ঢাকা মঙ্গলবার, ২১ জুলাই ২০২৬

কুড়িগ্রামে চারণকবির ওপর হামলায় আটক ৩

কুড়িগ্রামে চারণকবির ওপর হামলায় আটক ৩
×

অ্যান্ডি ফ্লাওয়ার

কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি

প্রকাশ: ০৩ অক্টোবর ২০২৩ | ১২:১৪ | আপডেট: ০৩ অক্টোবর ২০২৩ | ১২:৪০

কুড়িগ্রামের নাগেশ্বরীতে চারণকবি রাধাপদ রায়ের ওপর হামলার ঘটনায় জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তিনজনকে আটক করেছে পুলিশ।

নাগেশ্বরী উপজেলার ভিতরবন্দ ইউনিয়নে রাধাপদের নিজ গ্রাম গোড্ডারাপাড় বটতলায় গত ৩০ সেপ্টেম্বর (শনিবার) সকালে তাঁর ওপর হামলা চালানো হয়। ওইদিন চিকিৎসার জন্য কবিকে নেওয়া হয় নাগেশ্বরী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে। এ ঘটনায় রাধাপদের ছেলে শ্রী জুগল রায় পরদিন রোববার অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে নাগেশ্বরী থানায় মামলা করেন।

গত চার দিন ধরে হাসপাতালে চিকিৎসারত কবি এখন অনেকটা সুস্থ। চলাফেরা করছেন স্বাভাবিকভাবেই। 

মঙ্গলবার দুপুরে হাসপাতালের বেডে কবির সঙ্গে কথা হলে তিনি বলেন, ‘আমি সাধুসঙ্গ করি, কীর্তন-গান বাজনা করে জীবিকা নির্বাহ করি। গান-কীর্তন কিংবা সাধুসঙ্গের জন্য কখনো আমাকে কেউ কটু কথা বলেনি বা খারাপ ব্যবহার করেনি। মূলত সাত মাস আগে আমার ছেলের সঙ্গে অভিযুক্তের একটি বাক-বিতণ্ডা হয়। সেই রেশ ধরে আমাকে শনিবার বাঁশ দিয়ে মারধর করে।’

রাধাপদ রায় আরও বলেন, ‘প্রকৃত সত্য হলো- আমি বাউল সাধক বা কবি বলে আমাকে মারধর করেছে এমনটি নয়। অভিযুক্ত কদুর রহমান আমার স্ত্রীকে সাত মাস আগে অশ্লীল ভাষায় গালি দিয়েছিল। আমি এর প্রতিবাদ করায় এখন আমার ওপর হামলা করেছে। আমি এর সঠিক বিচার চাই।’

কবির ছেলে জুগল রায় বলেন, “আমার বড় ভাইয়ের কাছে মো. মিলন নামের এক রাজমিস্ত্রি টাকা পেতেন। গত মার্চে তিনি টাকা চাইতে আসলে তাঁর সঙ্গে কথা কাটাকাটি হয় বাবার। এ সময় কদুর রহমান উপযাচিত হয়ে তাদের মাঝখানে আসেন সমাধানের চেষ্টা করতে। আমার বাবা তখন তাকে বলেন, ‘আমাদের বিষয় আমরা দেখব, তোকে মাতব্বরি করতে হবে না।’ এরপর বিষয়টি সেখানে মো. মিলনের সঙ্গে সমাধান হওয়ার পর কদুর রহমান আমার মাকে নিয়ে গালি দেন। তখন বাবা এর বিরোধিতা করেন। মূলত এর রেষ ধরে সাত মাস পর বাবার ওপর হামলা করা হয়। আমি থানায় মামলা করেছি, পুলিশ আসামিদের আটক করতে পারেনি। আমি সঠিক বিচার চাই।”

কবির মেজ মেয়ে শান্তনা রানী বলেন, ‘আমার বাবা গ্রামে গান-বাজনা করে এটা নিয়ে কারও সঙ্গে তাঁর কখনো ঝগড়া-বিবাদ হয় নাই। সবাই তাঁকে ভালোবাসে। কিন্তু বাবাকে শনিবার যেভাবে মারল আমি এর বিচার চাই।’

প্রতিবেশী ভদ্র মোহন রায় বলেন, ‘কবি রাধাপদ খুবই ভালো মানুষ। গান-বাজনা নিয়ে কখনো তাঁকে কারও সঙ্গে বিবাদ করতে দেখিনি। পূর্বের লেনদেনের বিষয়টা নিয়ে তাঁকে মারধর করা হয়েছে। আমরা এর বিচার চাই।’

রাধাপদ রায়ের ওপর হামলার ঘটনাস্থল। ছবি: সমকাল

অভিযুক্তরা পলাতক থাকায় তাদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে রফিকুলের প্রতিবেশি ও ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী নুর আমিন বলেন, ‘আমরা দীর্ঘদিন ধরে একই এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে আছি, কখনো কবির সঙ্গে ঝগড়া-বিবাদ হয়নি। শনিবার সকালে কবি কাকড়া ধরতে আসেন। রফিকুল তার দাড়ি ধরে ধাক্কা দেন। তিনি পড়ে যান শামুকের উপর তার পিঠের যে আঘাত সেটি শামুক থেকে। তাকে বাঁশ দিয়ে মারধর করেনি।’

এজাহার সূত্রে জানা গেছে, সাত মাস আগের শত্রুতার জের ধরে পরিকল্পিতভাবে পথরোধ করে গত শনিবার (৩০ সেপ্টেম্বর) সন্ধ্যার দিকে চারণকবি রাধাপদ রায়ের ওপর আক্রমণ চালান দুই ভাই মো. রফিকুল ইসলাম ও কদুর আলী। অভিযুক্তরা একই ইউনিয়নের কচুয়ারপাড় এলাকার মৃত মোহাম্মদ আলীর ছেলে।

তবে ঘটনার চার দিন পার হলেও পুলিশ মূল দুই অভিযুক্তকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি। কদুর রহমানের স্ত্রী মোছা. জামিলা খাতুন, শ্যালক সাগর মিয়া ও শ্বশুর জহুর আলীকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য সোমবার রাতে আটক করা হয়। 

নাগেশ্বরী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আশিকুর রহমান বলেন, ‘ঘটনার পর থেকে আসামিরা পলাতক। আমরা আসামিদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। সোমবার রাতে ২ নম্বর আসামির স্ত্রী, শ্যালক ও শ্বশুরকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য থানা আনা হয়েছে। প্রাথমিকভাবে অভিযুক্ত দুজনের ঘটনায় জড়িত থাকার বিষয়টি পাওয়া গেছে।’

পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা কবি রাধাপদ রায়ের। নিজের লেখা গান ও কবিতা মানুষকে শুনিয়ে সামান্য উপার্জনে চলে তাঁর সংসার। আঞ্চলিক ভাষায় তাঁর লেখা গান ও কবিতা বিভিন্ন এলাকায় ব্যাপক সাড়া পেলেছে। এরই মধ্যে ‘কেয়ামতের আলামত, জানি কিন্তু মানি না’ কবিতা ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেয়েছে। এখন পর্যন্ত রাধাপদ সরকারের নিজের লেখা আঞ্চলিক ভাষায় শতাধিক গান ও কবিতা রয়েছে।

আরও পড়ুন

×