ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

প্রাণিসম্পদের অনিয়মে ভুগছে পশুস্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা

প্রাণিসম্পদের অনিয়মে ভুগছে  পশুস্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা
×

.

বাগমারা (রাজশাহী) সংবাদদাতা 

প্রকাশ: ০৫ সেপ্টেম্বর ২০২৫ | ০৬:৪৬

মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের প্রাণিসম্পদ ও ডেইরি উন্নয়ন প্রকল্পের (এলডিডিপি) ছাগল-ভেড়ার পরিবেশবান্ধব শেড (ঘর) নিয়েছেন উপজেলার যোগীপাড়ার বাসিন্দা রাশেদা বিবি। ঘর পেতে ৬৬টি ছাগল লালনপালনের তথ্য দিয়েছেন তিনি। বুধবার তাঁর বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, মাত্র একটি ছাগল পালন করছেন তিনি। 
একই গ্রামে আফসানা খাতুনের বসতি। বাচ্চাসহ পাঁচটি ছাগল রয়েছে তাঁর। নিজের শোবার ঘরের পাশে বাঁশের চাটা দিয়ে তৈরি কুঠিতে ছাগলগুলো রেখে রাতে ভালো ঘুম হয় না তাঁর। মনে ভয়, কখন না জানি বাচ্চাগুলোকে শেয়ালে টেনে নিয়ে যায়! আফসোস করেন একটি ভালো ঘরের।
প্রকল্পটির আওতায় বাগমারায় ছাগল-ভেড়ার পরিবেশবান্ধব ঘরগুলো নির্মাণে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে। 
প্রকল্পের সুবিধাভোগী খামারি রাশেদা জানান, তাদের যে সমিতি রয়েছে, তার সভাপতি রেনুকা বিবির বাড়িতে বসে ঘরপ্রাপ্তদের তালিকা করা হয়। কথা ছিল অফিস থেকে ২০ হাজার টাকা দেওয়া হবে। প্রকল্পের সুবিধাভোগী খামারিরা নিজেরাই ঘর নির্মাণ করবেন। কিন্তু অফিসের লোকজন তাদের টাকা না দিয়ে নিজেরাই ঘর নির্মাণ করে দিয়েছেন। রেনুকার মোবাইল ফোন বন্ধ থাকায় এ বিষয়ে তাঁর বক্তব্য জানা যায়নি। 
সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, নিয়ম অনুযায়ী খামারিদের নামে বরাদ্দকৃত ২০ হাজার টাকা চেকের মাধ্যমে দেওয়া হবে। তারা চাইলে বাড়তি টাকা যোগ করে ঘর বড় করতে পারবে। কোনোক্রমেই এ বরাদ্দের টাকায় ঠিকাদারকে দিয়ে কাজ করানোর সুযোগ নেই। পরিবেশবান্ধব ঘরটি তৈরির কথা ছিল চৌচালা। করা হয়েছে দোচালা। চালে দেওয়ার কথা ছিল ০ দশমিক ৪৫৭ মিলিমিটার গেজ পুরু ইন্ডাস্ট্রিয়াল টিন। দেওয়া হয়েছে ০ দশমিক ২৬০ মিলিমিটার পুরুত্বের টিন। টিনের তাপ নিয়ন্ত্রণের জন্য চালে ব্যবহার করা হয়নি ইনসুলেটর। বেড়ায় প্লাস্টিকের জালি দেওয়া হয়েছে। অথচ সেখানে দেওয়ার কথা ছিল প্লাস্টিকে মোড়ানো ১৪ নম্বর গেজ জিআই তারের জালি। ১০ মিলিমিটার সাইজের রডের তৈরি দরজা দেওয়ার কথা থাকলেও সেখানে দেওয়া হয়েছে কাঠের দরজা।
ঘর পাওয়া খামারি সাবিনা বিবি, মনোয়ারা বেগমসহ কয়েকজন অভিযোগ করেন, তাদের যে ঘর নির্মাণ করে দেওয়া হয়েছে, তাতে সর্বোচ্চ ১০ থেকে ১২ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। বাকি টাকা অফিসের লোকজন আত্মসাৎ করেছেন। 
