সমকালীন প্রসঙ্গ
বাজেট বেসরকারি খাতের সংকোচন ও মূল্যস্ফীতি
সাইফুল হোসেন
প্রকাশ: ১৬ জুন ২০২৬ | ১৩:০০
২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য উত্থাপিত ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার প্রস্তাবিত বাজেটটি দেশের অর্থনৈতিক ইতিহাসে একটি বড় ধরনের মনস্তাত্ত্বিক ও কাঠামোগত দ্বন্দ্বের বহিঃপ্রকাশ। আপাতদৃষ্টিতে এই বাজেটকে ‘অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার ও রাজনৈতিক অঙ্গীকারের মেলবন্ধন’ হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করা হলেও এর ভেতরের অর্থনৈতিক সমীকরণগুলো অত্যন্ত জটিল ও ঝুঁকিপূর্ণ। বিশেষ করে পেশাগত অর্থনীতিবিদ, ব্যবসায়ী ও সমাজের সচেতন অংশ মনে করে– এই বাজেট বাস্তবায়ন করতে গিয়ে সরকার মূলত বেসরকারি খাতকে সংকুচিত করার এবং মূল্যস্ফীতিকে আরও উস্কে দেওয়ার পথে হাঁটছে।
বাজেটের আকার বাড়লেও সরকারের নিজস্ব সম্পদ সংগ্রহের সক্ষমতা এখনও তলানিতে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসের একটি পরিসংখ্যান দিলেই বিষয়টি স্পষ্ট হবে– সে সময় এনবিআরের শুল্ক-কর আদায়ের লক্ষ্য ছিল চার লাখ ৩১ হাজার ৪৬১ কোটি টাকা, কিন্তু আদায় হয়েছে মাত্র তিন লাখ ২৬ হাজার ৯২৮ কোটি টাকা। অর্থাৎ অর্থবছরের শেষ দিকে এসে ঘাটতি এক লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে।
এই বিশাল ঘাটতি মেটাতে আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরে সরকারকে দুই দিকে হাত বাড়াতে হচ্ছে: বৈদেশিক ঋণ ও অভ্যন্তরীণ ঋণ। বাজেটে বিদেশ থেকে ৯৫০ কোটি ডলার ঋণ সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে, যা মূলত ‘প্রকল্প সহায়তা’ নয়, বরং ‘বাজেট সহায়তা’। আইএমএফ বা বিশ্বব্যাংকের মতো সংস্থা থেকে এই বাজেট সহায়তা পেতে গেলে জ্বালানি, ব্যাংকিং, রাজস্ব এবং প্রশাসনিক খাতে কঠোর প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের শর্ত পূরণ করতে হবে। বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এক বছরের মধ্যে এই ধরনের গভীর সংস্কার বাস্তবায়ন করা সরকারের পক্ষে অত্যন্ত কঠিন।
যখন বিদেশি ঋণ পাওয়া অনিশ্চিত হয়ে পড়বে, তখন বাজেট টিকিয়ে রাখতে সরকারকে বাধ্য হয়ে দেশীয় উৎস, বিশেষ করে দেশের ব্যাংকিং খাত থেকে প্রত্যাশার চেয়ে বিপুল পরিমাণ ঋণ নিতে হবে। সরকার যখন ব্যাংক থেকে দেদার টাকা ধার করবে, তখন বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর কাছে বেসরকারি খাতে দেওয়ার মতো পর্যাপ্ত তহবিল থাকবে না। ফলে তৈরি হবে ‘ক্রাউডিং আউট’ ইফেক্ট। বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ সংকুচিত হলে নতুন শিল্পকারখানা স্থাপন ও ব্যবসা-বাণিজ্যের সম্প্রসারণ থমকে যাবে।
