আলুর দাম নিয়ে কারসাজিতে বড় ৩ বাজারের কিছু অসাধু ব্যবসায়ী
শৈবাল আচার্য্য, চট্টগ্রাম
প্রকাশ: ০৪ অক্টোবর ২০২৩ | ০৬:৩৪ | আপডেট: ০৪ অক্টোবর ২০২৩ | ০৬:৩৪
আলু আমদানি, অভিযান ও কারসাজির সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানসহ প্রশাসনের নানা হুঙ্কারেও কাটছে না আলুর বাজারের ‘কালো মেঘ’। খুচরা পর্যায়ে প্রতি কেজি আলু ৩৫ থেকে ৩৬ টাকা নির্ধারণ করে দেওয়া হলেও সরকারি নির্দেশনা উড়িয়ে দিয়ে বন্দরনগরী চট্টগ্রামে বিক্রি হচ্ছে ৪৫ টাকার ওপরে। অথচ পাইকারি পর্যায়ে এক কেজি আলু ২৭ টাকায় কিনছেন পাইকাররা। এভাবে কয়েক গুণ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন বিক্রেতারা।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, চট্টগ্রামে আলুর দাম নিয়ে নৈরাজ্যের নেপথ্যে রয়েছে বড় তিন বাজারের কিছু অসাধু ব্যবসায়ী। তারা বাজারে কৃত্রিম সংকট দেখিয়ে খুচরা বাজারে পর্যাপ্ত আলু সরবরাহ করছে না। নিজেদের পকেট ভরতে তারা ‘রসিদহীন’ বাজার তৈরি করেছে। কারসাজি করে বাজার থেকে উধাও করা হয়েছে আলু। তাদের এমন কারসাজির খেসারত দিতে হচ্ছে ভোক্তাদের।
কৃষি বিপণন ও কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, এক বছরের ব্যবধানে দেশে আলুর উৎপাদন বেড়েছে ১ লাখ ৩৩ হাজার টন। চাহিদার বিপরীতে প্রায় ২০ লাখ টনের মতো আলু উদ্বৃত্ত থাকার কথা। অথচ বাজারের চিত্র এর উল্টো। জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক এএইচএম সফিকুজ্জামান দুই মাসের আলু মজুত থাকার কথা বললেও বাজারে পর্যাপ্ত আলু মিলছে না।
জানা গেছে, চট্টগ্রামে আলুর বাজার নিয়ন্ত্রণ করছে খাতুনগঞ্জ, রিয়াজউদ্দিন বাজার ও পাহাড়তলী বাজার। বৃহৎ এই তিন মোকামে আলুর একটি বড় অংশই আসে মুন্সীগঞ্জ ও জয়পুরহাট থেকে। পাহাড়তলী বাজারের আলুর বড় মোকাম মেসার্স লাকি স্টোর মুন্সীগঞ্জের হিমাগার থেকে ২৫০ বস্তা আলু প্রতি কেজি ২৭ টাকা দরে কিনে চট্টগ্রামে আনে। তবে সেই আলু কারসাজি করে পাইকারিতেই ৩৯ টাকা দরে বিক্রি করে তারা। এমন কারসাজি ও অনিয়মের প্রমাণ পেয়ে চোখ কপালে ওঠে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর টিমের সদস্যদের। এমন অভিযোগ রয়েছে আরও বেশ কিছু প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে।
কারসাজি ও কেনা দামের চেয়ে কয়েক গুণ বেশি দামে বিক্রির প্রমাণ হাতেনাতে পাওয়ায় বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানকে জরিমানা ও সতর্কও করেছে প্রশাসন। এত কিছুর পরও আলুর বাজার নিয়ন্ত্রণে আনতে ব্যর্থ হচ্ছে খোদ প্রশাসন। তথ্য বলছে, কয়েক মাস আগেও চট্টগ্রামের খুচরা বাজারে প্রতি কেজি আলু মানভেদে ১৮ থেকে ২০ টাকায় বিক্রি হয়েছিল। গত বছরের এই সময়ে প্রতি কেজি আলু বিক্রি হয়েছিল ২২ থেকে ২৫ টাকা। তবে বর্তমানে প্রতি কেজি আলু কিনতে ভোক্তাকে গুনতে হচ্ছে ৪৫ টাকা। বড় আকারের একটু ভালো মানের আলুর দাম পড়ছে ৫০ টাকা।
