ডেঙ্গুর মধ্যেই চিকুনগুনিয়ার শঙ্কা
আবদুল্লাহ আল মামুন
প্রকাশ: ২২ অক্টোবর ২০২২ | ১২:০০ | আপডেট: ২৩ অক্টোবর ২০২২ | ০৩:৫৪
চট্টগ্রাম নগরের ৮০টি স্থান পরির্দশন করে ২৫টি স্থানে ডেঙ্গুর জীবাণুবাহী এডিস মশার উপস্থিতি পেয়েছে সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট (আইইডিসিআর)। একই সঙ্গে ডেঙ্গুর পাশাপাশি চিকুনগুনিয়া ছড়িয়ে পড়ারও আশঙ্কা রয়েছে প্রতিষ্ঠানটির অনুসন্ধান প্রতিবেদনে।
এ ছাড়া নগরের নয়টি ওয়ার্ড ও জেলার সাতকানিয়ায় ডেঙ্গুর সংক্রমণ সবচেয়ে বেশি পাওয়া গেছে। ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়লে আইইডিসিআরের অনুসন্ধান দল চট্টগ্রাম আসে। গত ১৭ থেকে ২৩ সেপ্টেম্বর সরেজমিন অনুসন্ধান চালায় তারা। এক মাস পর 'ইনভেস্টিগেশন রিপোর্ট অন ডেঙ্গু আউটব্রেক অ্যাট চট্টগ্রাম, সেপ্টেম্বর ২০২২' শিরোনামের প্রতিবেদন আইইডিসিআরের পরিচালক অধ্যাপক ড. তাহমিনা শিরিনের কাছে জমা দেন। তা চট্টগ্রামের সিভিল সার্জনের কাছে পরবর্তী ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য পাঠানো হয়।
এদিকে, গত ২১ অক্টোবর পর্যন্ত চট্টগ্রামে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে ১ হাজার ৮২৩ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছেন। মারা গেছেন ১২ জন। এ অবস্থায় জরুরি বৈঠকে বসেছে সিটি করপোরেশনের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিষয়ক স্থায়ী কমিটি। তারা নির্মাণাধীন বাড়ি ও ছাদ বাগান মালিকদের বাধ্যতামূলক মশা মারার স্প্রে মেশিন রাখার সিদ্ধান্ত নেন। প্রসঙ্গত, গত বছর চট্টগ্রাম নগরের ৫১টি স্থান থেকে সংগ্রহ করা লার্ভার মধ্যে ৩৩টি স্থানে ডেঙ্গুর জীবাণুবাহী এডিস মশার উপস্থিতি পেয়েছিল চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল গবেষক।
অনুসন্ধান দলের সদস্যরা নগরের ৮০টি স্থান পরিদর্শন করেন। এর মধ্যে ২৫টি স্থানে এডিস মশার লার্ভা শনাক্ত করেন তারা। বেশি লার্ভা পাওয়া যায় খালি জামি, মার্কেট, বাস টার্মিনাল, বহুতল ভবন, বাড়ির আঙিনা ও নির্মাণাধীন
ভবনে। এ ছাড়া অব্যবহূত গাড়ির টায়ার, ফুলের টব, রঙের কৌটা, ফেলে দেওয়া প্লাস্টিক বোতলসহ বিভিন্ন ফেলে দেওয়া পাত্রেও লার্ভার সন্ধান পাওয়া যায়।
অনুসন্ধান দলের সংগ্রহ করা নমুনার মধ্যে দুই ধরনের এডিস এজিপ্টা ও এডিস এলবোপিক্টা মশার উপস্থিতি মিলেছে। এর মধ্যে এডিস এলবোপিক্টার সংখ্যা তুলনামূলক বেশি জানিয়েছেন তারা। এডিস এলবোপিক্টা প্রজাতির মশা চিকুনগুনিয়ার সংক্রমণ ঘটনা। ফলে ডেঙ্গুর পাশাপাশি চিকুনগুনিয়াও ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে প্রতিবেদনে।
অনুসন্ধানকালে ডেঙ্গু রোগীদের চিকিৎসা দেওয়া চারটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রোগীদের সঙ্গে কথা বলেন তারা। এ সময় ২২৩ জন রোগীর নমুনা সংগ্রহ করেন। অধিকাংশ আক্রান্তরা নগরের সরাইপাড়া, দক্ষিণ আগ্রাবাদ, পাঠানটুলী, পশ্চিম মাদারবাড়ী, গোসাইলডাঙা, উত্তর মধ্যম হালিশহর, দক্ষিণ মধ্যম হালিশহর, উত্তর পতেঙ্গা ও দক্ষিণ পতেঙ্গা এবং সাতকানিয়া উপজেলার বাসিন্দা।
