ঢাকা মঙ্গলবার, ১৬ জুন ২০২৬

দুর্যোগ প্রস্তুতি

আসন্ন বর্ষায় শিশু শিক্ষার চ্যালেঞ্জ

আসন্ন বর্ষায় শিশু শিক্ষার চ্যালেঞ্জ
×

দীপু মাহমুদ

দীপু মাহমুদ

প্রকাশ: ১৬ জুন ২০২৬ | ০৭:৩০ | আপডেট: ১৬ জুন ২০২৬ | ০৭:৩১

| প্রিন্ট সংস্করণ

শিশুর শেখা নিয়মিত অনুশীলন ও ধারাবাহিক অংশগ্রহণের ওপর নির্ভরশীল। তাই শিক্ষাজীবনে দীর্ঘ বা ঘন ঘন বিরতি তাদের শেখার গতি ও দক্ষতা অর্জনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। দেশের অনেক অঞ্চলে বর্ষা মৌসুমে বন্যা, জলাবদ্ধতা ও যোগাযোগ সংকটের কারণে বিদ্যালয়ের স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হয়। এর বেশি প্রভাব পড়ে প্রাথমিক স্তরের শিক্ষার্থীদের ওপর। কারণ এই বয়সে শিশুরা শুধু তথ্য শেখে না; তারা ভাষা, গণনা, মনোযোগ ও আচরণগত ভিত্তি গড়ে তোলে। এই ভিত্তি বারবার বিচ্ছিন্ন হলে পরবর্তী শিক্ষাজীবনে তার প্রভাব হয় দীর্ঘস্থায়ী। বর্ষাকাল শুরু হয়ে যাচ্ছে। প্রতিবছরের মতো এবারও বর্ষায় শিশুদের শিক্ষা কার্যক্রম ঝুঁকিতে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

বাংলাদেশে প্রাথমিক স্তরের অনেক শিশু ইতোমধ্যে ‘লার্নিং লস’ বা শিখন ঘাটতির ঝুঁকিতে আছে। ইউনিসেফ ও বিভিন্ন শিক্ষা গবেষণার পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, দেশে ১০ বছরের নিচের বড় অংশের শিশু বয়স অনুযায়ী পড়া ও গণিত দক্ষতায় পিছিয়ে। এ অবস্থায় যদি বর্ষা মৌসুমে টানা কয়েক সপ্তাহ স্কুল বন্ধ থাকে, তবে সেই ঘাটতি আরও গভীর হয়ে যায়। শিশুর জন্য দুই-তিন সপ্তাহের বিরতি অনেক সময় শেখার গতি ফিরে পেতে দীর্ঘ সময় নেয়। বিশেষ করে যদি পরিবারে পড়াশোনার সহায়ক পরিবেশ না থাকে।

হাওর ও নদীবেষ্টিত চর এলাকার পরিস্থিতি আরও জটিল। বর্ষার সময় যোগাযোগ ব্যবস্থা প্রায় ভেঙে পড়ে। অনেক ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়ে পৌঁছানোই অসম্ভব হয়ে যায়। শিক্ষকরা উপস্থিত থাকলেও শিক্ষার্থী অনুপস্থিত থাকে। ফলে শ্রেণিকক্ষ কার্যত অচল হয়ে পড়ে। কিছু এলাকায় বিদ্যালয় ভবনকে আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করা হয়, যা স্বাভাবিক শিক্ষা কার্যক্রমকে সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করে দেয়।
অন্যদিকে শহরাঞ্চলেও বর্ষার প্রভাব কম নয়। বড় শহরগুলোতে জলাবদ্ধতা, যানজট এবং স্বাস্থ্যঝুঁকির কারণে অভিভাবকরা অনেক সময় শিশুদের স্কুলে পাঠাতে অনিচ্ছুক। বিশেষ করে প্রাথমিক শ্রেণির শিশুদের ক্ষেত্রে নিরাপত্তার বিষয়টি বড় হয়ে ওঠে। ফলে বিদ্যালয়ে উপস্থিতি কমে যায় এবং শিক্ষার গতি ব্যাহত হয়।

