বিপিএলে একটি সেঞ্চুরি চাই
মুশফিকুর রহিম- ফাইল ছবি
অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: ০৮ ডিসেম্বর ২০১৯ | ০৫:২৬
টি২০ ক্রিকেটার সৃষ্টি করতে হলে স্পোর্টিং উইকেট করতে হবে। টেকনিকের ওপর ব্যাট করা শিখতে হবে দেশের ক্রিকেটারদের। এবারের বিপিএলে টেকনিক দিয়ে খেলে ক্রিকেটারদের ২০২০ টি২০ বিশ্বকাপের জন্য প্রস্তুত হওয়ার আহ্বান মুশফিকুর রহিমের। উইকেটরক্ষক এই ব্যাটসম্যান সমকালের সঙ্গে খোলামেলা কথা বলেছেন টেস্ট ক্রিকেট নিয়েও। টি১০ ও টি২০র সঙ্গে পাল্লা দিয়ে টেস্টে ভালো করতে হলে ম্যাচ ফি বাড়ানোর ওপর জোর দিয়েছেন মুশফিক। অন্যতম সেরা এই ব্যাটসম্যানের সঙ্গে দেশের ক্রিকেটের নানা দিক নিয়ে আলাপনে ছিলেন আলী সেকান্দার
সমকাল :টি২০ বিশ্বকাপের প্রস্তুতির অংশ হিসেবে এবারের বিপিএলের গুরুত্ব কি একটু বেশি?
মুশফিক :বিশ্বকাপ অনেক বড় একটা টুর্নামেন্ট। অস্ট্রেলিয়ায় খেলা, তার আগে গুরুত্বপূর্ণ অনেক সিরিজ আছে। এই সিরিজগুলোতে ভালো করতে পারলে দল চাঙ্গা থাকবে। বিপিএল খেলছি দেশের মাটিতে। যদিও আমাদের উইকেট আর অস্ট্রেলিয়ার উইকেট সম্পূর্ণ ভিন্ন। এর পরও বলব, বিশ্বকাপের প্রস্তুতি নেওয়ার বড় একটা সুযোগ এটা। এ রকম প্রতিদ্বন্দ্বিতা খুব কম হয়। একসঙ্গে এত বেশি সংখ্যক বিদেশি ক্রিকেটারের সঙ্গে এত ম্যাচ খেলার সুযোগ খুব কম থাকে। আমরা ভাগ্যবান এক বছরে দুটি বিপিএল খেলছি।
সমকাল :বিপিএলে কেমন উইকেট চান?
মুশফিক :টি২০ ম্যাচ এখন সব জায়গাতেই স্পোর্টিং উইকেটে হয়। হাইস্কোরিং খেলা হয়। দর্শক, টিভি সম্প্রচার প্রতিষ্ঠান, স্পন্সর সবাই চায় বড় স্কোর। খেলোয়াড় হিসেবে আমাদের চাওয়া হবে স্পোর্টিং উইকেট। বিশ্বকাপের কথা চিন্তা করলে স্ট্রাইক রেট ১২০ বা ১৩০ রাখতে হবে। এ ধরনের ক্রিকেটার আমাদের খুবই কম। যখনই স্পোর্টিং উইকেট বানাবেন তখন ২০০ রান হবে সেটা আবার চেজ হয়ে যাবে, স্ট্রাইক রেটটাও বেশি হবে। ১৩০ বা ১৪০ রানের উইকেট হলে দেখা যাবে স্ট্রাইক রেট ১১০ বা ১১৫ হবে। ওটা চেজ করে জিতলেও স্ট্রাইক রেট তাই থাকবে। স্পোর্টিং উইকেট করলে খেলোয়াড়দের জন্য ভালো হবে।
সমকাল :অন্য ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগে ২০০ প্লাস রানের ম্যাচ বেশি হয়। বিপিএলে লো স্কোরিং ম্যাচ বেশি। ঘাটতি কোথায়?
