মার্তিনেজ ও সিমনের অন্যরকম দ্বৈরথ
আহসান হাবিব সম্রাট
প্রকাশ: ১৯ জুলাই ২০২৬ | ১৫:১৯
বিশ্বকাপের ফাইনালে আর্জেন্টিনা ও স্পেনের লড়াইয়ে গোলপোস্টের নিচে অন্যরকম দ্বৈরথে অবতীর্ণ হবেন আর্জেন্টিনার গোলরক্ষক এমিলিয়ানো মার্তিনেজ ও স্পেনের উনাই সিমন। আজ রাতে নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে টুর্নামেন্টের সবচেয়ে শক্তিশালী আক্রমণভাগ নিয়ে গঠিত আর্জেন্টিনার মুখোমুখি হবে আসরের সবচেয়ে আঁটোসাঁটো রক্ষণভাগ নিয়ে গঠিত স্পেন। এই ম্যাচে দুই দলের সবচেয়ে বড় তারকা লামিনে ইয়ামাল ও মেসির দিকেই যখন সবার চোখ থাকবে, তখন বিশ্বকাপ শিরোপা লড়াইয়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায় থাকবেন দুই দলের গোলরক্ষক দিবু ও সিমন। খুব কম বিশ্বকাপ ফাইনালেই এমন বিপরীত চরিত্রের দুই গোলরক্ষকের দেখা মেলে।
বিশ্বকাপ ইতিহাসের অন্যতম সেরা গোলরক্ষকের তালিকায় থাকবেন মার্তিনেজ। কাতারে অনুষ্ঠিত গত আসরে আর্জেন্টিনার শিরোপা জয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন তিনি। ফ্রান্সের বিপক্ষে ফাইনালে ম্যাচের অতিরিক্ত সময়ে রান্দাল কোলো মুয়ানির শটটি বাম পা প্রসারিত করে রুখে দেওয়ার পর পেনাল্টি শুটআউটে একটি দুর্দান্ত সেভ করে আর্জেন্টিনাকে জিতিয়ে দেন। যে নৈপুণ্যের কারণে বিশ্বকাপের গোল্ডেন গ্লোভ পুরস্কার জেতেন ৬ ফিট ৫ ইঞ্চি উচ্চতার এই গোলরক্ষক। গত বিশ্বকাপের ফাইনালের কথা স্মরণ করে মার্তিনেজ বলেন, ‘ফাইনালে আমি তিনটি গোল হজম করেছিলাম। যেটা সাধারণত বোঝায় যে ম্যাচটি আপনি হারছেন। কিন্তু ম্যাচের ১২৩তম মিনিটে প্রতিপক্ষকে প্রায় নিশ্চিত গোল থেকে বঞ্চিত করতে সক্ষম হই। যেটা ম্যাচের ভাগ্য নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ম্যাচে আমি তিন গোল হজম করতে পারি কিন্তু পরে পেনাল্টি শুটআউটে আমি সেই আগের দিবু। প্রেসার আমাকে দমিয়ে দিতে পারে না।’
মার্তিনেজ সবার মনোযোগ কাড়তে পছন্দ করেন। তাঁর সবকিছুতেই কিছুটা ‘বাড়াবাড়ি’ থাকে। আবেগ, উদযাপন এবং এমনকি চেহারার ছাপেও। নিজের মাথার দুই পাশের চুলও আর্জেন্টিনার পতাকার রং হালকা নীল ও সাদা রঙে রাঙিয়েছেন ৩৩ বছর বয়সী এই গোলরক্ষক। কাতার বিশ্বকাপের শিরোপা মঞ্চে দলের জয় উদযাপনে তিনি যে ‘কাণ্ড’ ঘটান, সেটা তৎক্ষণাৎ বিশ্বকাপের অন্যতম বিতর্কিত ঘটনা হিসেবে ইতিহাসে ঠাঁই পায়। মার্তিনেজ কখনও কখনও জোকারও হতে পারেন। কিন্তু ফুটবল মাঠে তিনি দারুণভাবে প্রতিপক্ষ খেলোয়াড়দের ওপর স্নায়ুচাপ সৃষ্টি করতে পারেন। বিশেষ করে, পেনাল্টি শুটআউটের সময়। নিজের