ঢাকা মঙ্গলবার, ১৬ জুন ২০২৬

ভূমি ব্যবস্থাপনা

এক প্লট, দুই মৌজা, তিন দাগ

এক প্লট, দুই মৌজা, তিন দাগ
×

আ ক ম সাইফুল ইসলাম চৌধুরী

আ ক ম সাইফুল ইসলাম চৌধুরী

প্রকাশ: ১৬ জুন ২০২৬ | ০৭:২৮

| প্রিন্ট সংস্করণ

একজন সরকারি কর্মচারী দুই যুগ আগে পাঁচ কাঠার প্লট বরাদ্দ পেয়েছিলেন উত্তরা মডেল টাউনের সম্প্রসারিত অংশে। তিনি চাকরিজীবনে ঢাকার পাশের ডিসি ছিলেন। তাঁর জীবনের ব্রতই কোনো কলুষতায় জড়িত না হওয়া। তাঁর সঙ্গে বরাদ্দপ্রাপ্ত অনেকের বাড়ি যখন পুরোনো হয়ে গেছে, তখনও তিনি শোধ করছেন জমির কিস্তি। সব কিস্তি পরিশোধের পর সন্তুষ্ট হয়ে রাজউক রেজিস্ট্রি দলিল সম্পাদন করে দিলে ভদ্রলোক জোরে এক নিঃশ্বাস ছাড়লেন। পৌনে শতক বয়সে কাজ শেষ করার তাড়াও প্রবল। ইত্যবসরে জুটিয়ে ফেললেন ডেভেলপার। মুখে তৃপ্তির হাসি– শেষ জীবনে সচ্ছলতা এই এলো বলে।

নামজারির জন্য আবেদন করতে হলো; উত্তরা সার্কেলে নয়, মিরপুর সার্কেলে। সহকারী কমিশনার (ভূমি) জানালেন, প্লটটি দুই মৌজার তিন দাগের মধ্যে পড়েছে। অস্বাভাবিক নয়; ক্রেতা জমির মালিকের কাছ থেকে হয় পুরো দাগ বা দাগের কিছু অংশ কিনে থাকেন। একাধিক দাগেরও পূর্ণ অংশ কিনতে পারেন। রাজউক বা জাতীয় গৃহায়ন সংস্থা বা রিয়াল এস্টেট কোম্পানি কোথায়ও আবাসিক এলাকা গড়ে তুললে সেখানে ভূমি রেকর্ড ও জরিপ অধিদপ্তরের সৃজিত দাগের ভিত্তিতে প্লট বরাদ্দ সম্ভব নয়। তারা এক বা একাধিক মৌজা ও দাগের অধিগ্রহণকৃত বা ক্রয়কৃত জমিকে বিভিন্ন আকারের প্লটে বিভক্ত করে। ফলে এক বা একাধিক দাগের কিছু অংশ নিয়ে প্লট হতেই পারে। একাধিক মৌজার একাধিক দাগের অংশ নিয়েও তৈরি হতে পারে।

যেমন পূর্বাচল গঠিত হয়েছিল ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ ও গাজীপুর জেলার কিছু কিছু অংশ নিয়ে। অনেক মানুষের প্লট পড়েছিল দুই জেলার ভেতর। কমপক্ষে একজনের প্লট ছিল তিন জেলার সমন্বয়ে। সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জের অংশটুকুসহ গোটা পূর্বাচলকে ঢাকা জেলাভুক্ত এবং প্রকল্পকে উত্তর সিটি করপোরেশনে অন্তর্ভুক্তির মাধ্যমে হাজারো সমস্যার সমাধান সহজ করে দিয়েছেন।
আলোচিত ভদ্রলোক রাজউকের প্লটের দলিল পেয়ে প্রকৃত অর্থে হাতে পেয়েছেন একটি জ্বলন্ত কয়লার টুকরা। সহকারী কমিশনার (ভূমি) যখন জানালেন, তাঁর জমি দুই মৌজায় এবং দুই সহকারী কমিশনারের (ভূমি) অধিক্ষেত্রে, তখন তিনি ছুটলেন রাজউকে। রাজউক যে দলিল সম্পাদন করে দিয়েছে, তাতে মৌজার উল্লেখ আছে শুধু দিয়াবাড়ী ও একটি দাগ। এবার রাজউকে দৌড়াদৌড়ি করার পর ১৯ পিপে নস্যি উজাড় শেষে রাজউক সনদ দিল, তাঁর জমি মিরপুর থানার দিয়াবাড়ী মৌজার এক দাগে, আর সাভার থানার দেউল মৌজার দুই দাগে বিস্তৃত। তবে ১৯ পিপে নস্যি পরিমাণে কম হওয়ায় রাজউক আর বাড়তি কষ্টটা করতে চায়নি। চিঠিতে উল্লেখ করেনি কোন দাগে তাঁর কতটুকু জমি। ফলে ভূমি অফিসে নামজারি হয় না। ডেভেলপার চলে গেলেন এই বলে যে, ভবিষ্যতে ফ্ল্যাট বিক্রি করতে হলেও দুই সহকারী কমিশনার অফিসে দৌড়াতে হবে। আমি এত ভেজালে যাব না।

