নদীর ভাঙনে দেড় হাজার পরিবার ভূমিহীন
নিজেদের ভিটাবাড়ি হারিয়ে ডুমুরিয়ার চাঁদগড় গ্রামের মরিয়াম, আবুল গাজীদের বসবাস এখন বেড়িবাঁধের ওপর সমকাল
এম এ এরশাদ, ডুমুরিয়া (খুলনা)
প্রকাশ: ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২৩ | ১৮:০০ | আপডেট: ২২ ফেব্রুয়ারি ২০২৩ | ০৫:২৩
নদীভাঙনের কবলে পড়ে খুলনার ডুমুরিয়া উপজেলার ২৯ নম্বর পোল্ডারের তিনটি গ্রাম 'মানচিত্র' থেকে হারিয়ে গেছে। শরাফপুর ইউনিয়নে চাঁদগড়, জালিয়াখালী ও শম্ভুনগর গ্রাম এরং এর আশপাশের এলাকায় ৫০ বছর ধরে অব্যাহত ভাঙনে বিলীন হয়েছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ নানান স্থাপনা। সর্বস্বান্ত হয়ে অনেকে এলাকা ছেড়ে চলে গেছেন। কিছু পরিবার বেড়িবাঁধ ও বটিয়াঘাটার অংশে জেগে ওঠা চরে বসবাস করছে। এসব পরিবারের শিশুরা বড় হচ্ছে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে। নাগরিক সেবা থেকেও বঞ্চিত ভাঙনকবলিতরা।
ডুমুরিয়ার চাঁদগড়, জালিয়াখালী ও শম্ভুনগর ভদ্রা নদীর ভাঙনের কবলে পড়ায় ২১ বার বিকল্প বাঁধ নির্মাণ করেছে পাউবো। তবে এরই মধ্যে নদীতে বিলীন হয়েছে একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়, দুটি মসজিদ, দুটি ঈদগাহ, একটি মন্দির, একটি মাদ্রাসা, পাঁচটি স্লুইস গেট, জমিসহ হাজার হাজার কাঁচা-পাকা ঘরবাড়ি ও অসংখ্য গাছ। প্রায় দেড় হাজার পরিবার ভূমিহীন হয়েছে।
শরাফপুর ইউনিয়ন পরিষদ সূত্রে জানা গেছে, জীবিকার তাগিদে অন্তত ৮৪০টি পরিবার এলাকা ছেড়ে খুলনা, সাতক্ষীরা, যশোরসহ বিভিন্ন স্থানে চলে গেছে। উপজেলার আশপাশ বা আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে ও বিভিন্ন ইটভাটায় কাজ নিয়েছেন অন্তত ৩৫০টি পরিবারের সদস্যরা। ২৪০টি পরিবার বেড়িবাঁধে বসবাস করছে। পাশের বটিয়াঘাটায় জেগে ওঠা নতুন চরে ৭০টি পরিবার আশ্রয় নিয়েছে।
নতুন চরে বসবাস করা জালিয়াখালী গ্রামের আতিয়ার রহমান ও চাঁদগড় গ্রামের আব্দুল হামিদ শেখ বলেন, তাঁদের বাপ-দাদার ভিটাবাড়ি নদীতে বিলীন হয়েছে। চাঁদগড় গ্রামের মরিয়াম বিবি ও আবুল হোসেন গাজী বলেন, তাঁদের ২০ বিঘা করে জমি ছিল। সব নদীতে চলে গেছে, এখন তাঁরা ভূমিহীন। বাধ্য হয়ে পরিবার-পরিজন নিয়ে ৯ বছর ধরে বেড়িবাঁধে বসবাস করছেন। মাছ ধরে সংসার চলে। সরকারি সহায়তা পাননি।
স্থানীয়রা বলছেন, উপজেলার ২৯ নম্বর পোল্ডারের শৈলমারী থেকে শম্ভুনগর পর্যন্ত প্রায় ১৮ কিলোমিটারজুড়ে ভাঙন চলছে। ভদ্রার জোয়ারের পানির তোড়ে প্রতিবছর কোথাও না কোথাও বেড়িবাঁধ ভেঙে গ্রামের পর গ্রাম প্লাবিত হচ্ছে। তবে পাউবোর নানামুখী পরিকল্পনা ও পদক্ষেপে ভাঙন কিছুটা কমেছে।
চাঁদগড়-জালিয়াখালী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক (ভারপ্রাপ্ত) আব্দুল গফুর শেখ বলেন, বিদ্যালয়টি ১৯৮৮ সালে স্থাপিত হয়। তিনবার নতুন ভবন নির্মাণ হলেও নদীতে বিলীন হয়ে গেছে। নতুন চরে মাটির দেয়াল আর টিনের ছাউনি দিয়ে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে চলছে শিশুদের পাঠদান। নতুন স্কুল ভবনের নির্মাণকাজ প্রায় শেষের দিকে।
উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা সিকদার আতিকুর রহমান বলেন, আগের ভবন বিলীন হওয়ায় নতুন চরে চাঁদগড়-জালিয়াখালী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পাকা ভবন নির্মাণের কাজ চলছে।
উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা সুফিয়ান রুস্তম বলেন, মাঝেমধ্যে ছোট বেড়িবাঁধ ভেঙে পানিতে নিমজ্জিত হয়। সেখানে প্রায় সারা বছর পানি, কাদামাটি ও ধুলায় বেষ্টিত থাকে। শিশুদের বিনোদনের কোনো জায়গা নেই। এ কারণে শিশুরা অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে বেড়ে উঠছে।
শরাফপুর ইউপি চেয়ারম্যান শেখ রবিউল ইসলাম রবি বলেন, চাঁদগড়, জালিয়াখালী ও শম্ভুনগর এলাকার শত শত পরিবার সহায়-সম্পদ হারিয়ে বিভিন্ন স্থানে বসবাস করছে। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. শরীফ হাসিব রহমান বলেন, কয়েকটি এলাকায় ভাঙনে ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসনের চেষ্টা চলছে।
খুলনা পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আরশাফুল ইসলাম সমকালকে বলেন, ভাঙন রোধে চেষ্টার ত্রুটি নেই। সংশ্নিষ্ট দপ্তরের প্রযুক্তি ব্যবহার করে ভাঙন রোধ সম্ভব হচ্ছে। তবে কয়েকটি গ্রাম ও মৌজা মানচিত্র থেকে হারিয়ে
গেছে সত্য।
সাবেক মৎস্য ও প্রাণিসম্পদমন্ত্রী নারায়ণ চন্দ্র চন্দ এমপি বলেন, চাঁদগড়, জালিয়াখালী ও শম্ভুনগরের ভাঙন অনেক বছরের। ভাঙন রোধে নানামুখী পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্তদেরও সহযোগিতা করা হচ্ছে।
