই স্তরে ব্যাপক। অথচ প্রাথমিক শিক্ষা হইল শিক্ষার ভিত্তি, যাহা দুর্বল থাকিলে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষাও অর্থহীন হইয়া পড়ে। সংশ্লিষ্ট
শিক্ষার্থীরা কোনোরূপ দক্ষতা তো অর্জন করেই না; শিক্ষার মধ্য দিয়া যেই সকল মানবিক ও সামাজিক মূল্যবোধ উহাদের ধারণ করিবার কথা, তাহাও পরিদৃষ্ট নহে। কালক্রমে কার্যত ঐ সকল শিক্ষার্থী পরিবার ও রাষ্ট্রের জন্য এক প্রকার বোঝাস্বরূপ।
এই সকল সমস্যার নেপথ্যে যেই সকল কারণ বিদ্যমান, তাহা অন্তত শিক্ষাসচেতন মানুষদের অজানা নহে। তদুপরি কর্মশালায় উঠিয়া আসা কারণগুলির সহিত সমাধানের ইঙ্গিতও সুস্পষ্ট। তথায় বলা হইয়াছে, শ্রেণিকক্ষে আনন্দদায়ক ও কার্যকর শিক্ষণ পদ্ধতির অভাব এবং পরীক্ষাকেন্দ্রিক মূল্যায়নের কারণে শিক্ষার্থীরা মুখস্থবিদ্যার উপর নির্ভরশীল হইয়া পড়িতেছে। কর্মশালায় উপস্থিত বিজ্ঞজনদের মতে, বিদ্যমান এই শিক্ষণ পদ্ধতির কারণে শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিশ্লেষণমূলক চিন্তা, সমস্যা সমাধান এবং বাস্তব জীবনে অর্জিত জ্ঞান প্রয়োগের সক্ষমতা গড়িয়া উঠিতেছে না।
আমরা জানি, বিগত সময়ে শিক্ষা খাতে রাষ্ট্রের তরফে নানাবিধ পদক্ষেপ দেখা গিয়াছে। একদিকে প্রায় সমগ্র প্রাথমিক শিক্ষা জাতীয়করণ করা হইয়াছে, যাহার ফলে অবকাঠামো বিস্তারের পাশাপাশি শিক্ষক ও শিক্ষাকর্মীদের বেতন-ভাতার অনিশ্চয়তাও দূর হইয়াছে। বিনামূল্যে পাঠ্যপুস্তক পাইবার কারণে এবং টিউশন ফি দিতে হয় না বলিয়া সংশ্লিষ্ট অভিভাবকগণেরও অনেক স্বস্তির কারণ ঘটিয়াছে। কিন্তু মূল জায়গা তথা শিক্ষণ পদ্ধতি, মূল্যায়ন, সর্বোপরি উপযুক্ত নজরদারিতে যখন ঘাটতি থাকে তখন সকলই গরল ভেল! বাস্তবে ইহাই ঘটিয়াছে দেশের প্রাথমিক শিক্ষায়। উপরন্তু সমস্যা চিহ্নিত হইবার কারণে বর্তমান শিক্ষা কর্তৃপক্ষের পক্ষে সমস্যা নিরসনও সহজ হইতে পারে। অবশ্য তজ্জন্য সরকারকে পূর্বসূরির ব্যর্থতার কথা বারংবার না বলিয়া বিদ্যমান সমস্যা সমাধানে আন্তরিক হওয়া বাঞ্ছনীয়।
এই ক্ষেত্রে সরকারকে প্রথমেই দেশের স্বীকৃত শিক্ষাবিদসহ অংশীজনদের মতামত শুনিতে হইবে। তাহাদের পরামর্শের ভিত্তিতে শিক্ষার লক্ষ্য নির্ধারণ করিতে হইবে, যাহাতে শিক্ষার্থীই শুধু নহে, তৎসহিত অভিভাবকের মধ্যেও জিপিএ ৫ অর্জনের প্রতিযোগিতায় মাতিয়া উঠিবার বাসনা তিরোহিত হয়। প্রয়োজনে শিক্ষকদের যথাযথ প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করিয়া তাহাদের অভাব-অভিযোগ বিষয়েও দ্রুত পদক্ষেপ লইতে হইবে। নজরদারি নিশ্চিত করিয়া সমগ্র শিক্ষা কার্যক্রমকে জবাবদিহির আওতায় আনাও গুরুত্বপূর্ণ। স্মরণে রাখিতে হইবে, প্রত্যেক শিশুই অমিত সম্ভাবনার ধারক। উপযুক্ত পরিচর্যার মধ্য দিয়া যাহার বিকাশ ঘটাইতে পারিলে শুধু দক্ষ জনবল নহে, টেকসই উন্নয়নও নিশ্চিত করা সম্ভব।
- বিষয় :
- সম্পাদকীয়