বাজারে তরল অর্থের সংকট এবং সরকারের উচ্চ ঋণ চাহিদার কারণে ব্যাংকগুলোর পক্ষে সুদের হার কমানো কোনোভাবেই সম্ভব হবে না। উচ্চ সুদের হারের কারণে বেসরকারি উদ্যোক্তাদের বিনিয়োগের খরচও বহুগুণ বেড়ে যাবে।
বাজেটের ফলে বিনিয়োগের ধীরগতি ও কর্মসংস্থান হ্রাস পাওয়ার আশঙ্কা আছে। বিগত কয়েক বছরের তুলনায় দেশের সামগ্রিক বিনিয়োগ পরিস্থিতি এমনিতেই আশঙ্কাজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এমসিসিআইর তথ্যমতে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে মোট বিনিয়োগ জিডিপির মাত্র ২৭.৯৩ শতাংশে নেমে এসেছে, যা গত এক দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় ধাক্কা খেয়েছে বেসরকারি খাত, যেখানে বিনিয়োগ জিডিপির ২১.৫৩ শতাংশে এসে স্থবির ও সংকুচিত হয়ে পড়েছে। অথচ এই প্রতিকূলতার মাঝেই প্রস্তাবিত বাজেটের প্রবৃদ্ধি কাঠামোতে বেসরকারি বিনিয়োগের চেয়ে সরকারি বিনিয়োগ বৃদ্ধির ওপর বেশি ভরসা করা হয়েছে।
বাস্তবতা হলো, দেশের সরকারি বিনিয়োগের মূল চালিকাশক্তি বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) বাস্তবায়নের সক্ষমতা তীব্র সংকটে। বিদায়ী ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসে (জুলাই-এপ্রিল) এডিপি বাস্তবায়নের হার ছিল মাত্র ৪১.৪১ শতাংশ, যেখানে সরকারি বিনিয়োগের লক্ষ্য ছিল জিডিপির ৬.৪০ শতাংশ। এই ধরনের দুর্বল বাস্তবায়ন সক্ষমতা নিয়ে কেবল সরকারি বিনিয়োগের ওপর ভর করে জিডিপি প্রবৃদ্ধি টেনে তোলার চেষ্টা একটি অলীক আশাবাদ বলেই মনে হয়।
ব্যাংক থেকে সরকারের অতিরিক্ত ঋণ নেওয়ার ফলে তৈরি হওয়া বেসরকারি খাতের ঋণ সংকোচন এবং বিনিয়োগের এই ধীরগতির প্রত্যক্ষ নেতিবাচক প্রভাব পড়বে সরাসরি কর্মসংস্থানে। নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি না হলে এবং কলকারখানার উৎপাদন কমে গেলে দেশের সামগ্রিক দারিদ্র্য বিমোচন কর্মসূচি বড় ধরনের ধাক্কা খাবে।
বর্তমানে দেশে মূল্যস্ফীতির হার ১০ শতাংশের কাছাকাছি (ডাবল ডিজিট)। অথচ প্রস্তাবিত বাজেটে অবাস্তবভাবে মূল্যস্ফীতিকে ৭.৫ শতাংশ (এবং প্রবৃদ্ধি ৬.৫ শতাংশ) নামিয়ে আনার লক্ষ্য ঠিক করা হয়েছে। এই লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের কোনো সুনির্দিষ্ট ও কার্যকর পথরেখা বাজেটে নেই।
ভ্যাটের ওপর অতিনির্ভরতা: ২০২৬-২৭ অর্থবছরে মোট ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকার বিশাল রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে (যা বিদায়ী বছরের চেয়ে ১৮.২% বেশি)। এর একটি বড় অংশই আসবে ভ্যাট বা পরোক্ষ কর থেকে।
