ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

অপরিকল্পিত পুকুর খননে ডুবছে কৃষকের স্বপ্ন

অপরিকল্পিত পুকুর খননে ডুবছে কৃষকের স্বপ্ন
×

পানি নিষ্কাশনের জন্য নালা তৈরি করে ফসল রক্ষার চেষ্টা করছেন কৃষকরা। ছবিটি চারঘাটের বালিয়াডাঙ্গা বিল থেকে তোলা। ছবি: সমকাল

সনি আজাদ, চারঘাট (রাজশাহী)

প্রকাশ: ০৭ আগস্ট ২০২৫ | ০১:৩৭

রাজশাহীর চারঘাটের ভাটপাড়া গ্রামের কৃষক আব্দুল কাদের সাড়ে ছয় বিঘা জমিতে আমন আবাদের প্রস্তুতি নিয়েছিলেন। জমিতে এখন কোমর সমান পানি। বীজতলার চারাও ডুবে গেছে। এখন জমির পানি নেমে গেলেও চারা কিনে আবাদ করতে হবে। এত টাকা দিয়ে চারা কিনে আমন আবাদ করা সম্ভব হবে বলে জানিয়েছেন তিনি।

উঁচু ভূমি হিসেবে পরিচিত বরেন্দ্র অঞ্চল চারঘাটের বিলগুলোতে এবার হাজারো কৃষকের আমন আবাদে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। ফসলি জমিতে অপরিকল্পিত পুকুর খনন, খাল দখল ও কালভার্টের মুখ বন্ধের কারণে এলাকার বিলগুলো পানির নিচে ডুবে আছে। অনেক এলাকার বসত বাড়িতেও জলাবদ্ধতা তৈরি হয়েছে। কৃষকেরা নালা কেটে বিলের পানি সরানোর চেষ্টা করছেন। তা খুব একটা কাজে আসছে না। 

উপজেলা কৃষি অফিস সূত্র জানিয়েছে, পানি না সরলে অন্তত ৮০০ হেক্টর জমিতে আমন আবাদ নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দেবে। আগস্ট মাসের শেষ সপ্তাহের মধ্যে পানি সরলেও কৃষকেরা সেখানে আমন রোপণ করতে পারবেন। তাতে হয়তো শেষ পর্যন্ত ৩০০-৪০০ হেক্টর জমিতে আমন চাষ হুমকিতে পড়তে পারে। এরইমধ্যে পাঁচ হেক্টর জমির বীজতলা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে জানিয়েছে সূত্রটি। 

তবে কৃষকের দাবি, অন্তত এক হাজার হেক্টর আমন ধানের জমি পানির নিচে রয়েছে। বসতবাড়ির পানি বিলে সরানোর চেষ্টা করছেন তারা। এ অবস্থায় চলমান বৃষ্টিতে বিলের পানি সরে যাওয়ার তেমন কোনো আশঙ্কা নেই। অপরিকল্পিত পুকুর খনন ও খাল দিয়ে পানি নিষ্কাশন না হওয়ায় জমিতে জলাবদ্ধতা দেখা দিয়েছে।

আপাতত বৃষ্টি কমার সম্ভাবনা নেই– বলছে রাজশাহী আবহাওয়া অফিস। রাজশাহী আবহাওয়া অফিসের পর্যবেক্ষক লতিফা হেলেন জানান, গত ২৯ জুলাই থেকে ৪ আগস্ট পর্যন্ত সাত দিনে রাজশাহীতে ১৬৭.৭ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছে; যা এ মৌসুমের সর্বোচ্চ বৃষ্টিপাত। আগামী কয়েকদিনও একই ধরনের বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। 

উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা যায়, উপজেলায় পাঁচ হাজার ৫৫০ হেক্টর জমিতে আম চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রতি বছর এই পরিমাণ জমিতেই আম চাষ হয়। আমন চাষের সঙ্গে প্রায় ৩৮ হাজার কৃষক জড়িত রয়েছেন।

সরেজমিন চারঘাটের শলুয়া, ভাটপাড়া, বালিয়াডাঙা, চামটা, সাদীপুর, কৈ ডাঙা, বালুদিয়াড়সহ আমন চাষের বিলগুলোতে দেখা যায় সেখানে থই থই পানি। বালিয়াডাঙা ও বামনদীঘি গ্রামের কৃষকেরা বিলের পানি বের করতে প্রধান সড়ক কেটে নালা তৈরি করেছেন। 

