পানি নামতেই ভেসে উঠছে ক্ষতচিহ্ন
বন্যায় শতকোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতি
ভারী বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে খোয়াই নদীর বাঁধ ভেঙে সৃষ্ট বন্যায় তলিয়ে যায় হবিগঞ্জ সদর উপজেলার লস্করপুর ইউনিয়নের সবজি ক্ষেত। শুক্রবার তোলা। ছবি: সমকাল
হবিগঞ্জ প্রতিনিধি
প্রকাশ: ২০ জুলাই ২০২৬ | ১০:০১
ভারী বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলের তোড়ে আকস্মিক বন্যার ধাক্কায় টালমাটাল সিলেটের হবিগঞ্জসহ বিভিন্ন এলাকা। এর মাঝে খোয়াই নদের বাঁধ ভেঙে হবিগঞ্জের অন্তত ৫০টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। এতে শত শত পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। অনেকের বসতঘরে পানি ঢুকে পড়ায় চরম দুর্ভোগে পড়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। ঢলের পানিতে হবিগঞ্জ-ভায়া-মিরপুর আঞ্চলিক সড়ক পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় অনেক স্থানে যান চলাচল বন্ধ রয়েছে এখনও।
এদিকে জেলার বিভিন্ন উপজেলায় বসতভিটা ও হাওর অঞ্চল থেকে নামতে শুরু করেছে বন্যার পানি। এতে ভেসে উঠেছে ক্ষয়-ক্ষতির চিত্র। বন্যায় হবিগঞ্জ সদর ও লামাতাসি ইউনিয়নের অর্ধশতাধিক গ্রাম প্লাবিত হয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন কৃষক, দিনমজুর ও অনেক অসহায় পরিবার।
ঘরবাড়ি ও হাওর অঞ্চল থেকে পানি নেমে গেলেও জেলার কৃষি, মৎস্য ও অবকাঠামো খাতে এবারের আকস্মিক বন্যা রেখে গেছে ধ্বংসযজ্ঞের ছাপ। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, ঘরবাড়ি, রাস্তাঘাট, কৃষি ও মৎস্য খাতে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় শত কোটি টাকায়। টানা দুবার বন্যার কবলে পড়ে এখন দিশেহারা স্থানীয় বাসিন্দা ও কৃষকেরা।
৯ জুলাই রাত ৮টার দিকে খোয়াই নদীর বাঁধ ভেঙে সদর উপজেলার লস্করপুর ইউনিয়নের কালীগঞ্জে প্লাবিত হয় ৩টি ইউনিয়নের অর্ধশতাধিক গ্রাম। এতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে লস্করপুর ইউনিয়ন। সরকারি তথ্যমতে, বন্যায় এক হাজার ৫০০ হেক্টর ধানের জমি ও শাকসবজির ক্ষেত নষ্ট হয়েছে। বানের পানির সঙ্গে ভেসে গেছে এক হাজার ৪০০টি পুকুরে গড়া ঘেরের মাছ।
এলজিইডি ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ৩টি ইউনিয়নের প্রায় ৩০ কিলোমিটার সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বিশেষ করে বৈদ্যোর বাজার থেকে লস্করপুর পর্যন্ত সড়কের বড় অংশ পানিতে ভেসে গেছে এবং ধুলিয়াখাল-মিরপুর সড়কের বিভিন্ন অংশে সৃষ্টি হয়েছে বড় বড় গর্তের, যার ফলে যান চলাচল সাময়িকভাবে বন্ধ রয়েছে।
গত শনিবার সরেজমিন ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোতে গিয়ে দেখা যায় দুর্ভোগের চিত্র। পানি নেমে যাওয়ায় অনেকে ঘরবাড়ি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতায় ব্যস্ত, আবার কেউ কেউ আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত ফসলি জমি রক্ষায় আপ্রাণ চেষ্টা করছেন। তবে মাছের ঘের ভেসে যাওয়ায় মৎস্যচাষিরা ঋণের বোঝা নিয়ে চরম দুশ্চিন্তায় দিন কাটাচ্ছেন। অন্যদিকে শরীফপুর, সুলতানশী, হাতিরথান ও চরহামুয়া এলাকায় অন্তত ২০টি মাটির ঘর সম্পূর্ণ ধসে পড়েছে। চরহামুয়া গ্রামের কৃষক শফিক মিয়া আক্ষেপ করে বলেন, তাঁর কমপক্ষে পাঁচ লাখ টাকার শাকসবজি ক্ষতি হয়েছে। ফসল সব পচে গেছে।