মুশফিক :ঘাটতি তো অবশ্যই আছে। পাওয়ার হিটার নেই। তবে একটু ব্যাটিংবান্ধব উইকেট হলে পাওয়ার হিটার তৈরি হবে। গত বিপিএলের নকআউট ম্যাচে তামিম ১০০ করেছে। উইকেট ভালো থাকায় স্ট্রাইক রেট ভালো ছিল। উইকেট অনেক বড় ফ্যাক্টর। যত স্পোর্টিং উইকেট বানাবেন, তত ব্যাটসম্যানদের শক্তির জায়গা তৈরি হবে। স্কিল প্রয়োগ করতে পারলে রান হবে। পোলার্ড বা আন্দ্রে রাসেলের মিস হিটেও ছয় হয়। বাংলাদেশের ক্রিকেটারদের শক্তি তাদের মতো না। আমাদের স্কিল দিয়ে খেলতে হবে। আমরা মিস হিট নিলে আউট হয়ে যাব। এ বছর উইকেট ভালো হলে কিছু একটা করতে চাই।
সমকাল :বিপিএলে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহক আপনি। সপ্তম বিপিএলে আগে মনে হয় কি, রেকর্ডগুলো আরও ভালো হতে পারত?
মুশফিক :থাকলে তো ভালোই হতো। উন্নতি করার শেষ নেই। স্কোরিং উইকেট হলে বেশি রান করার অভ্যাস হবে। আমরা ১৮০ বা ২০০ রানের ম্যাচ খুব কম খেলেছি। এটা যতক্ষণ পর্যন্ত না হবে ততদিন রানের হার কম থাকবে। রান বেশি করলে গড় এবং স্ট্রাইক রেটও বেড়ে যাবে। ব্যক্তিগত ও দল দুই দিক থেকেই লাভবান হবে। সেই জায়গা থেকে চিন্তা করলে আমরা বঞ্চিত। তবে টি২০ এমন খেলা না যে ধারাবাহিক রান করা সম্ভব। আমার আক্ষেপ আছে, এখন পর্যন্ত চ্যাম্পিয়ন দলে খেলতে পারিনি। যে দলগুলোতে খেলেছি কোনোটিই চ্যাম্পিয়ন হয়নি। এখন পর্যন্ত ১০০ রানের ইনিংস নেই। এগুলো মাথায় থাকবে। চেষ্টা করব, আসছে বিপিএলে যেন আক্ষেপ ঘোচাতে পারি।
সমকাল :ছয় বিপিএলে বাংলাদেশি ক্রিকেটারের মাত্র চারটি সেঞ্চুরি। এত কমের কারণ কী?
মুশফিক :টি২০-তে সেঞ্চুরি খুব কম হয়। এটাই স্বাভাবিক। বিশ্বের খুব কম খেলোয়াড়ই আছে যারা হরহামেশা টি২০-তে সেঞ্চুরি করতে পারে। বিরাট কোহলি বিশ্বের একনম্বর ব্যাটসম্যান, তারও কিন্তু খুব বেশি সেঞ্চুরি নেই। সেঞ্চুরি করেন বা ৩০ রান করেন, দল জিতল কি-না সেটাই বড়। ইনিংসটা দলের জন্য কতটা গুরুত্বপূর্ণ ছিল এবং কার্যকর হয়েছে, সেটাই মুখ্য।
সমকাল :এবার কী ব্যাটিং অর্ডারের তিন বা চারে আপনাকে দেখা যাবে?
মুশফিক :এই সিদ্ধান্ত আমার এবং টিম ম্যানেজমেন্ট মিলে নিতে হবে। দলে কী কী রিসোর্সেস আছে। ডানহাতি-বাঁহাতি সমন্বয় করে সিদ্ধান্ত নিতে হয়। যদিও টি২০-তে ব্যাটিং অর্ডার নির্ধারণ করা যায় না। যে কোনো সময় পরিবর্তন হতে পারে। টি২০-তে তিন নম্বর জায়গাটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। চেষ্টা করব ওই জায়গায় খেলার।
সমকাল :এবার ভারত সিরিজ প্রসঙ্গ। ব্যাক্তিগত এবং দলগত পারফরম্যান্স নিয়ে কী বলবেন?
