চবিতে সংঘর্ষ
খুলিতে গভীর ক্ষত সায়েমের, কাঁধ থেকে হাত প্রায় আলাদা নাইমুলের
মেডিকেলে কাতরাচ্ছেন আহত শিক্ষার্থীরা
ছবি: সমকাল
সারোয়ার সুমন, চট্টগ্রাম
প্রকাশ: ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৫ | ১৪:১২
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে (চবি) শিক্ষার্থী ও স্থানীয়দের মধ্যে দফায় দফায় সংঘর্ষে অন্তত ২২০ জন আহত হয়েছেন। আহতদের মধ্যে দুই শিক্ষার্থী সায়েম ও নাইমুলের অবস্থা সংকটাপন্ন। গুরুতর আহত এই দুই শিক্ষার্থীকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে লাইফ সাপোর্টে রাখা হয়েছে।
কিছু বুঝে ওঠার আগেই চারপাশ থেকে ঘিরে ফেলা হয় সায়েমকে। কপাল থেকে ঘাড় পর্যন্ত কুপিয়ে করা হয় গভীর এক ক্ষত। এই ক্ষত এতোটাই গভীর যে, মাথার খুলি ভেদ করে দেখা যায় মগজের কিছু অংশও। প্রচুর রক্তক্ষরণ হওয়ায় তার অবস্থা এখন সংকটাপন্ন। রক্তের ঘাটতি মেটাতে এরই মধ্যে অতিরিক্ত রক্ত দিতে হয়েছে ৫ থেকে ৬ ব্যাগ। তার জন্য রক্ত লাগবে আরও।
চিকিৎসকদের বরাতে সায়েমের সঙ্গে থাকা তার এক বন্ধু জানান, অপারেশনের সময় মাথার ভাঙা খুলি কাটতে হয়েছে সায়েমের। রক্তক্ষরণের কারণে ভেতরে জমে থাকা রক্ত বের করা হয়েছে। এরপর আবার সেই কেটে ফেলা খুলি লাগিয়ে তার মাথার অপারেশন সম্পন্ন করা হয়েছে। এখন ৭২ ঘণ্টার জন্য হাসপাতালে লাইফ সাপোর্টে রাখা হয়েছে তাকে। এর মধ্যে জ্ঞান যদি না ফেরে বিকল্প ব্যবস্থা নেবেন ডাক্তাররা।

অন্যদিকে চবির আরেক শিক্ষার্থী নাইমুলের কাঁধে ধারালো চাপাতি দিয়ে কোপ দিয়ে কাঁধ থেকে এক হাত প্রায় আলাদা করে দিয়েছে স্থানীয় দুর্বৃত্তরা। হাতের হাড় দুই টুকরো হয়ে কোনোমতে কাঁধের সঙ্গে হাতটা ঝুলে ছিল নাইমুলের। এখন মুমূর্ষু অবস্থায় আছেন তিনিও। তার হাতের অবস্থা এতোটাই খারাপ যে এই হাতের অপারেশন চট্টগ্রামে সম্ভব না। হাত আর জোড়া লাগবে কি না তা নিয়েও সন্দিহান ডাক্তাররা।
চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চিকিৎসক শামীম আহমেদ বলেন, ‘শতাধিক শিক্ষার্থী এই হাসপাতালে চিকিৎসা নিলেও বেশিরভাগই প্রাথমিক চিকিৎসা নিয়ে হাসপাতাল ছেড়ে গেছেন। দু’জনের অবস্থা গুরুতর। তাদের চিকিৎসা কার্যক্রম চলছে।’
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর মোহাম্মদ তানভীর হায়দার আরিফ বলেন, ‘আহত শিক্ষার্থীদের অনেকে হাসপাতাল ছেড়েছেন। তিনজনের অবস্থা গুরুতর। উন্নত চিকিৎসার জন্য প্রয়োজনে তাদের ঢাকা পাঠাবো আমরা। আহতদের চিকিৎসার যাবতীয় খরচ বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন বহন করবে।’

চট্টগ্রাম বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক ডা. শেখ ফজলে রাব্বী বলেন, ‘হাসপাতালের চিকিৎসা নিতে আসা ছাত্রদের কারও হাত ভেঙেছে, কারও মাথা ফেটেছে। কয়েকজনের জখম গুরুতর।’
চমেক হাসপাতালে থাকা আরেক আহত শিক্ষার্থী আব্দুর রহমান বলেন, ‘চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের আশেপাশে থাকা স্থানীয়রা মধ্যযুগীয় কায়দায় হামলা করেছে চবি শিক্ষার্থীদের ওপর। রামদা ও কিরিচসহ দেশীয় অস্ত্র ছিল তাদের হাতে।’
তবে দ্বিমত পোষণ করে জোবরার বাসিন্দা ও স্থানীয় স্টেশনারি দোকানদার খায়রুল আলম বলেন, ‘আমি তো কাউকে আঘাত করিনি। তাহলে আমার দোকান লুট করল কেন শিক্ষার্থীরা? জোবরার কেউ বিশ্ববিদ্যালয় গিয়ে হামলা চালায়নি। শিক্ষার্থীরা গ্রামে এসে আমাদের আক্রমণ করেছে।’
এর আগে গত শনিবার গভীর রাত থেকে রোববার বিকেল পর্যন্ত শিক্ষার্থী ও ক্যাম্পাস-সংলগ্ন জোবরা গ্রামের বাসিন্দাদের মধ্যে দফায় দফায় সংঘর্ষ হয়। এতে অন্তত ২২০ জন আহত হন, যাদের মধ্যে অধিকাংশই শিক্ষার্থী। সংঘর্ষ চলাকালে সমকালের চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় সংবাদদাতাসহ ছয় সাংবাদিক আহত হন। এ ছাড়া শারীরিকভাবে নাজেহাল ও হেনস্তার শিকার হন আরও কয়েকজন সংবাদকর্মী।

বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ সংঘর্ষ থামাতে ব্যর্থ হলে শেষ পর্যন্ত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় ১৪৪ ধারা জারি করে হাটহাজারী উপজেলা প্রশাসন। যদিও হামলার সময় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কোনো সদস্যকে সেভাবে ঘটনাস্থলে দেখা যায়নি।
এদিকে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ও পাশের জোবরা-ফতেপুর গ্রামের বাসিন্দাদের নিয়ে সমন্বিত কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত হয়েছে। গতকাল সন্ধ্যা সাড়ে ৭টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, ছাত্র সংগঠন ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের নিয়ে চলা বৈঠকে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
সংঘর্ষের সূত্রপাত হয় এক ছাত্রীকে মারধরের অভিযোগকে কেন্দ্র করে। এরপর মুহূর্তেই উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। শিক্ষার্থীদের হাতে ছিল লাঠি, রড, পাইপ ও পাথর। অন্যদিকে গ্রামবাসী রামদা, রড ও লোহার পাইপ নিয়ে সংঘর্ষে নামে। এতে পুরো জোবরা গ্রাম রণক্ষেত্রে পরিণত হয়।
বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার অধ্যাপক মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম জানান, সংঘর্ষের ঘটনায় মামলার প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি আহত শিক্ষার্থীদের চিকিৎসা ব্যয় বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ বহন করছে।