বাজেটে ব্যক্তিশ্রেণির করদাতাদের করমুক্ত আয়সীমা বাড়ানো হয়নি, উল্টো ভ্যাটের পরিধি বাড়ানো হয়েছে। পরোক্ষ করের এই নীতি ধনী-দরিদ্র নির্বিশেষে সবার ওপর সমানভাবে প্রযোজ্য হয়। ফলে একদিকে সরকার সামাজিক সুরক্ষার (যেমন ফ্যামিলি কার্ড বা কৃষক কার্ড) মাধ্যমে যে টাকা দরিদ্র মানুষকে দিচ্ছে, বাজারে পণ্য কিনতে গিয়ে ভ্যাটের মাধ্যমে সেই টাকা আবার তুলে নিচ্ছে। এটি মূল্যস্ফীতির আগুনে ঘি ঢালবে।
মাত্র ১৫ শতাংশ কর দিয়ে কালো টাকা সাদা করার যে ঢালাও সুযোগ দেওয়া হয়েছে, তা বৈধ ও নিয়মিত করদাতাদের নিরুৎসাহিত করবে এবং বাজারে অনুৎপাদক পুঁজির প্রবাহ বাড়িয়ে মূল্যস্ফীতিকে আরও উস্কে দেবে।
বাজেটে কিছু করপোরেট কর (২.৫%) কমানো হলেও তার সঙ্গে ব্যাংকিং চ্যানেলে লেনদেনের কঠোর শর্ত জুড়ে দেওয়া হয়েছে। অথচ বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রায় ৮০ শতাংশ এখনও অপ্রাতিষ্ঠানিক। ফলে এই শর্তের কারণে সিংহভাগ কোম্পানিই কর ছাড়ের সুবিধা পাবে না। একই সঙ্গে লাভ-ক্ষতি বিবেচনা না করে ন্যূনতম টার্নওভার কর বহাল রাখায় ব্যবসার নগদ প্রবাহ ভয়াবহভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, সামষ্টিক অর্থনৈতিক কাঠামোর পাদটীকায় বলা হয়েছে–মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধবিগ্রহের প্রভাব এই প্রাক্কলনে বিবেচনা করা হয়নি। অর্থাৎ আন্তর্জাতিক বাস্তবতা ও দেশের ভেতরের অর্থনীতির সূচকগুলোর (রপ্তানি ও রেমিট্যান্সের ধীরগতি) সাম্প্রতিকতম তথ্য হালনাগাদ না করেই এক ধরনের ‘সৃজনশীল তথ্য-উপাত্ত’ দিয়ে বিদায়ী বছরের মাঝামাঝি সময়ের সঙ্গে তুলনা করে এই আশাবাদী বাজেট সাজানো হয়েছে।
২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটটি মূলত বাস্তবতাকে আড়াল করে রাজনৈতিক আশাবাদকে জয়ী করার একটি চেষ্টা। যদি তথ্যের এই অস্বচ্ছতা বজায় থাকে এবং তিন মাস পরপর বাজেট বাস্তবায়নের কঠোর ও জবাবদিহিমূলক মূল্যায়ন না করা হয়, তবে এই বাজেট দেশের অর্থনীতির সংকট আরও গভীর করবে।
সরকার যদি ঋণ পরিশোধ, মূল্যস্ফীতি এবং বাজেট ঘাটতির এই ত্রিমুখী চাপ সামলাতে না পেরে দেদার ব্যাংক থেকে টাকা নিতে থাকে, তবে বেসরকারি খাত সংকুচিত হতে হতে পিঠ দেয়ালে ঠেকে যাবে। শিল্পায়ন থমকে যাবে, উৎপাদন কমবে এবং কর্মসংস্থান সংকুচিত হবে– যা কোনোভাবেই একটি উন্নয়নশীল অর্থনীতির কাম্য হতে পারে না। এখনও সময় আছে, বাজেট পাসের আগে এই ঘাটতি অর্থায়নের উৎস এবং বেসরকারি খাতের সুরক্ষার বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করা জরুরি।
সাইফুল হোসেন: অর্থনীতি বিশ্লেষক, ফাইন্যান্স ও বিজনেস স্ট্র্যাটেজিস্ট
- বিষয় :
- বাজেট
