জলাবদ্ধতায় হাজার হেক্টর জমি ফসল আবাদ নিয়ে শঙ্কা
মৌলভীবাজারের রাজনগর উপজেলার পাঁচগাঁও ইউনিয়নের পৈতুরা গ্রামে কাউয়াদিঘী হাওরে জলাবদ্ধ আমন জমি সমকাল
মৌলভীবাজার প্রতিনিধি
প্রকাশ: ৩০ আগস্ট ২০২৫ | ২৩:৫৭
রাজনগর উপজেলার কাউয়াদিঘী হাওর ধান উৎপাদন ও মিঠাপানির মাছ–গুরুত্বপূর্ণ এই দুটি ক্ষেত্রে স্থানীয় পর্যায়ে চাহিদা পূরণে সর্বোচ্চ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে। তবে চলতি বছর এই হাওরে ফসল চাষের ক্ষেত্রে সৃষ্টি হয়েছে সংকট। হাওরের পানি ধীরে নামায় আমন চাষের আদর্শ সময় পেরিয়ে যাওয়া নিয়ে উদ্বিগ্ন স্থানীয় কৃষকরা।
হাওর পারের আমনচাষিদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, অন্তত ৮০০ থেকে ১ হাজার হেক্টর জমি জলাবদ্ধতার কবলে পড়ায় আমন ফসল ফলানো থেকে এবার বঞ্চিত হতে পারেন কৃষকরা; যা চলতি মৌসুমে ধান উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের ক্ষেত্রে প্রভাব ফেলতে পারে। এই হাওরপারের হাজার হাজার কৃষিজীবীর মাঝে আগামীর অভাব নিয়ে তাই এখনই আশঙ্কা সৃষ্টি হয়েছে।
স্থানীয় কৃষক ও পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) সূত্রে জানা যায়, মৌলভীবাজারের রাজনগর উপজেলার কাউয়াদিঘী হাওর ২২ হাজার ৫৮০ হেক্টর এলাকাজুড়ে বিস্তৃত। এ হাওরে কৃষিজমির পাশাপাশি রয়েছে ৪৮টির বেশি ছোট-বড় বিল। ফলে বোরো ফসল ফলানোর পাশাপাশি দেশীয় প্রজাতির মাছের জন্য প্রসিদ্ধ ছিল কাউয়াদিঘী।
ফসল নিরাপদে আবাদ ও ঘরে তোলার লক্ষ্যে ১৯৭৫-৭৬ অর্থবছরে বাংলাদেশ ও কুয়েত সরকারের যৌথ অর্থায়নে মনু প্রকল্পের আওতায় হাওরটি নেওয়া হয়। ১৯৮২-৮৩ অর্থবছরে শতকোটি টাকা ব্যয়ে স্থানীয় কাশিমপুরে অত্যাধুনিক ৮টি পাম্পের সমন্বয়ে নির্মাণ করা হয় পাম্প হাউস। এ সব পাম্পের সাহায্যে বোরো কাটার সময় বৃষ্টির জমে যাওয়া অতিরিক্ত পানি সেচ দিয়ে কুশিয়ারা নদীতে ফেলা হয়। অন্যদিকে এ প্রকল্পের অপর অংশে মনু নদে মনু ব্যারাজে স্লুইসগেট। এখানে খাল খনন করে আটকানো পানি শুষ্ক মৌসুমে কাউয়াদিঘী হাওরের ওপরের অংশে সরবরাহ করে বোরো আবাদের কাজে লাগানো হয়।
স্থানীয়রা জানান, কাউয়াদিঘী হাওর মৌলভীবাজার সদর উপজেলার দুটি ও রাজনগরের ৪টি ইউনিয়নজুড়ে বিস্তৃত। কালের পরিক্রমায় দিন দিন হাওর-নালা, বিল ভরাট হচ্ছে। এতে প্রাকৃতিক স্থিতি নষ্ট হওয়ায় পরিবেশ আগের মতো সহায়ক হচ্ছে না। যার কারণে বছরজুড়েই নানা সমস্যা মোকাবিলা করতে হয় কৃষকদের। এতে মনু প্রকল্পের অনেক খাল দখলদারিত্বে ও ভরাট হওয়ায় ছোট হয়ে আসছে। এ সব খাল দিয়ে অবাধে পানি সরবরাহ হয় না। ফলে বোরো মৌসুমে শত শত একর জমি অনাবাদি থেকে যায়। এখন আমন মৌসুমে জলাবদ্ধতার কারণে সমস্যা হচ্ছে।