সমতল ভূমিতে বসবাসরত অনগ্রসর ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর আর্থসামাজিক ও জীবন মানোন্নয়নের লক্ষ্যে সমন্বিত প্রাণিসম্পদ উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় দুই বছর আগে দ্বীপপুর ইউনিয়নের পূর্বদৌলতপুর গ্রামের শ্যামল চন্দ্রকে একটি গরু দেওয়া হয়। তাঁর স্ত্রীর অভিযোগ, যে গরুটি তাঁকে দেওয়া হয়েছিল, সেটি অসুস্থ ছিল। ভেড়া সাইজের ছোট্ট গরুটি শুরু থেকেই খুরারোগে আক্রান্ত ছিল। শেষ পর্যন্ত বাধ্য হয়ে কম টাকায় তা বিক্রি করে দেন।
একই প্রকল্পের আওতায় দেশব্যাপী দুধের উৎপাদন বৃদ্ধি ও সরবরাহ নিশ্চিত করতে মিল্ক কালেকশন সেন্টার তৈরি করেছে সরকার। উদ্দেশ্য ভোক্তা পর্যায়ে দুধের পর্যাপ্ত সরবরাহ নিশ্চিত করা। এতে ন্যায্যমূল্যে দুধ বিক্রি করতে পারবেন খামারিরা। প্রকল্পের আওতায় উপজেলার মারিয়া ইউনিয়নের বামনকয়া গ্রামের শাহাদত হোসেনের বাড়িতে একটি ডেইরি পিজি ও লাইভস্টক ফার্মারস ফিল্ড স্কুল রয়েছে। সেখানে দুটি ২০ লিটারের স্টিল মিল্ক ক্যান, একটি স্টিল বাকেট, একসেট স্টিল মেজারিং (প্রতি সেটে ৪ পিস), থেট ডিপিং কাপ একটি, টেম্পারেচার মিটার একটি, একসেট হ্যান্ড গ্লোভস ও গামবুট দেওয়ার কথা থাকলেও বাস্তবে গিয়ে দেখা যায়, শুধু একসেট গামবুট রয়েছে।
এদিকে দেশের মানুষের দুধের পুষ্টি চাহিদা পূরণের লক্ষ্যে সরকার কম মূল্যে গাভির (দুগ্ধজাত) প্রজনন বীজ সরবরাহ করছে। গাভির জাত উন্নয়নে বছরে উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তার কাছে ১৪ হাজার ৪০০টি কৃত্রিম বীজ সরবরাহ করে অধিদপ্তর। প্রতিটি বীজের মূল্য ১৭৫ টাকা হলেও খামারিদের কাছ থেকে ৫০০ থেকে এক হাজার ৫০০ টাকা পর্যন্ত নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। 
প্রাণিসম্পদ অফিসের এআই বীজ সরবরাহকারী সাদ্দাম হোসেন জানান, প্রাণিসম্পদ অফিসের তালিকাভুক্ত টেকনিশিয়ানরা শুধু শাহিওয়াল, লালসিন্ধী, হলেস্টিয়ান ফিজিয়ান জাতের বীজ সরবরাহ করে। কিছু অসাধু টেকনেশিয়ান (পশু চিকিৎসক) খামারিদের কাছে অতিরিক্ত টাকার বিনিময়ে বীজ বিক্রি করছেন। 
উপজেলা প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর ও হাসপাতালের কর্মকর্তা ডা. আহসান হাবিব বলেন, বাগমারায় ছাগল-ভেড়ার পরিবেশবান্ধব ৭৬টি ঘর নির্মাণ করা হয়েছে। এ প্রকল্পে বড় কোনো অনিয়ম হয়নি। তবে দু-একটিতে অনিয়ম হতে পারে। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, গাভির কৃত্রিম বীজে কোনো টেকনিশিয়ানের বিরুদ্ধে বেশি টাকা নেওয়ার অভিযোগ পেলে তাঁকে জরিমানা করা হয়।
 

আরও পড়ুন

×