নির্মাণে লেগেছিল সাত বছর টিকল মাত্র ১৬ মাস
বালুর বস্তা ফেলে চট্টগ্রামের বাঁশখালীতে বেড়িবাঁধ ভাঙন ঠেকানোর চেষ্টা করছে পউবো। উপজেলার কদমরসুল এলাকা থেকে তোলা - সমকাল
আব্দুল্লাহ আল মামুন, চট্টগ্রাম
প্রকাশ: ২৪ অক্টোবর ২০২৩ | ১৮:০০ | আপডেট: ২৫ অক্টোবর ২০২৩ | ০৬:১৪
নির্মাণের ১৬ মাস পার না হতেই সাগরে বিলীন হচ্ছে ৩০০ কোটি টাকার বেড়িবাঁধ। সাত বছর আগে চট্টগ্রামের বাঁশখালী উপজেলার উপকূলে বেড়িবাঁধটি নির্মাণের কাজ শুরু হয়। গত বছরের জুনে শেষ হয় প্রকল্পের কাজ। চলতি মাসেই বাঁধের বিভিন্ন অংশ সাগরে বিলীন হয়ে গেছে। কয়েকটি অংশে দেখা দিয়েছে ভাঙন। ক্ষয়ে গেছে বেড়িবাঁধ রক্ষায় দেওয়া ব্লক। বালুর বস্তা (জিওব্যাগ) ফেলে বাঁধের ক্ষত ঢাকার চেষ্টা করছে পানি উন্নয়ন বোর্ড। ক্রমেই পুরো বাঁধটি বিলীন হওয়ার পথে।
পাউবো সূত্র জানায়, ২০১৫ সালের ১৯ মে বাঁশখালী উপজেলার বঙ্গোপসাগর ও সাঙ্গু নদীর পাড়ে ১৪ কিলোমিটার দীর্ঘ বাঁধ নির্মাণ প্রকল্প একনেকে পাস হয়। প্রকল্পটি বাস্তবায়নে ব্যয় হয় ২৯৩ কোটি টাকা। গত বছরের জুনে প্রকল্পটির কাজ শেষ হয়। প্রকল্পের আওতায় ৬ দশমিক ২ কিলোমিটার বাঁধের ঢাল সংরক্ষণ, ভাঙন রোধ ও পুনরাকৃতিকরণ, ৩ দশমিক ৮ কিলোমিটার নদীতীর সংরক্ষণ কাজ এবং ৫ দশমিক ৬ কিলোমিটার বাঁধ পুনরাকৃতিকরণ কাজ করা হয়। সরেজমিন দেখা গেছে, বাঁশখালীর কদমরসুল এলাকার খানখানাবাদ ইউনিয়ন পরিষদ ভূমি অফিসের পশ্চিমে প্রায় এক কিলোমিটারজুড়ে বাঁধ ধসে গেছে। এখানে ব্লক ও বাঁধ বঙ্গোপসাগরে বিলীন হয়ে গেছে। জিওব্যাগ ফেলে ভাঙন ঠেকানোর চেষ্টা করছে পাউবো। কদমরসুল বড় মাওলানা শাহ মাজার এলাকায় ব্লকের অস্তিত্বই নেই। এখানেও জিওব্যাগ ফেলে বাঁধ জোড়াতালি দেওয়ার চেষ্টা করছেন শ্রমিকরা। খানখানাবাদ এলাকায় প্রকল্পের কাজ চলাকালেই ব্লক বিলীন হয়ে যায় সাগরে। অল্প যা আছে তাও ক্ষয়ে গেছে। সেখানে বড় জিওব্যাগ ফেলে বাঁধের ক্ষত ঢেকে রাখা হয়েছে। প্রকল্প শেষ হলেও সেখানে আর ব্লক কিংবা বাঁধ পুনরাকৃতি করা হয়নি।
খানখানাবাদ এলাকার বাসিন্দা মো. হাসেম সমকালকে বলেন, ’৯১-এর ঘূর্ণিঝড়ের পর পাঁচবার ভিটেমাটি সাগরে বিলীন হয়েছে। দীর্ঘদিন পরিবার নিয়ে মানুষের জমিতে উদ্বাস্তু হিসেবে দিন কাটিয়েছি। অনেক কষ্টে একটি ঘর করেছি। এখন আবারও বেড়িবাঁধ ভেঙে যাচ্ছে। কদমরসুল এলাকার বাসিন্দা মোহাম্মদ ইউসুফ বলেন, বেড়িবাঁধ না থাকায় প্রায় সাত বছর মানুষ চাষাবাদ করতে পারেনি। লবণাক্ত পানি ঢোকার কারণে পুকুরে মাছ পর্যন্ত ছিল না। বেড়িবাঁধ নির্মাণ হওয়ায় মানুষ স্বস্তি পেয়েছিল। এখন আবার ভেঙে যাওয়ায় আতঙ্ক তৈরি হয়েছে।
নিম্নমানের ব্লক প্রকল্পের কাজ চলাকালে নিম্নমানের কাজের অভিযোগ আনেন স্থানীয় বাসিন্দারা। ২০২০ সালে বেড়িবাঁধে ব্যবহার করা ব্লকের গুনগত মান যাচাই করার উদ্যোগ নেয় পাউবো। দৈবচয়ন পদ্ধতিতে ১১ হাজার ৩৬০টি ব্লকের নমুনা নেওয়া হয়। তা পাঠানো হয় বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পরীক্ষাগারে। সেখানে ৩ হাজার ৭৮৭টি ব্লক পাওয়া যায়, যা অত্যন্ত নিম্নমানের। পরে সেগুলো বাতিল করতে নির্দেশ দেওয়া হয়। স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রকল্পের কাজে ব্যবহার করা অধিকাংশ ব্লক তৈরি করা হয়েছে নিম্নমানের উপকরণ দিয়ে।
চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের পানিসম্পদ কৌশল বিভাগের সহকারী অধ্যাপক সামিউন বাসির সমকালকে বলেন, ‘দুটি কারণে পাউবোর বেড়িবাঁধ টেকসই হয় না। একটি নিম্নমানের কাজ; অন্যটি নকশায় ত্রুটি। পাউবোর উচিত বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ নিয়ে টেকসই বাঁধ নির্মাণে কার্যকর নকশা করা ও দুর্নীতি খতিয়ে দেখে দোষীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া।’ অভিযোগ অস্বীকার করে পাউবোর দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী শিবেন্দু খাস্তগীর সমকালকে বলেন, ‘নিম্নমানের কাজ কিংবা নকশা ত্রুটির জন্য বাঁধ ভাঙছে না। বাঁধ ভাঙছে সাঙ্গু নদীর মোহনায় চর জেগে স্রোতের গতিপথ পরিবর্তন হওয়ার কারণে। যেখানে বাঁধ ভাঙছে সেখানে সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে বাঁধের উচ্চতা ছিল চার ফুট। এখন পানির গতির কারণে বাঁধের গোড়ায় গভীর হয়ে সেটি দাঁড়িয়েছে ১৫ ফুটে। স্বাভাবিকভাবে বাঁধের গোড়া থেকে মাটি সরে যাওয়ায় বাঁধ ধসে পড়ছে। তবে যেখানে ভাঙছে, সেখানে সংস্কার ও জেগে ওঠা চর কেটে দেওয়ার ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।’
- বিষয় :
- বেড়িবাঁধ
- বাঁশখালী উপকূল