পরিদর্শনকালে ২৫ শতাংশ ডেঙ্গু রোগীকে মশারি ব্যবহার করতে দেখেননি তারা। এ জন্য প্রতিবেদনে ৬ দফা সুপারিশ করা হয়। এর মধ্যে রয়েছে ডেঙ্গু সম্পর্কে সম্পর্কে সচেতনতা কার্যক্রম জোরদার করা, এডিস মশার প্রজনন রোধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া, সব ধরনের অব্যবহূত টায়ার অপসারণ, স্বাস্থ্য শিক্ষা জোরদার, হাসপাতালে ডেঙ্গুর কর্নার স্থাপন ও আক্রান্ত রোগীদের মশারি ব্যবহার নিশ্চিত করা।
চট্টগ্রামের সিভিল সার্জন মোহাম্মদ ইলিয়াছ চৌধুরী সমকালকে বলেন, 'আইইডিসিআর প্রতিবেদনে যেসব সুপারিশ করা হয়েছে সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে সিটি করপোরেশন এবং উপজেলাগুলোর স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তাসহ সংশ্নিষ্ট সবাইকে চিঠি দেওয়া হয়েছে।'
চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের প্রধান পরিচ্ছন্ন কর্মকর্তা আবুল হাশেম সমকালকে বলেন, 'এডিস মশার প্রজনন স্থান ধ্বংসে প্রতিদিন অভিযান চালানো হচ্ছে। সচেতনতা কার্যক্রমের পাশাপাশি যাদের বাসা-বাড়িতে মশার লার্ভা পাওয়া যাচ্ছে তাদের জরিমানা করা হচ্ছে। এ ছাড়া মশার ওষুধ ছিটানো হচ্ছে।'
মশা মারার স্প্রে মেশিন রাখতে হবে নির্মাণাধীন ভবন ও ছাদবাগান মালিকদের :এদিকে ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়ায় জরুরি বৈঠকে বসে সিটি করপোরেশনের বর্জ্য ব্যবস্থাপনাবিষয়ক স্থায়ী কমিটি। সভায় নির্মাণাধীন ভবন ও ছাদবাগান মালিকদের মশার ওষুধ ছিটানোর মেশিন রাখা বাধ্যতামূলক করতে সিদ্ধান্ত হয়। তিন দিন পরপর তারা মশার প্রজননস্থলে ওষুধ স্প্রে করবেন। এ ছাড়া সভায় ডেঙ্গুর প্রকোপ রোধে এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় আরও ৯টি সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
সিটি করপোরেশনের বর্জ্য ব্যবস্থাপনাবিষয়ক স্থায়ী কমিটির সভাপতি মো. মোবারক আলী বলেন, 'ভবন মালিকরা চাইলে সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে ওষুধ দেওয়া হবে। কিন্তু নিজের টাকায় তাদের মেশিন কিনে রাখতে হবে। কারণ নির্মাণাধীন ভবন ও ছাদবাগান এডিস মশার বড় প্রজননস্থলে পরিণত হয়েছে।'
সভায় নেওয়া অন্য সিদ্ধান্তগুলোর মধ্যে রয়েছে- ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়ায় ১৭ হাজার লিটার ওষুধ কেনা হবে। এ ছাড়া চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক দলের সুপারিশ করা মসকুবার ওষুধ ব্যবহার করা হবে। ডেঙ্গু প্রতিরোধী প্রচারণার জন্য ওয়ার্ড কাউন্সিলরদের ১৫ হাজার টাকা করে এবং আবাসিক এলাকায় উঠোন বৈঠকের জন্য ৫ হাজার টাকা করে দেওয়ার সুপারিশ করা হয়। এ ছাড়া ডেঙ্গু প্রতিরোধে গণমাধ্যমে বিজ্ঞপ্তি দেওয়াসহ নানা সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
- বিষয় :
- ডেঙ্গু
- চিকুনগুনিয়া