সাফল্যের গোপন রহস্য সম্পর্কে মার্তিনেজ বলেন, ‘আমি সত্যিই ভেতরে ভেতরে শান্ত অনুভব করি। লোকজন ভাবে বড় মাপের গোলরক্ষক হতে দুর্দান্ত কিছু সেভ করতে হয়। কিন্তু এটা সত্য নয়। আপনাকে সবকিছু সহজভাবে করার উপায় জানতে হবে। আর সেটা সবই আপনার মনের ব্যাপার। সতীর্থদের জন্য আমাকে মানসিকভাবে শান্ত থাকতে হয়, কিন্তু (প্রতিপক্ষকে) আক্রমণাত্মক শরীরী ভঙ্গিমা দেখাতে হয়।’
নীরবতাই শক্তি সিমনের
অন্যদিকে স্পেন গোলরক্ষক উনাই সিমনের ব্যক্তিত্ব মার্তিনেজের বিপরীত। তিনি দর্শক বা গণমাধ্যমের মনোযোগ এড়িয়ে চলতে ভালোবাসেন। কাজের দিকেই সব মনোযোগ ধরে রাখেন স্প্যানিশ সিভিল গার্ড কর্মকর্তা ও দেশটির বাস্ক অঞ্চলের পুলিশ কর্মকর্তার সন্তান সিমন। আবেগকে অসাধারণভাবে নিয়ন্ত্রণে রাখার ক্ষমতা এবং নীরব ও শৃঙ্খলাপূর্ণ জীবনযাপনের জন্য সুনাম রয়েছে এই গোলরক্ষকের। সিমন কয়েক বছর আগেই সামাজিক মাধ্যমে থাকা নিজের অ্যাকাউন্টটি মুছে ফেলেন। কারণ তিনি উপলব্ধি করতে পারছিলেন সামাজিক মাধ্যমে তাঁর পোস্টে হয়তো তাঁকে অযথা প্রশংসা বন্যায় ভাসিয়ে দেওয়া হচ্ছে। অথবা তাঁর দিকে অযথা তীর্যক মন্তব্য ধেয়ে আসছে। এতে আসল কাজ থেকে তাঁর মনোযোগ সরে যাচ্ছিল। আর এই নীরবতা বজায় রাখাই তাঁর শক্তিতে পরিণত হয়। বিশ্বকাপে কোয়ার্টার ফাইনালের আগপর্যন্ত কোনো গোলই হজম করেননি সিমন। টুর্নামেন্টে ৫১৯ মিনিট পর্যন্ত গোল হজম না করার পাশাপাশি ৬ ম্যাচে ক্লিনশিট থেকে নতুন বিশ্বরেকর্ড গড়েছেন ২৯ বছর বয়সী এ গোলরক্ষক। সাত ম্যাচে এখন পর্যন্ত মাত্র এক গোল হজম করেছেন। অন্যদিকে টুর্নামেন্টে ৬ গোল হজম করেছেন আলবিসেলেস্তে গোলরক্ষক।
সিমন সম্পর্কে জার্মানির কিংবদন্তি গোলরক্ষক অলিভার কান বলেন, ‘উনাই সিমন বিশ্বকাপে তার সামর্থ্য দেখিয়েছে। সে খুবই শান্ত স্বভাবের একজন মানুষ এবং একজন ভালো ফুটবলার। সে গোলপোস্টের বাইরেও অবদান রাখতে পারে। সে খুবই নির্ভরযোগ্য, যেটা একজন গোলরক্ষকের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তার ওপর দলের নির্ভরতার বিষয়টি সহজেই বোঝা যায়।’ অন্যদিকে মার্তিনেজ সম্পর্কে কান বলেন, ‘সে অসাধারণ ক্ষিপ্রতাসম্পন্ন খুবই আগ্রাসী একজন গোলরক্ষক। চমৎকার শারীরিক ভঙ্গি দিয়ে সে মাঠে বলিষ্ঠ উপস্থিতি বজায় রাখে। তার মনে এই দৃঢ় বিশ্বাস কাজ করে যে আমিই বিশ্বের সেরা ব্যক্তি। কারণ আমি দলকে বিশ্বকাপ জিতিয়ে দিতে পেরেছি।’ সিমন ও মার্তিনেজের কারও অ্যাপ্রোচই ভুল নয়। তবে তারা একই গন্তব্যে মিলিত হওয়া দুই পথের পথিক। একজন গোলরক্ষক যেন ‘বজ্রঝড়’ আর অন্যজন যেন ‘পর্বত’।