ক্ষয়ক্ষতির বিষয়ে হবিগঞ্জ সদর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা এ.কে.এম মাকসুদুল আলম বলেন, প্রাথমিকভাবে ৬৯৭ হেক্টর আউশ ধানের জমি, ৩০ হেক্টর শাকসবজি ও ২০ হেক্টর ফলবাগানের ক্ষতি হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে এবং সরকারি সহায়তার তালিকা তৈরির কাজ চলছে।
হবিগঞ্জ সদর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা এ.কে.এম মাকসুদুল আলম বলেন, প্রাথমিকভাবে ৬৯৭ হেক্টর আউশ ধানের জমি, ৩০ হেক্টর শাকসবজি ও ২০ হেক্টর ফল বাগানের ক্ষতি হয়েছে। আমরা কয়েক দিন ধরে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পর্যবেক্ষণ করছেন। একই সঙ্গে কৃষকদের সহায়তার করতে তালিকা তৈরি হচ্ছে। পরপর দুবার বন্যায় সর্বস্বান্ত হওয়া এই অঞ্চলের মানুষ এখন স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে এবং ক্ষতি পুষিয়ে নিতে জরুরি সরকারি সহায়তার দাবি জানিয়েছেন।
জেলা মৎস্য কর্মকর্তা শরীফুল আলম বলেন, এক হাজার চারশটি পুকুর ও মাছের ঘের তলিয়ে গেছে। এতে প্রাথমিকভাবে ক্ষতির পরিমাণ নির্ধারণ করা হয়েছে ৪০ কোটি টাকার ওপরে। ক্ষতিগ্রস্ত মৎস্যচাষিদের তালিকা মন্ত্রণালয়ে প্রেরণ করা হয়েছে। তাদের ঋণ প্রদান ও প্রণোদনা দেওয়ার বিষয়ে অধিদপ্তরে জানানো হয়েছে।
গত শনিবার সরেজমিনে দেখা যায়, হাওর অঞ্চল ও ঘরবাড়ি থেকে বন্যার পানি অনেকটাই নেমে গেছে। তবে চোখে পড়ে অনেক ক্ষয়-ক্ষতির চিত্র। অনেক কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত শাকসবজির জমিতে কাজ করছেন। আবার অনেকেই পানি নেমে যাওয়ায় পরিষ্কার-পরিচ্চন্নতায় ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন। যে সব জমির ফসলের আংশিক ক্ষতি হয়েছে, সেগুলো রক্ষায় ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন অনেকেই। তবে ধানের জমিগুলো পুরোপুরি নষ্ট হয়ে গেছে।
এদিকে ভেসে যাওয়া মাছের ঘেরে বসে অনেক মৎস্যচাষিরা চিন্তিত। দেনা পরিশোধে তাদের কাছে বিকল্প পথ নেই। এ ছাড়া কয়েকটি সড়কের অংশ ভেঙে গিয়ে চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে বৈদ্যোর বাজার থেকে লস্করপুর পর্যন্ত সড়কের বড় অংশ পানিতে ভেসে গেছে।
ধুলিয়াখাল-মিরপুর সড়কেও অনেক অংশে গর্ত দেখা দিয়েছে। অন্যদিকে, শরীফপুর, সুলতানশী, হাতিরথান ও চরহামুয়া এলাকায় অন্তত ২০টি মাটির ঘর ধসে পড়েছে। চরহামুয়া গ্রামের কৃষক শফিক মিয়া বলেন, তাঁর কমপক্ষে পাঁচ লাখ টাকার শাকসবজির ক্ষতি হয়েছে। দুটি জমি তলিয়ে গেছে। আর তিনটি জমি কিছুটা উঁচু থাকলেও পানি উঠে যায়। এতে ফসল পচে গেছে।
সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তথ্যানুযায়ী, বন্যার পানিতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এক হাজার ৫০০ হেক্টর ধানের জমি ও শাকসবজির ক্ষেত। এ ছাড়া পানিতে তলিয়ে যায় এক হাজার ৪০০টি পুকুর ও জলাশয়। তিনটি ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকার প্রায় ৩০ কিলোমিটার রাস্তা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
- বিষয় :
- সিলেট