স্থানীয় কৃষক রফিকুল ইসলাম বলেন, অপরিকল্পিতভাবে ফসলি জমিতে পুকুর খনন করা হয়েছে। পুকুর পাড় উঁচু করে লাগানো হয়েছে কলাসহ বিভিন্ন জাতের গাছ। এতে পানি চলাচল করতে পারছে না। বিলের পানি নেমে যাওয়ার সমস্ত পথ বন্ধ করা হয়েছে। হাঁটু সমান পানির জমিতে কীভাবে আমন রোপণ করব। 

মৎস্য কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, উপজেলায় পুকুরের সংখ্যা ৩ হাজার ৪০২টি। ছয় বছর আগে এ সংখ্যা ছিল ২ হাজার ৭৬২টি। এক যুগ আগে ছিল ১ হাজার ৯৩০টি পুকুর। এসব পুকুরের অধিকাংশই অবৈধভাবে খনন হয়েছে বিলের তিন ফসলি জমিতে।

উপজেলার শলুয়া গ্রামের কৃষক সবুর আলী বলেন, ‘কিছু মানুষের পুকুর খননের বলি হয়েছে আমাদের ফসলি জমিগুলো। পানি চলাচলের স্বাভাবিক কোনো প্রক্রিয়া নেই। শলুয়া ও চমটা বিলের পানি আগে শলুয়ার দহ খালের মাধ্যমে বড়াল নদীতে প্রবাহ হতো। বৃষ্টির হওয়ার কয়েক ঘণ্টা পরেই পানি নেমে যেত। খালগুলো দখল করে ভরাট করায় পানি নামতে পারছে না।’ 

জানা যায়, কাগজে-কলমে উপজেলায় ছোট-বড় ২১টি খাল রয়েছে। এর মধ্যে গঙ্গামতী খাল, ঝিনি খাল, ত্রিমোহনী খাল, কাঁটা বড়াল খাল, শ্যামা সুন্দরী খাল, সলিয়ার দহ খাল, ভাটপাড়া খাল, বেলঘরিয়া খাল ও নারদ খাল বেশ উল্লেখ্যযোগ্য। বাস্তবে ২১টি খালের মধ্যে ১৬টি খালের অস্তিত্ব বিলীন হয়ে গেছে। যে পাঁচটি খাল আছে সেগুলোও দখল-দূষণে এখন পানি চলাচলের উপযোগী নেই। 

সরদহ ইউনিয়নের খোর্দগোবিন্দপুরে সুমন আলী বলেন, এখানকার শত শত বাসিন্দা বৃষ্টির পানিতে গৃহবন্দী। কালভার্টের মুখ বন্ধ থাকায় বসতবাড়ির পানিই বিলে যেতে পারছে না। বিলের পানি কোথায় যাবে? খাল দখল ও অপরিকল্পিত পুকুর খননের কারণেই হাজার হাজার কৃষক দুর্দশায় পড়েছে। 

আদর্শ কৃষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক আশরাফুল ইসলাম বলেন, প্রতি হেক্টর জমিতে ২৫ মণ আমন ধান হয়। সে হিসেবে ১০০০ হেক্টর জমিতে আমন আবাদ না হলে ২৫ হাজার মণ ধান উৎপাদন কম হবে। প্রতি মণ আমন ধানের দাম ১০০০-১২০০ টাকা। সে হিসাবে এ বছর চারঘাটের কৃষকেরা প্রায় তিন কোটি টাকার অর্থনৈতিক ক্ষতির সম্মুখীন হবেন। 

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আল মামুন হাসান বলেন, ‘এরই মধ্যে ৮০০ হেক্টর জমি জলাবদ্ধ হয়ে পড়েছে। আগস্টের শেষ সপ্তাহের মধ্যে পানি নেমে গেলে কৃষকেরা আমণ রোপণ করতে পারবেন। এ জন্য ৩০০-৪০০ হেক্টর জমির ধান রোপণ নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে। তবে কৃষককে সঙ্গে নিয়ে আমরা জলাবদ্ধতা নিরসনের চেষ্টা করছি। যেন কোনো জমিই আমন আবাদের বাইরে না থাকে। এজন্য উঁচু জমিতে বাড়তি বীজতলার চারা তৈরি করা হয়েছে।’ 

আরও পড়ুন

×