বিল ভরাটের ফলে কাউয়াদিঘী হাওরপারের অনেক জমিতে বোরো ও আমন ফসল ফলানোর সুযোগ সৃষ্টি হলেও তা বর্তমানে বিঘ্নিত। হাওরপারের রাজনগর উপজেলার পাঁচগাও, আমিরপুর, রক্তা, জাহিদপুর, ফতেপুর, গোবিন্দপুর, বেতাউঞ্জা, শাহপুর, বেড়কুঁড়ি, হাদাপুর, অন্তেহরি, সদর উপজেলার বিরাইমাবাদ, রায়পুর, রসুলপুর, বানেশ্রী, কান্দিগাঁও, জগৎপুরসহ শতাধিক গ্রামের কৃষিজীবীরা বহু বছর ধরে হাজার হাজার একর জমিতে বোরো ও আমন দুটি ফসল ফলিয়ে আসছেন নানা প্রতিকূলতা মোকাবিলা করে। এবার তা আরেকটু বনেদি বলে দাবি করছেন কৃষকরা।
হাওর রক্ষা আন্দোলন সদর উপজেলা কমিটির সভাপতি ও হাওরপারের রায়পুর গ্রামের অধিবাসী আলমগীর চৌধুরী বলেন এ বছর হাওরের উপরি অংশে আমন ফসল ফলানোর লক্ষ্যে বীজতলা প্রস্তুত করে রোপণের জন্য জমিতে দেওয়া হয়। কেউ কেউ চারা রোপণ করে ফেলেন। এ অবস্থায় সম্প্রতি কয়েক দিন ধরে টানা বৃষ্টি হওয়ায় জমিতে হাঁটু থেকে কোমর সমান পানি জমে আছে। বীজতলায় চারা বুড়ো হয়ে যাচ্ছে। এখন রোপণ করতে না পারলে জমি অনাবাদি থেকে যাবে।
মৌলভীবাজার কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের উপপরিচালক মো. জালাল উদ্দিন সমকালকে বলেন, হাওরকেন্দ্রিক বোরো ফসল উৎপাদনের প্রতি গুরুত্ব দেওয়া হয়। ইদানীং বন্যার আক্রমণ কমে যাওয়ায় কাউয়াদিঘী হাওরের ওপরদিকে ৮০০ থেকে এক হাজার হেক্টর জমিতে কৃষকরা আমন উৎপাদন করে থাকেন। পানির লেভেল ৭ থেকে সাড়ে ৭ মিটারের মধ্যে নেমে এলে এ হাওরের ৮০০ থেকে ৯০০ হেক্টর জমিতে ফসল আবাদ সম্ভব।
পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্র জানায়, কাউয়াদিঘী হাওরে কৃষিজমি ছাড়াও ফাটাশিঙা, মাঝেরবান্দ, শালকাটুয়া, আউয়া (হাওয়া) বিলসহ অন্তত ৪৮টির বেশি বিল রয়েছে। এগুলো জেলার মৎস্য ভান্ডার হিসেবে পরিচিত। মৌলভীবাজার পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী খালেদ বিন অলীদ বলেন, বর্ষা মৌসুমে কাউয়াদিঘী হাওরে পানির লেভেল সাড়ে ৮ মিটার থাকার কথা, সেখানে ৮.০৬ মিটার রয়েছে। এর নিচে পানির লেভেল নামলে হাওরের পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
- বিষয় :
- জমি উদ্ধার