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, দুর্যোগকালে বিশেষ করে বন্যা ও অতিবৃষ্টির সময় দেশের কিছু অঞ্চলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান টানা কয়েক দিন থেকে কয়েক সপ্তাহ পর্যন্ত বন্ধ রাখতে হয়। এই ‘অনিয়মিত বিরতি’ দীর্ঘ মেয়াদে পাঠ্যক্রম সম্পন্ন করার ওপর চাপ সৃষ্টি করে। অনেক সময় শিক্ষকরা সিলেবাস শেষ করতে তাড়াহুড়া করেন, যা শিক্ষার গুণগত মানকে প্রভাবিত করে।
আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই শিক্ষা- বিচ্ছিন্নতা কেবল একাডেমিক ক্ষতি নয়। এটা শিশুদের অভ্যাস, শৃঙ্খলা ও শেখার আগ্রহের ওপরেও প্রভাব ফেলে। নিয়মিত স্কুলে না গেলে শিশুরা পড়াশোনার প্রতি মনোযোগ হারাতে শুরু করে। বিশেষ করে দরিদ্র পরিবারের শিশুরা এই সময়ের মধ্যে শ্রমে যুক্ত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়ে, যা তাদের স্থায়ীভাবে শিক্ষাব্যবস্থা থেকে বিচ্ছিন্ন করতে পারে।

এভাবে বর্ষা মৌসুমে শিক্ষার ধারাবাহিকতা ভাঙা শুধু একটি মৌসুমি সমস্যা নয়। এটা একটি কাঠামোগত শিক্ষাঝুঁকি, যার  পুনরাবৃত্তি হয় প্রতিবছর এবং ধীরে ধীরে শিক্ষার মান ও সমতা উভয়কেই প্রভাবিত করে।

বর্ষার প্রভাব বাংলাদেশে সমান নয়। নদীবেষ্টিত চর ও হাওরাঞ্চলে এর প্রভাব অনেক তীব্র। হাওরাঞ্চলে বর্ষায় কোথাও পুরো এলাকা পানিতে ডুবে যায়। তখন বিদ্যালয়গুলো কার্যত বিচ্ছিন্ন দ্বীপে পরিণত হয়। শিক্ষার্থীরা নৌকা বা ঝুঁকিপূর্ণ পথে যাতায়াত করে, যা আবার কখনও সম্ভব হয় না। শহরাঞ্চলেও সমস্যা কম নয়। তবুও এই বর্ষা মৌসুমে স্থানীয় পর্যায়ে বিদ্যালয়ে পাঠদানের সময় ও শিক্ষার্থী উপস্থিতি বিবেচনায় অঞ্চলভিত্তিক শিক্ষা বৈষম্য তৈরি হয়। এই বৈষম্য দেখায় যে শিক্ষাব্যবস্থায় দুর্যোগ-সহনশীলতা এখনও অসম্পূর্ণ।

কখনও বলা হয়ে থাকে, ডিজিটাল শিক্ষা এ সমস্যার সমাধান হতে পারে। বাস্তবে বাংলাদেশের সব অঞ্চলে এ ব্যবস্থা সমানভাবে কার্যকর নয়। প্রত্যন্ত অঞ্চলে ইন্টারনেট সংযোগ দুর্বল; ডিভাইসের অভাব আছে। তা ছাড়া শিক্ষকদের প্রশিক্ষণও সীমিত। ফলে অনলাইন শিক্ষা আংশিক সমাধান হলেও সর্বজনীন সমাধান নয়।
তবে কিছু উদ্ভাবনী উদ্যোগ রয়েছে, যেমন ভাসমান স্কুল, যা নদীবেষ্টিত এলাকায় শিশুদের কাছে গিয়ে শিক্ষা পৌঁছে দেয়। এ ধরনের উদ্যোগ প্রমাণ করে– সমস্যা সমাধান সম্ভব, যদি নীতিগত অগ্রাধিকার থাকে।

গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হচ্ছে– বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা কি দুর্যোগ সহনশীল? বর্তমানে শিক্ষা ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা দুটো আলাদা খাত হিসেবে পরিচালিত হয়। বাস্তবে এ দুই খাতের সমন্বয় জরুরি। বর্ষায় স্কুল বন্ধ হলে কীভাবে শিক্ষার্থীদের শেখা অব্যাহত থাকবে, তার কোনো সমন্বিত জাতীয় কাঠামো অনেক জায়গায় নেই। বিকল্প শ্রেণিকক্ষ, অস্থায়ী শিক্ষাকেন্দ্র বা কমিউনিটিভিত্তিক শিক্ষা কার্যক্রম সীমিত। ফলে সংকট দেখা দিলে প্রতিবারই তাৎক্ষণিক সমাধান খুঁজতে হয়; দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নয়।

আবহাওয়ার পূর্বাভাস অনুযায়ী, বাংলাদেশে জুন থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত স্বাভাবিকের মতো বর্ষা সক্রিয় থাকবে এবং কিছু অঞ্চলে অতিবৃষ্টি ও বন্যার ঝুঁকি আছে। এই সময়েই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মধ্যে থাকে। এই বাস্তবতা নির্দেশ করে– এখনই প্রস্তুতি নেওয়া জরুরি। কারণ বর্ষা শুরু হওয়ার পর ব্যবস্থা নেওয়া প্রায়ই দেরি হয়ে যায়।

বর্ষা মৌসুমে শিশু শিক্ষার ধারাবাহিকতা রক্ষা কোনো ঐচ্ছিক উদ্যোগ নয়। এটা রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব। কারণ, প্রতিটি শিক্ষাবিচ্ছিন্ন দিন মানবসম্পদের ক্ষতির সঙ্গে যুক্ত। তাই সমস্যাকে মৌসুমি দুর্যোগ হিসেবে না দেখে বরং শিক্ষা-নিরাপত্তা কাঠামোর অংশ হিসেবে বিবেচনা করা জরুরি। তার জন্য প্রয়োজন দুর্যোগ-সহনশীল শিক্ষা অবকাঠামো গড়ে তোলা; বিকল্প শিক্ষাব্যবস্থা চালু করা; শিক্ষাক্রমে দুর্যোগকালীন নমনীয়তা; ডিজিটাল ও অফলাইন শিক্ষার সমন্বয়; শিক্ষা ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার সমন্বিত পরিকল্পনা; স্থানীয় পর্যায়ে প্রস্তুতি ও দ্রুত প্রতিক্রিয়া ব্যবস্থা ও তথ্যভিত্তিক মনিটরিং ব্যবস্থা।
আসন্ন বর্ষা বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার জন্য একটি পরীক্ষার সময়। প্রতিবছর একই ধরনের সংকটের পুনরাবৃত্তি হলেও সমাধান কাঠামোগতভাবে দুর্বল থেকে যাচ্ছে।

শিশুরা শুধু শ্রেণিকক্ষে উপস্থিত থাকলেই শিক্ষা সম্পন্ন হয় না। তারা ধারাবাহিকভাবে শেখার সুযোগ পেলে তবেই প্রকৃত শিক্ষা অর্জিত হয়। বর্ষা যদি সেই ধারাবাহিকতা বারবার ভেঙে দেয়, তবে এটাকে কেবল মৌসুমি সমস্যা বলা যাবে না। এটা জাতীয় উন্নয়ন চ্যালেঞ্জ। বাংলাদেশের নীতিনির্ধারকদের এখনই এই বাস্তবতা অনুধাবন করে স্থিতিস্থাপক শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলা প্রয়োজন, যাতে বর্ষা শিশুদের ভবিষ্যতের পথে আর বাধা হয়ে না দাঁড়ায়।

দীপু মাহমুদ: কথাসাহিত্যিক 

আরও পড়ুন

×