ডেভেলপার ভেজালে না গেলেও সাবেক যুগ্ম সচিবকে এই ভেজাল পোহাতে হচ্ছে। অতীতে তাঁর মোবাইল ফোনের সিম জটিলতায় ‘সিম গেল তো জমিও গেল’ নিবন্ধ লেখায় সিনিয়র ভূমি সচিব তুরন্ত সিদ্ধান্ত নিয়ে সিম পাল্টানোর ব্যবস্থা করেছেন। তাঁর ধারণা, আমি কোনো নিদান দেব। আমি তাঁকে কী পরামর্শ দেব? ব্যক্তি হিসেবে তিনি যা করতে পারেন তা হলো, রাজউকে ধরনা দিয়ে রেজিস্ট্রি দলিল সংশোধন। সংশোধিত দলিলে দুই মৌজার তিন দাগের প্রতিটি থেকে কতটুকু করে জমি তাঁর প্লটে এসেছে, সেটির উল্লেখ থাকতে হবে। এই পরামর্শটুকু বলতে বা পড়তে এক মিনিট সময় না লাগলেও বাস্তবায়ন করতে একজনমে সম্ভব কিনা, জানি না। 

এই ভোগান্তির সিস্টেমগুলো বজায় রেখে দুর্নীতির ধারাবাহিক চেইন তৈরি করে রাখা হয়। ভাবখানা এই, শতবর্ষ পরের কর্মচারীও যেন এখান থেকে কিছু করেকম্মে খেতে পারেন; পূর্বসূরিদের প্রতি কৃতজ্ঞ থাকেন। ভদ্রলোকের পক্ষে রাজউককে টলানোর সাধ্য নেই। একটু চালাক-চতুর হলে ধরতে পারতেন দালাল। এক যুগের কাজ সমাধা হয়ে যেত এক লহমায়। তাঁর সততা তাঁকে দালালের কাছেও যেতে দেবে না।

তাহলে উপায়? রাজউকের উচিত ছিল উত্তরা সম্প্রসারণের জন্য অধিগ্রহণকৃত জমি উত্তরা থানাভুক্ত করা। কিন্তু এই ঔচিত্যের কথা কে বলবে! রাজউক ভেবে নেয়, অধিগ্রহণ করে ভূমির উন্নয়ন ঘটিয়ে প্লট করে বরাদ্দ দিয়েই দায় শেষ। ভূমি মন্ত্রণালয় শের শাহের আমলের ভূমি জরিপ ব্যবস্থাপনাকে আঁকড়ে ধরে আছে। আর এই অভাগা দেশে সবকিছুতেই চাই সরকারপ্রধানের মনোবাঞ্ছা। 
এখন উত্তরা মডেল টাউনের নামে অধিগ্রহণ করা সব জমি উত্তরা ভূমি অফিসের আওতায় এনে দলিলে বর্ণিত প্লট অনুসারে নামজারি করা যেতে পারে। সরকারপ্রধান চাইলে এটা হতে পারে এবং এক মাসের মধ্যে কয়েক হাজার সমস্যার সমাধান হবে। তখন ভূমি মন্ত্রণালয় আর রাজউক বলবে, আমরাও এমনটি আগেই ভেবেছিলাম! এ ছাড়া রাজউক আর জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের বরাদ্দকৃত প্লটধারীদের সহজ কোনো নিদান নেই।

যতদিন এই ব্যবস্থা না করা যাবে ততদিন বরাদ্দ প্রাপকের স্বস্তি নেই। নামজারি না হলে ভূমি উন্নয়ন কর দেওয়া যাবে না। ভূমি উন্নয়ন কর দীর্ঘমেয়াদি বকেয়া হলে জমি খাস হয়ে যাবে। তাই এ তো জমি বরাদ্দ পাওয়া নয়, রীতিমতো যমকে নিমন্ত্রণ করে ঘাড়ে তোলা। এখন না ছাড়া যায় জমি, না যমের টানাটানি। অতএব ত্রাণকর্তা সহায় হোন– এই প্রার্থনা হাজার হাজার ভুক্তভোগীর।

আ ক ম সাইফুল ইসলাম চৌধুরী: অবসরপ্রাপ্ত অতিরিক্ত সচিব

আরও পড়ুন

×