মুশফিক :ভারতে বিশ্বসেরা বোলিং লাইনআপের বিপক্ষে খেলতে হয়েছে। তিন-চারজন রান করলে ম্যাচের পরিস্থিতি অন্যরকম হতে পারত। অন্যরা যখন রান করেনি তখন আমার জন্যও চাপ হয়ে গেছে। অন্যরা রান করলে আমিও স্বাধীনভাবে খেলতে পারতাম। একটা জুটি বড় হলেই ছন্দ বদলে যায়। হয়নি, কী করা। এ রকম পরিস্থিতিতে নিয়মিতই খেলতে হবে। তরুণ খেলোয়াড়রা হয়তো বুঝতে পেরেছে, আমাদের কত দূর যেতে হবে। কোথায় কোথায় উন্নতি করতে হবে। আমার মনে হয়, ভারত সিরিজ থেকে এই জিনিসগুলো শিক্ষা নেওয়া উচিত।
সমকাল :সবাই চাচ্ছিল মুশফিক চারে খেলুক। খেললেন না কেন?
মুশফিক :ইনফর্ম খেলোয়াড় ওপরে খেলবে এটা অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু টেস্ট এমন একটা জায়গা যেখানে ব্যাটিং অর্ডার নড়চড় করার সুযোগ খুব কম। একটা নির্দিষ্ট জায়গা থাকে যেখানে নিজেকে ব্যাটসম্যান মানিয়ে নেয়। জায়গা পরিবর্তন করতে হলে দু-তিন মাস কাজ করতে হয়। ঘরোয়া লিগে খেলতে হয়। হুট করে ব্যাটিং অর্ডারে পরিবর্তন করা হলে ফেল করার সম্ভাবনা বেশি থাকে। আমি জাতীয় লিগে পাঁচ নম্বরে খেলেছি। আগে থেকে জানা থাকলে ভালোমতো প্রস্তুত হয়ে যেতাম। তাই চারে বা তিনে খেলা আমার জন্য কঠিন হতো। এ ছাড়া আমাদের মিডল অর্ডারেও তেমন অভিজ্ঞ কেউ নেই রিয়াদ ভাই ছাড়া। টিম ম্যানেজমেন্ট চাচ্ছিল মিডল অর্ডার ভারসাম্য থাকলে দুই দিক থেকে কাভার করা যাবে। চারে গেলে ভালো হতেও পারত, খারাপও হতে পারত।
সমকাল :আবার অধিনায়কত্ব দেওয়া হলে করবেন?
মুশফিক :দেশের স্বার্থে অনেক কিছু করার চেষ্টা করছি। ভবিষ্যতেও করব। তবে অধিনায়ক হতে চাই না। আমি এই জায়গায় ছিলাম, আমাকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। আমার এই জায়গায় ইনপুট দেওয়ার কিছু নেই। সেখানে আবার নিয়ে আসবেন, তাহলে তো হয় না। ভবিষ্যতে আমাকে অ্যাপ্রোচ করা হলেও আমি বলব না, অধিনায়ক হিসেবে আমার দেওয়ার কিছু নেই। এটা অনেক বড় একটা জব। গর্বিত হওয়ার মতো। আমি সে সম্মান পেয়েছি। আর অধিনায়কত্ব তো কাউকে না কাউকে করতেই হতো। এখনই সঠিক সময় অধিনায়ক বেছে নেওয়ার। বোর্ড মুমিনুলকে দায়িত্ব দিয়ে খুবই ভালো করেছে। হয়তো বা ভারতের মতো কঠিন একটা সিরিজ দিয়ে সে শুরু করল। আমি মনে করি, সামনে সে অনেক ভালো করবে। মেন্টালি অনেক শক্তি একজন মানুষ সে। আমি মনে করি, ওরে সবার ব্যাক করা উচিত। মুমিনুলকে আমি ব্যাক করছি এবং করব।
সমকাল :হঠাৎ টেস্টের ছন্দপতন? রহস্যটা কী?
মুশফিক :জিম্বাবুয়ে, ভারত বা আফগানিস্তান কারও সঙ্গেই আমরা স্বাচ্ছন্দ্যে খেলতে পারি না। আফগানিস্তানের কাছেও টেস্ট হেরে গেছি। গত বিশ বছর ধরে এটা হয়ে আসছে। ১৪ বছর ধরে আমি টেস্ট খেলছি, তখনও আড়াই দিনে টেস্ট হারতাম এখনও আড়াই দিনে হারি। কেন এভাবে হারছি? ১৪ বছর খেলার পর আমার হতাশা হলো, টেস্টের পরিবর্তনগুলো করা সম্ভব হয়নি। এর দায় আমিও এড়াতে পারব না। টেস্ট আমার কাছে সবচেয়ে প্রিয়। তিন ফরম্যাটের মধ্যে টেস্ট খেলতে সবচেয়ে ভালো লাগে। এই জায়গায় এভাবে ব্যর্থ হলে আমার কাছে খুব খারাপ লাগে।
সমকাল :আপনার কাছে যেমন টেস্ট ক্রিকেট প্রিয়, আবার বাংলাদেশের অনেক ক্রিকেটার তো টেস্ট খেলতে চান না। এ থেকে উত্তরণের পথ কী?
