ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

বস্তিতে স্বপ্নের বীজ বুনছেন তারা

বস্তিতে স্বপ্নের বীজ বুনছেন তারা
×

ময়মনসিংহ রেলওয়ে স্টেশনের পাশের বস্তিতে পথশিশুদের পাঠশালা সমকাল

 তানভীর হোসাইন, ময়মনসিংহ

প্রকাশ: ৩১ আগস্ট ২০২৫ | ০১:০৫ | আপডেট: ৩১ আগস্ট ২০২৫ | ১২:৫৬

বস্তিতে স্বপ্নের বীজ বুনছেন কিছু তরুণ-তরুণী। পাঠশালা খুলে পথশিশুদের পড়ালেখা শেখাচ্ছেন আনন্দ মোহন কলেজের কয়েকজন শিক্ষার্থী। ময়মনসিংহ রেলওয়ে স্টেশনের পাশের বস্তিতে ২০১৯ সাল থেকে চলছে এই পাঠশালা। সেখানে ৫০-৬০ জন শিশু নিয়মিত পড়ালেখা করছে।

বস্তির এই শিশুদের অনেকেরই ছিল না জন্ম নিবন্ধন। এটি তাদের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় যুক্ত হওয়ার পথে বড় বাধা ছিল। পারিবারিক পরিচয় ও আর্থিক দুরবস্থার কারণে শহরের কোনো ভালো স্কুল তাদের ভর্তি নিতে চাইত না। ঠিক সেই মুহূর্তে এগিয়ে আসেন চার-পাঁচজন তরুণ-তরুণী। নিজেদের পড়ালেখার পাশাপাশি এই শিশুদের পেছনে প্রতিদিনের কিছুটা সময় ব্যয় করতে শুরু করেন তারা। শুধু পাঠ্যপুস্তকই নয়, তাদের হাতে তুলে দিয়েছেন স্বপ্নের সোপান।

গত বৃহস্পতিবার সরেজমিন দেখা গেছে, রেলস্টেশন চত্বরের পাশের বস্তির সামনেই রেললাইনের পাশে ফাঁকা যায়গায় কাদার ওপর ত্রিপল বিছানো। সেখানে চার তরুণ মিলে ৩০-৩৫ জন শিশুকে পড়াচ্ছেন। যাদের বয়স পাঁচ থেকে ১৫ বছর। স্কুলে ভর্তি হওয়ার মতো আর্থিক সামর্থ্য নেই তাদের।

এই পাঠশালার অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা উজ্জ্বল আহমেদ বিজয়। তিনি বলেন, ‘যখন আমরা শুরু করি, তখন আমাদের তেমন কিছুই ছিল না। শুধু ছিল ইচ্ছা আর ভালোবাসা। এই শিশুরা খুব মেধাবী। একটু সুযোগ পেলে তারা অনেক ভালো করতে পারে।’ তাঁর ভাষ্য, একটু বৃষ্টি হলেই পাঠদান বন্ধ রাখতে হয়। কারণ মাথার ওপর কোনো ছাউনি নেই। একটানা তিন-চার দিন বৃষ্টি হলে পড়ানোর স্থানে অনেক কাদা হয়ে যায়, যে কারণে মাটিতে ত্রিপল বিছিয়েও পাঠদান সম্ভব হয় না।

পাঠশালার শিক্ষক আদ্রিতা নূর বলেন, ‘আমরা যখন শিশুদের পড়াই, তখন মনে হয় নিজেরাও নতুন করে কিছু শিখছি। কিন্তু একটা ঘরের অভাবে আমাদের অনেক কষ্ট হয়। যদি আমাদের একটা ছোট ঘর থাকত তাহলে অনেক ছেলেমেয়েকে আমরা বছরের পর বছর শিক্ষাদান করে মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে পারতাম।’

আরেক শিক্ষক আশিকুল হাকিম জানান, শিক্ষকদের বেতন নেই, কিন্তু তাতে কোনো দুঃখ নেই। কারণ তাদের প্রধান উদ্দেশ্যই এই পথশিশুদের মানুষ হিসেবে গড়ে তোলা। ঈদ-পূজা বা অন্যান্য উৎসবে যখন বাচ্চাদের মুখে হাসি ফোটে তখন মনে হয় সব কষ্ট সার্থক।

এই পাঠশালা থেকে পড়ালেখা করে অনেকে এখন শহরের ভালো ভালো স্কুলে ভর্তি হয়েছে। তারা সেখানেও নিজেদের মেধার স্বাক্ষর রাখছে। তাদের এই সাফল্য দেখে এলাকার অভিভাবকরাও খুশি।

এই পাঠশালার সাবেক শিক্ষার্থী রোহান মিয়া। সে এখন ভালো একটি স্কুলে ভর্তি হয়েছে। রোহান বলে, ‘আগে আমরা শুধু খেলতাম, ঘোরাঘুরি করতাম। এখন এখানে এসে অনেক কিছু শিখেছি। স্যার-ম্যাডামরা আমাদের অনেক সাহায্য করেছেন। আমাদের বই, খাতা, কলম সবই স্যাররা কিনে দেন।’

শিশু শিক্ষার্থী মুন জাহান জানায়, ক্লাসের সময় যখন বৃষ্টি হয়, তখন অনেক মন খারাপ হয়। কারণ পড়া বন্ধ হয়ে যায়।

শিক্ষার্থীদের অভিভাবক বাবুল মিয়ার ভাষ্য, আগে তাঁর ছেলে সারাদিন অলসভাবে স্টেশনে ঘোরাঘুরি করত। এখন সে নিয়মিত পড়তে আসে। এখানকার শিক্ষকরা তাকে শুধু পড়ালেখাই শেখাননি, ভালো মানুষ হিসেবেও গড়ে তুলতে সাহায্য করছেন।

কলেজ শিক্ষক শহীদুল ইসলাম জানান, তরুণ-তরুণীদের এই উদ্যোগ আগামী দিনের জন্য একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে। 

সদর উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা বেলায়েত হোসেনের ভাষ্য, স্বেচ্ছাসেবীদের উদ্যোগটি প্রশংসনীয়। দ্রুতই তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে প্রয়োজনীয় সহযোগিতার ব্যবস্থা করা হবে।

ইউএনও আমিনুল ইসলাম প্রিন্স বলেন, স্বেচ্ছাসেবীরা যদি প্রয়োজন মনে করেন, তাহলে উপজেলা প্রশাসনের কাছে আবেদন করতে পারেন। তাদের আবেদন যাচাই-বাছাই করে বিষয়টি বিবেচনা করা হবে।

আরও পড়ুন

×