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক আবুল বাসার মোহাম্মদ ফখরুজ্জামান বলেন, ‘অসাধু ব্যবসায়ীদের কারসাজির কারণে নানা উদ্যোগ নিয়েও আলুর বাজার নিয়ন্ত্রণে আসছে না। চট্টগ্রামের কয়েকটি বড় বাজারের আলু বিক্রয়কারী প্রতিষ্ঠান ও আড়তদাররা কারসাজির সঙ্গে জড়িত বলে তথ্য আছে। এদের সঙ্গে মুন্সীগঞ্জ ও জয়পুরহাটের বড় কিছু ব্যবসায়ী ও মধ্যস্বত্বভোগী জড়িত।’
তিনি বলেন, ‘ভোক্তার পকেট কাটতে এরা ক্রয়-বিক্রয়ের কোনো রসিদ নিজেদের কাছে সংরক্ষণ কিংবা অন্যদের সরবরাহ করছে না। এর প্রমাণও পেয়েছি আমরা। এজন্য কয়েকজনকে জরিমানা ও সতর্ক করা হয়েছে। তবু অসাধুদের কারসাজি ও বাজারে কৃত্রিম সংকট বন্ধ হচ্ছে না।’
ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর চট্টগ্রামের সহকারী পরিচালক নাসরিন আক্তার বলেন, ‘আলুর বাজার অস্থিরতার পেছনে কিছু অসাধু ব্যবসায়ী জড়িত। তারা বাজারে সংকট দেখিয়ে আড়ত থেকে আলু উধাও করে দিচ্ছে। সরকার নির্ধারিত দামে আলু বিক্রির জন্য সবাইকে বারবার তাগাদা দেওয়া হলেও তা মানছে না তারা।’
ক্যাবের চট্টগ্রাম বিভাগীয় সভাপতি এসএম নাজের হোসাইন বলেন, ‘সরকারি নির্দেশনাকে পাত্তা দিচ্ছে না অসাধু ব্যবসায়ীরা। বাজারে কোনো নিয়ন্ত্রণ না থাকায় নিজেদের মর্জিতেই আলুর দাম নির্ধারণ করছে তারা। এর খেসারত দিতে হচ্ছে সাধারণ ভোক্তাকে। অসাধু ব্যবসায়ীদের কারণে অসহায় মানুষের খাবারের থালা থেকে ভরসার আলুও উঠে যাচ্ছে। এ অবস্থার জন্য প্রশাসনের নীরবতা অনেকাংশে দায়ী।’
রসিদহীন আলুর বাজার
ক্রেতার পকেট কাটতে ‘রসিদহীন’ বাজার তৈরি করেছে অসাধু ব্যবসায়ীরা। চট্টগ্রামের আলুর বড় মোকাম আব্দুল বারেক ট্রেডার্স, ফেনী বাণিজ্যালয়, মোহরা বাণিজ্যালয়, বারো আউলিয়া বাণিজ্যালয়সহ আরও কয়েকটি প্রতিষ্ঠান কেনা দামের চেয়ে বেশি দামে আলু বিক্রি করলেও নিজেদের কাছে রাখছে না এ-সংক্রান্ত কোনো রসিদ। ভ্রাম্যমাণ আদালত অভিযানে গিয়ে এর প্রমাণও পাচ্ছে। এজন্য অনেককে জরিমানাও করা হয়েছে। ভোক্তা অধিদপ্তর চট্টগ্রাম বিভাগীয় কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক আনিছুর রহমান বলেন, ‘আড়তদার, ব্যবসায়ী, ব্যাপারী ও কিছু অসাধু মধ্যস্বত্বভোগী কারসাজি করে আলুর দাম বাড়াচ্ছে। এ ক্ষেত্রে তাদের বড় হাতিয়ার ক্রয়-বিক্রয়ের রসিদ গায়েব।’
কারসাজির কারণে উৎপাদনের সুফল মিলছে না বাজারে
কৃষি বিপণন ও সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, ২০২২-২৩ অর্থবছরে দেশে আলু উৎপাদিত হয় ১ কোটি ১১ লাখ ৯১ হাজার টন। এর আগের ২০২১-২২ অর্থবছরে উৎপাদনের এ সংখ্যা ছিল ১ কোটি ১০ লাখ ৫৮ হাজার টন। দেশে আলুর বার্ষিক চাহিদা ৮৫ থেকে ৯০ লাখ টন। এ হিসাবে চাহিদার বিপরীতে প্রায় ২০ লাখ টনের মতো উদ্বৃত্ত হওয়ার কথা। তবে বাজারের ছবি পুরোই উল্টো। আলুর দাম বাড়ার বিষয়ে সংস্থাটি সম্প্রতি এক প্রতিবেদনে বলেছে, একশ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী কারসাজি করে কৃত্রিমভাবে দাম বাড়াচ্ছে। তারা হিমাগার থেকেও চাহিদা অনুসারে আলু খালাস করছে না।