মুশফিক :টেস্টে ম্যাচে ফি বাড়াতে হবে। আমি যখন ক্যারিয়ার শুরু করেছি, তখন বছরে ছয় মাস ক্রিকেট খেলতাম। এখন ১১ মাস খেলি। আমাদের তো একটা নিরাপত্তার ব্যাপার থাকে। ক্রিকেটের জন্য একাডেমিক ক্যারিয়ারে ত্যাগ স্বীকার করতে হয়। পা ভাঙলে ক্রিকেট ক্যারিয়ারও শেষ। প্রতিষ্ঠানিক শিক্ষা বেশি না থাকায় ভালো চাকরিও পাবেন না। সেদিক থেকে অবশ্যই টেস্টের ম্যাচ ফি প্রত্যাশিত হতে হবে। যাতে খেলোয়াড় টেস্ট ম্যাচ খেলতে আগ্রহী হয়। বিশ্বব্যাপী টি১০, টি২০ হচ্ছে। ১০ থেকে ২০ দিন খেলেই অনেক টাকা পাওয়া যায়। কম পরিশ্রম করতে হয়। সেখানে টেস্টে পরিশ্রম বেশি, টাকাও কম। তাই টেস্ট ক্রিকেটে ভালো করতে হলে ম্যাচ ফি বাড়াতে হবে। টেস্ট ক্রিকেটারদের গুরুত্ব দিতে হবে। যেটা ভারত, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড ও ইংল্যান্ড করেছে। তাই এই চার দেশের ক্রিকেটাররা টেস্ট খেলার প্রতি বেশি আগ্রহী। চার দিনের ক্রিকেট ম্যাচ বেশি করলে এবং ম্যাচ ফি ও সুযোগ-সুবিধা বাড়ালে সব ধরনের ক্রিকেটে উন্নতি হবে। কারণ টেস্ট ক্রিকেট হলো বেসিক ক্রিকেট। এখানে টেস্ট, ওয়ানডে এবং টি২০ সব ধরনের সিচুয়েশন থাকে। টেস্টে যে ভালো খেলবে নিঃসন্দেহে বাকি দুই ফরম্যাটেও ভালো করবে।
সমকাল :ক্রিকেটে সম্প্রতি কিছু অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটছে। ফিক্সিংয়ের মতো ঘটনা ঘটছে। এই জায়গায় তরুণদের উদ্দেশে আপনার পরামর্শ কী?
মুশফিক :এটা নৈতিকতার ব্যাপার। সৃষ্টিকর্তার প্রতি ভয় থাকলে কেউ ওসব করতে পারে না। সর্বোপরি আমি সবাইকে নৈতিক হতে বলব।
সমকাল :পরিবারকে অনেক সেক্রিফাইস করতে হয়। ছেলেকে কতটা মিস করেন?
মুশফিক :দেশের প্রতি দায়িত্ব থেকে কিছু ত্যাগ স্বীকার তো করতেই হয়। দেশের প্রতি দায়বদ্ধতা আছে। দেশের জন্য, নিজের জন্য, পরিবারের জন্য কিছু করতে হলে অবশ্যই ত্যাগ স্বীকার করতে হবে। ছেলে বড় হয়ে যাচ্ছে। ও এখন অনেক কিছু বোঝে। পোশাক দেখলেই বুঝে যায়, কোথায় যাচ্ছি। কান্নাকাটি শুরু করে। তাকে রেখে আমি মাঠে চলে আসি। এই ত্যাগ স্বীকারের বিনিময়ে ভালো কিছু তো করতে হবে। ভালো লাগে বাংলাদেশের হয়ে একটা-দুটি ম্যাচ জেতাতে পারলে।
- বিষয় :
- মুশফিকুর রহিম